পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী সেতু
এসএম আতিয়ার রহমান
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৩ ১০:৪৮ এএম
২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর নতুন করে অনেকগুলো মেগা প্রকল্পের কথা সামনে আনা হয়েছে। এর মধ্যে পাটুরিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে। এ বাবদ ১২ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সহজতর করে জীবনমান উন্নয়নে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ রয়েছে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মিত হলে এক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে এতে সন্দেহ নেই এবং এটি দীর্ঘদিনের দাবিও বটে। তবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গটি এখনও যেহেতু প্রাথমিক স্তরে, তাই এর স্থান ও নির্মাণকৌশল প্রসঙ্গে বিকল্প চিন্তা করার জন্যও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন অনেকে। এর কারণ, সরকার যেসব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করছে সে ক্ষেত্রে পাটুরিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখার অপেক্ষা রাখে।
প্রথমত, একই পদ্মা
নদীর মাত্র ৪০ কিলোমিটার উজানে
নদীর উৎসমুখে আরেকটি
সেতু নির্মাণ করার
আগে তার নানামাত্রিক
দিক বিবেচনা করা দরকার। সেগুলো
হয়তো হয়েছে বা হবে বলে ধরে নেওয়া
যায়। কিন্তু প্রশ্ন
উঠেছে, পাটুরিয়ার ভাটিতে
যেখানে স্বল্প দূরত্বে
বর্তমান পদ্মা সেতু
নির্মিত হয়েছে,
সেখানে নানা প্রতিকূল
পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে
হয়েছে। প্রধান কারণ, একমুখী নদীর
খরস্রোত ও গভীরতা। পাটুরিয়ায়ও
একই বিষয় রয়েছে। গঙ্গা
ও যমুনা নদীর
মিলিত স্রোত মিশেছে
দৌলতদিয়ায় এবং এখানেই
পদ্মা নদীর উৎস। পদ্মা
সেতুর চেয়ে এখানে
প্রায় এক-দেড় কিলোমিটার
দূরত্ব কম। এ কারণেও এ স্থানটি বেছে
নেওয়া হয়ে থাকতে
পারে। তবে যদি উপকারভোগী ও পশ্চাৎভূমির কানেক্টিভিটির
কথা চিন্তা করা হয়,
তা হলে পদ্মা
সেতুর প্রভাব এলাকার
বৃহত্তর অংশ দ্বিতীয়
পদ্মা সেতুরও সুবিধা
পাবে। সে ক্ষেত্রে
একইভাবে দেশের কেবল
দুটি ভূখণ্ড নতুন
আরেকটি দিক দিয়ে
যুক্ত হবে মাত্র। আশির
দশকে আরিচা-বাঘাবাড়ী বিদ্যুতের
গ্রিডলাইন নির্মাণের পর প্রশ্ন উঠেছিল
যদি এই টাওয়ারগুলো
আরেকটু বড় করে সেতুর ডিজাইন
করে তার পাশেই
ঝুলন্ত লাইন নেওয়া
যেত তা হলে ব্রিজও হতো, বিদ্যুৎ লাইনও
পার হতো। যাই হোক,
সেটা ছিল সে সময়ের ভুল। এখন পাটুরিয়ায় দ্বিতীয়
পদ্মা সেতু নির্মিত
হলে নিকট ভবিষ্যতে
ঈশ্বরদী তথা পাবনা-উত্তরবঙ্গের এ অংশে আরেকটি
সেতু নির্মাণের সম্ভাবনা
থাকবে না। অথচ এই অঞ্চলে
ত্রিমুখী সেতু নির্মাণের
প্রস্তাব নিয়ে অনেক
আগে থেকেই জনমানুষের
প্রত্যাশা রয়েছে। ২০১৭
সাল থেকে নতুন
একটি প্রস্তাব সামনে
চলে আসে যা দীর্ঘদিন ধরে বহুলালোচিত। তা হচ্ছে পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী
সেতু। এক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশা
ও প্রস্তাবে বলা হয়,
পাটুরিয়ায় একই পদ্মা
নদীতে আরেকটি সেতু
নির্মাণ না করে বরং আরিচা
থেকে বাম পাশে
পদ্মাপারের রাজবাড়ী এবং ডান পাশে
ঈশ্বরদীর রাখালগাছি চরকে
সংযুক্ত করে ত্রিমুখী
একটি স্টিল কম্পোজিট
ঝুলন্ত সেতু বা গার্ডার টাইপ
সেতু করা যায় কি না। এটা করাটা সম্ভব
সে বিষয়ে নানা
যুক্তি ও কৌশলগত
দিকও ইউটিউবে পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী
সেতুর একটি কল্পিত
নকশা ও প্রস্তাবনাও
