স্মরণ
ছবি : সংগৃহীত
‘ডোরাকাটা দাগ
দেখে বাঘ চেনা যায়।/বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়।/মুখ ঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায় মানুষকে
কি দেখে চিনবে বলো।’ দস্যু বনহুর চলচ্চিত্রে গীত এই গানটির মতো অসংখ্য স্মরণীয় গানের
রচয়িতা ফজল-এ-খোদা মুখোশের আড়ালে ঢাকা মানুষের দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন দুই বছর। তার
রচিত গান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গানের জরিপে সেরা কুড়িতে স্থান পেয়েছে। ২০০৬ সালে বিবিসি
পরিচালিত জরিপে শ্রোতাদের ভোটে তালিকা করা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কুড়িটি বাংলা গানের।
সে তালিকায় ১২তম স্থানে উঠে আসে ভাষা আন্দোলন ও ভাষা শহীদদের স্মৃতিতে ফজল-এ-খোদার
লেখা এবং মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের সুর করা ‘সালাম সালাম হাজার সালাম/সকল শহীদ স্মরণে’
গানটি। ধারণা করা হয়, মহান একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাত ফেরিতে গাওয়া আব্দুল গাফফার চৌধুরীর
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’-এর পরে এই গানটিই গাওয়া হয় সর্বাধিক।
পাবনা জেলার বেড়া
উপজেলার বনগ্রামে ১৯৪১ সালের ৯ মার্চ জন্ম ফজল-এ-খোদার। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ
বেতারের পরিচালক। ১৯৬৩ সালে বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার হয়েছিলেন, পরের বছরই তালিকাভুক্ত
হন টেলিভিশনের। শিশু-কিশোর সংগঠন শাপলা শালুকের আসরের প্রতিষ্ঠাতা ‘মিতা ভাই’ হিসেবে
পরিচিত ফজল-এ-খোদার সম্পাদনায় শিশু-কিশোরদের মাসিক পত্রিকা ‘শাপলা শালুক’-এর প্রকাশনা
শুরু সত্তরের দশকে। নিজে লেখালেখি শুরু করেছিলেন ছড়ার মাধ্যমে। প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থ
১০টি। এ ছাড়াও কবিতা, গানের সংকলন, নাটক, প্রবন্ধ, শিশু সাহিত্য মিলিয়ে তার প্রকাশিত
বইয়ের সংখ্যা ত্রিশের অধিক।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যায় ঘটনায় যখন পুরো জাতি স্তব্ধ, তখনও তিনি ছিলেন
প্রতিবাদী। বেদনায় নীল হলেও মানুষ যখন ভেতরের দহনকে প্রতিবাদের ভাষা দিতে ভয় পেয়েছে
তখন তিনি ঘাতকের রক্তচক্ষুকে ভয় না পেয়ে সরকারি চাকরি করেও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে
লিখেছিলেন, ‘ভাবনা আমার আহত পাখির মতো/ পথের ধুলোয় লুটোবে/সাত রঙে রাঙা স্বপ্ন-বিহঙ্গ/সহসা
পাখনা লুটোবে/এমন তো কথা ছিল না।’ গানটি বশীর আহমেদের সুরে এবং মোহাম্মদ আবদুল জাব্বারের
কণ্ঠে ১৯৭৬ সালে বেতারে প্রচারিত হয়।
অণুজীব করোনা-১৯
এর তাণ্ডবে পুরো পৃথিবী যখন বন্দি, আতঙ্কে কাঁপছে পুরো বিশ্ব, সেই আতঙ্কের রেশ যখন
কাটতে শুরু করছে, আবার জেগে উঠতে শুরু করেছে পৃথিবী, তখনই করোনা কেড়ে নেয় অনেক কালজয়ী
গানের স্রষ্টা ফজল-এ-খোদাকে। দীর্ঘদিন ধরে ডিমেনশিয়া ও কিডনি রোগে আক্রান্ত ফজল-এ-খোদা
৪ জুলাই, ২০২১ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ৮০ বছর বয়সে মারা যান রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে।
জীবিতাবস্থায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননার দেখা না পাওয়া ফজল-এ-খোদা ‘মুখোশের পৃথিবীতে’ ছেড়ে চলে গেলেও মৃত্তিকার পৃথিবীতে নিজের সুচিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালে একটি আইসিইউ শয্যারও
দেখা পাননি। অসংখ্য মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ফেরা জনপ্রিয় গানের কলির রচয়িতা ফজল-এ-খোদা
লিখেছিলেন, ‘ভালোবাসার মূল্য কত/আমি কিছু জানি না/এ জীবন তুল্য কি তার/আমি সে তো বুঝি
না/আমি না জেনে না বুঝে নিলাম তোমার মন/পরে বেশি দাম চেয়ো না।’ তিনি বেশি দাম চাননি,
মানুষের ভালোবাসা-শ্রদ্ধায়ই সন্তুষ্ট ছিলেন। তার প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধায় তাকে
স্মরণ করি।