ফিলিস্তিন সংকট
মাহা নাসার
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৩ ১৩:৫৪ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
৪ জুলাই জেনিন থেকে ইসরায়েলি সেনারা সরে যায়।
টানা দুই দিন ভারী বোমাবর্ষণ ও স্থল-অভিযান পরিচালনায় ১২ ফিলিস্তিনি মারা যায় এবং অন্তত ১০০ জন আহত হন।
ইসরায়েলি বাহিনীর মতে, এটি একটি ‘জঙ্গিবিরোধী অভিযান’। ইসরায়েলি
সেনাদের হত্যার অনুমতিও দেওয়া ছিল। হামলার
ঘটনা নতুন কিছু নয়। জেনিন
শহরের একদম শেষপ্রান্তে ওয়েস্ট ব্যাংকের পশ্চিমে ইসরায়েলি সেনা এবং ফিলিস্তিনের জঙ্গি সংগঠনের সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। ৩ জুলাই ইসরায়েল প্রশাসন মূলত তাদের ভাষায় জেনিনে অভিযান পরিচালনা করেছে জঙ্গি তৎপরতাকে সামাল দিতে। ইসরায়েলের নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এটি ‘ওয়ান টাইম অ্যাকশন’ হবে না।
আমি নিজে ফিলিস্তিনের ইতিহাসের ওপর গবেষণা করেছি।
এই অঞ্চলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে, কেন সম্প্রতি জেনিন ক্যাম্পে একের পর এক হামলা হচ্ছে।
জেনিন মূলত কৃষিনির্ভর শহর। এর
ইতিহাস প্রাচীন। ফিলিস্তিনের প্রতিরোধের অঞ্চল হিসেবেই এই শহর ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
১৯৪৮ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়ে এই অঞ্চলের মানুষ ইসরায়েলি সেনাদের প্রতিহত করতে সফল হয়েছিল।
ওই যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের অনেক শরণার্থী এখানে এসে আশ্রয় নেয়।
তা ছাড়া ফিলিস্তিনের যেসব অঞ্চল ইসরায়েলের করায়ত্বে চলে যায়, সেসব অঞ্চল থেকেও অনেকে এখানে আশ্রয়ের সন্ধানে চলে আসে।
পর্বতঘেরা জেনিন ফিলিস্তিনের ভেতরাঞ্চলে অবস্থিত থাকায় জর্ডানের থেকেও নিরাপদ থাকতে পারে।
১৯৫৩ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জেনিন ক্যাম্প স্থাপন করে শহর থেকে পশ্চিমে।
ক্যাম্পের বাসিন্দাদের তখন থেকেই প্রয়োজনীয় রসদ যেমন খাবার, বাসস্থান ও শিক্ষা
দেওয়া হয়। ক্যাম্পের
পরিস্থিতি সব সময়ই কঠিন।
ক্যাম্প চালু হওয়ার প্রথমদিকে শরণার্থীদের দীর্ঘ সারিতে খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। যুগের
পর যুগ তাদের সংকীর্ণ মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ে বিদ্যুৎ কিংবা পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না।
জেনিন ক্যাম্প শিগগিরই জনবহুল হয়ে পড়ে।
ওয়েস্ট ব্যাংকের ১৯টি শরণার্থী শিবিরই জনসংখ্যাবহুল ও দারিদ্র্যক্লিষ্ট। তা
ছাড়া গ্রিনলাইনের সন্নিকটেই এদের অবস্থান। গ্রিনলাইনের মতো সামরিক সেনানির্ভর সীমা ইসরায়েলের জন্য ডি ফ্যাক্টো সীমান্ত হিসেবে কাজ করে।
ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রত্যেকেই নিজের আদিভূমি দেখতে পান। তারা
ক্যাম্পে থেকেই দেখতে পারেন কোথা থেকে তাদের পালিয়ে আসতে হয়েছে। অথচ তাদের সেখানে ফিরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
১৯৬৭ সালের পর থেকে ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থানও শক্তপোক্ত হয়।
ইসরায়েলের অভিযান শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের জন্য কিছু সমস্যা তৈরি করে। ফিলিস্তিনের
বাসিন্দাদের কোনো নিজস্ব রাষ্ট্র নেই। রাষ্ট্রচ্যুত
এসব মানুষ নিজ বাসভূমে ফিরতে পারছে না।
কিন্তু ইসরায়েলের সেনাদের জন্য তারা ভালোভাবে জেনিনেও বসবাস করতে পারছে না। মানবাধিকার
সংগঠনগুলো বহুদিন ধরে তাদের এই অবস্থানকে ‘পদ্ধতিগত বৈষম্য’ বলে অভিহিত করে আসছে।
এই বৈষম্যের মধ্যে জোর করে দেশত্যাগ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ভূমিবণ্টনের
বৈষম্যও অন্তর্ভুক্ত। আর কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে ক্যাম্পের তরুণরা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।
১৯৮০ সালে ব্ল্যাক প্যান্থার নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে। এই
জঙ্গি সংগঠনটি ফিলিস্তিনের ন্যাশনালিস্ট ফাতাহ অর্গানাইজেশনের সঙ্গে আঁতাত করে। তারা
সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলের ওপর হামলা করে তাদের ভূমি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালায়।