দেখানো হয়েছে। এই প্রস্তাবটি জনমানুষের
কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
পাবনা, নাটোর রাজশাহী
তথা উত্তরবঙ্গের বড় একটি অংশে
যোগাযোগের বিকল্প সোজা
পথ হতে পারে। পরিকল্পনাবিদদের
ধারণা, নতুন যেসব
মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা
করা হয়েছে,
সেখানে পাটুরিয়ায় দ্বিতীয়
পদ্মা সেতু নির্মাণের
চেয়ে পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী
সেতু নির্মাণ হবে আরও সময়োপযোগী
ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনমুখী। এরূপ
একটি সেতু হলে দেশের তিনটি
ভূখণ্ডকে যুক্ত করে যোগাযোগ ইতিহাসের
পাতায় যুগান্ত সৃষ্টিকারী
পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত
হতে পারে। তিনটি
ভূ-খণ্ডকে যুক্তকারী
ত্রিমুখী সেতু নির্মাণ
আর্থ-সামাজিক দিকে
বড় ধরনের প্রভাব
রাখতে পারবে। আরও দিক হলো, যমুনায় বঙ্গবন্ধু
সেতু থেকে পূর্ব
তীরে পদ্মা সেতু
পর্যন্ত দূরত্ব কম-বেশি ১১০ কিলোমিটার। আরিচায়
ত্রিমুখী সেতু হলে এ দূরত্ব
উভয় দিক থেকে
মাঝামাঝি হবে। পাটুরিয়ায়
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু
হলে সেখানে ব্যবধান
হবে একদিকে ৭০ কিলোমিটার,
অন্যদিকে ৪০ কিলোমিটার। ঈশ্বরদী
তথা পাবনা বা উত্তরবঙ্গের সঙ্গে
নতুন কোনো কানেক্টিভিটি
স্থাপন হবে না। পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী
সেতু নির্মিত হলে একই সেতু
দিয়ে দেশের তিনটি
ভূ-খণ্ডের মধ্যে
যাতায়াতের সুযোগ করে দিতে পারে।
দ্বিতীয়
একটি বিকল্পের কথাও
ভাবা যেতে পারে। পদ্মা-যমুনার তিনটি
ভূ-খণ্ডের কানেক্টিভিটি
তৈরিতে আরিচায় যমুনা
নদীর মধ্য দিয়ে
সোজা পশ্চিমে ঈশ্বরদীর
রাখালগাছি চর পর্যন্ত
৯ কিলোমিটার দীর্ঘ
সেতু নির্মাণ করা যেতে পারে। এর পর রাখালগাছি
থেকে তিন কিলোমিটার
সংযোগ সড়ক করে রাজবাড়ী-ধাওয়াপাড় পদ্মায়
এ সেতুর দ্বিতীয়
অংশ ৪ কিলোমিটার
নির্মাণ করে ত্রিমুখী
যাতায়াত ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে
মোট সেতুর দৈর্ঘ্য
হবে ১৩ কিলোমিটার
এবং খরচ প্রায়
ত্রিমুখী সেতুর মতো একই পরিমাণ
হতে পারে। রাখালগাছি
থেকে বাঁয়ে রাজবাড়ী
এবং ডানে ঈশ্বরদী
অংশ সংযোগ সড়কে
যুক্ত হলে তিন ভূ-খণ্ডে যানবাহনের
মুভমেন্ট সৃষ্টি হবে। ত্রিমুখী
সেতু নির্মিত হলে তা দিয়ে
পদ্মা সেতুর দ্বিগুণ
যানবাহন পারাপার হতে পারে। কারণ, এটা দেশের
তিনটি ভূ-খণ্ডকে যুক্ত
করে নতুন কানেক্টিভিটি
তৈরি করবে। তা হবে দেশের
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের
ক্ষেত্রে বড় ধরনের
প্রভাবক। এমন একটি
মেগা প্রকল্প নেওয়া
হলে ২০২৯-২০৩০ সালের
মধ্যে তা বাস্তবায়ন
করা সম্ভব। কারণ, পদ্মা সেতু
নির্মাণ করতে গিয়ে
এদেশীয় প্রকৌশলী তথা অন্যান্য বিশেষজ্ঞ
ক্যাটাগরির মানুষের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, শ্রমিকের যে দক্ষতা বেড়েছেÑ সেটাও বড় সম্পদ। তা ছাড়া এমন একটি ত্রিমুখী
সেতুর মেগা প্রকল্প
বাস্তবায়ন করতে গিয়ে
দেশীয় সিমেন্ট,
রড, স্টিলসহ অন্য
যেসব সামগ্রী ব্যবহার
করা হবে,
তাতে দেশীয় এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের
ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু
হবে। পাটুরিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের আগে পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী সেতু নির্মাণের বিকল্প প্রস্তাবের সম্ভাব্যতা যাচাই করার বিষয়টি নীতিনির্ধারকরা প্রাধান্য দিলে আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথ আরও বিস্তৃত করার সুযোগ থাকবে।