প্রথম ইনতিফাদা নামে একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়। ১৯৮৭
থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এই বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং ইসরায়েলি সেনারা নানাভাবে এই বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা চালায়।
তখনও জেনিন ক্যাম্পে বহুবার তারা অভিযান পরিচালনা করে। তখন
জঙ্গি সংগঠনের সদস্য সন্দেহে অনেককে আটক করা হয়।
এই কাজের জন্য তাদের অনেক সময় পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।
তাদের ঘর ধ্বংস করে দেওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়দেরও আটক করা হচ্ছিল।
এই একপেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিলিস্তিনের মানুষের মধ্যে এক ধরনের ধারণা গড়ে ওঠে।
ইসরায়েলের এই আক্রমণ প্রতিহত করতে হলে তাদেরও কড়া জবাব দিতে হত।
১৯৯০ সালের অসলো শান্তি প্রক্রিয়া ইসরায়েল সরকার ও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিদের মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করে।
তখন অনেক জঙ্গি সংগঠনের প্রত্যাশা ছিল এবার হয়তো ইসরায়েলের সহিংসতা থামানো সম্ভব হবে আলোচনার মাধ্যমে।
কিন্তু জেনিন ক্যাম্পের বাসিন্দাদের ভোগান্তি কমেনি। তাদের ওয়েস্ট ব্যাংকে প্রান্তিক জীবন যাপন করতে হয়।
১৯৯৫ সালে ফিলিস্তিন অথরিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর সামান্যই উন্নতি হয়েছে তাদের জীবনে।
ফ্রিডম থিয়েটারের মতো স্বাধীন প্রজেক্ট ক্যাম্পে শরণার্থী শিশুদের রিলিফের ব্যবস্থা করেছে।
কিন্তু তা সহিংসতা ও দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের
এই শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না।
২০০০ সালেই দ্বিতীয় ইনতিফাদা শুরু হয়। ক্যাম্পের
অনেক তরুণ জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হতে শুরু করে।
তাদের মধ্যে জাকারিয়া জুবেইদির নাম উল্লেখ করতে হয়।
তিনি ফাতাহর অধীন আল-আকসা মার্টিয়ার্স ব্রিগেড গড়ে তোলেন।
১৯৮০ সালের তরুণদের মতোই তারা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে এই অভিযান বন্ধের প্রত্যাশা করছিলেন।
২০০২ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলি সেনারা জেনিন ক্যাম্পে অভিযান পরিচালনা করে। সশস্ত্র
বাহিনীদের চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই এ অভিযান।
তখন তরুণ এই সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে সেনাদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়।
এরপর থেকেই জেনিনকে ‘বিপ্লবের রাজধানী’ বলে অভিহিত করা হয়।
এই ঘটনার পর শান্তি সংলাপ আরও বিলম্বিত হতে শুরু করে। ইসরায়েল অবৈধভাবে অনেক ভূমি দখল করে দেখেছে এবং ইসরায়েলের রক্ষণপন্থি রাজনীতিকদের সরকারব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করায় এই ক্যাম্পের ওপর অনেকের বিতৃষ্ণা বাড়তে শুরু করে। বেশ কয়েকটি পোলে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনের মানুষ এখন সশস্ত্র বিপ্লবকে মুক্তির পথ বলে মনে করছে। জেনিন ক্যাম্পে ক্রমেই অস্ত্র সরবরাহ এবং জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা ইসরায়েলকে নানা সংকটের মুখে ফেলেছে। ২০২২ সালে এ জন্য ক্যাম্পে তাদের অভিযানও বাড়তে শুরু করেছে। তাদের এমন এক অভিযানে ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত আমেরিকান সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ গুলিবদ্ধ হয়ে মারা যান। অধিকাংশ সাংবাদিকের মতে, সাম্প্রতিক অভিযানটি ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযান বলে অভিহিত হয়েছে। কিন্তু এই অভিযানটি হওয়ারই ছিল। কয়েক দশকের বিপ্লব আর মুক্তিকামী মানুষের আগ্রাসন দমাতেই করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এই অভিযানে মৃত্যু ও ধ্বংস উপত্যকা এই বিদ্রোহ আরও বাড়িয়ে তুলবে বলেই মনে হচ্ছে।
দ্য কনভার্সেশন থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ :
আমিরুল আবেদিন