সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৩ ০০:১৮ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
যাদের
শ্রমে-ঘামে দেশের
নির্মাণশিল্প বিকশিত,
তাদের জীবন কতটা
নিরাপত্তাহীন এর সাক্ষ্য
মেলে প্রায়ই। আগের
যেকোনো সময়ের তুলনায়
আমাদের নির্মাণ খাতের
পরিধি অনেকে বিস্তৃত
হলেও, নির্মাণশ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র
ও জীবনের নিরাপত্তা
কতটা ঝুঁকির মুখে
রয়েছে তা-ই প্রতিভাত
হয়েছে ২ জুলাই
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত
প্রতিবেদনে। ‘ওদের কথা কেউ ভাবে
না’ শিরোনামে প্রকাশিত
ওই প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তা আমাদের উদ্বিগ্ন
না করে পারে
না। জানা গেছে, গত সাড়ে
দশ বছরে কর্মক্ষেত্রে
দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে
১ হাজার ৪০৫ জন নির্মাণশ্রমিকের। পঙ্গু
হয়ে মানবেতর জীবনযাপন
করছেন সেই সংখ্যা
কত, এর সঠিক
চিত্র না পাওয়া
গেলেও তাদের তালিকাও
যে অনেক দীর্ঘ, এ আর বলার অপেক্ষা
রাখে না। পঙ্গুত্ব
বরণকারী নির্মাণশ্রমিকদের মানবেতর
জীবনযাপনের পাশাপাশি তাদের
পরিবার-পরিজনদেরও দুর্বিষহ
বেদনার ভার বইতে
হচ্ছে। অভিযোগ আছে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পায় না ক্ষতিপূরণও। বেসরকারি
প্রতিষ্ঠান সেফটি অ্যান্ড
রাইটস সোসাইটির
(এসআরএস) জরিপের তথ্যমতে, নির্মাণশ্রমিকদের হতাহতের
পাশাপাশি তাদের পরিবার-পরিজনের সীমাহীন
কষ্টের কথাও উঠে এসেছে।
আমরা
জানি, আমাদের সংবিধান
নির্দেশিত রাষ্ট্রীয় মৌলিক
দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে
ন্যায্য মজুরির বিনিময়ে
নিরাপদ কর্মসংস্থান। কর্মক্ষেত্রে
নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশ যাপনের
অধিকারের কথাও সংবিধানে
উল্লেখ রয়েছে,
যা শ্রমিক আইন দ্বারা সুরক্ষিত
অধিকারও বটে। কিন্তু
দুঃখজনক হলেও সত্য, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই
তারা কতটা অধিকারবঞ্চিত
এই চিত্রও ইতোমধ্যে
বহুবার সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছে। কর্মক্ষেত্রে
শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত
করার মানবিক দাবিটি
নতুন নয়। আমরা
দেখেছি, তাদের অধিকার
সুরক্ষায় বিভিন্ন সংগঠন
দাবি জানিয়ে আসছে
বটে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে
বাস্তবায়ন চিত্র কতটা
বিবর্ণ এর সাম্প্রতিক
সর্বশেষ সাক্ষ্য মিলেছে
২৪ জুন রাজধানীর
ডেমরায় একটি নির্মাণাধীন
ভবনের কনটেইনারসহ ক্রেনের
হুক ছিঁড়ে পড়ে তিনজন শ্রমিকের
মর্মন্তুদ প্রাণহানির মধ্য
দিয়ে। এর দুই দিন আগে রাজধানীর আফতাবনগরে
আরও দুজনের প্রাণহানি
ঘটে। ভবন নির্মাণ
করতে গিয়ে নির্মাণশ্রমিকরা
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষের অবহেলা-উদাসীনতায় যে মর্মন্তুদতার শিকার
হচ্ছেন, তা কোনোভাবেই
মেনে নেওয়া যায় না। আমরা
জানি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ
নিশ্চিত করা তো বটেই,
একই সঙ্গে পেশাগত
স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও
গুরুত্বসহকারে নীতিমালাভুক্ত রয়েছে। কিন্তু
নির্মাণ খাত কর্তৃপক্ষের
চরম দায়িত্বহীনতা,
খামখেয়ালিপনা, মানবিক আচরণের
প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন
ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালার
ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে
শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির
মুখে রেখে তাদের
মাশুল গুনতে হচ্ছে। আরও অভিযোগ উঠেছে, নির্মাণশ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে
নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি তুললে
অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্বে
থাকা লোকজন তাদের
কাজ বন্ধ করে দিয়ে বিদায়
করে দেন!
বিষয়টি কতটা অমানবিক
ও জীবনের প্রতি
অবজ্ঞা তা আর বলার অপেক্ষা
রাখে না।
কার্যত
নীতিমালা, আইন কিংবা
নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ
করা হচ্ছে না বলেই নির্মাণশ্রমিকদের
হতাহতের মর্মান্তিক ঘটনা
ঘটে চলেছে। নগর-মহানগর-শহরের ঔজ্জ্বল্য
ক্রমেই বাড়লেও পরিতাপের
বিষয় হলো,
নির্মাণশ্রমিকদের বেদনা কোনোভাবেই
যেন ঘোচে না। এভাবে
চলতে পারে না, চলতে দেওয়া
যায় না। ব্যক্তি
বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
যে বা যারাই
নির্মাণশ্রমিকদের নিয়োগ করে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করার দায়ও
সর্বাগ্রে তাদেরই। আমরা
মনে করি,
যারা এর ব্যত্যয়
ঘটিয়ে চলেছেন,
তারা কোনোভাবেই ছাড় পেতে পারেন
না। নির্মাণ খাতে
আইন ও বিধিমালাগুলো
যাতে যথাযথভাবে অনুসরণ
করা হয় এজন্য
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর
তদারকি বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে শ্রমিকের
নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সম্মিলিত
সেফটি কমিটি গঠনের
ব্যাপারেও গুরুত্ব দেওয়া
জরুরি।
ইমারত
শ্রমিক ইউনিয়নের কেউ কেউ বলেছেন, নির্মাণশ্রমিকদের দুর্ঘটনায়
মৃত্যু নয়,
এমন মর্মান্তিক ঘটনা
তারা অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড
বলেই মনে করেন। আমরা
জানি, কর্মস্থলে শ্রমিকদের
যথাযথ নিরাপত্তা,
তাদের স্বাস্থ্যগত পরিবেশ
বিদ্যমান কি না, এসব বিষয়
দেখভালের জন্য সরকারের
দায়িত্বশীল সংস্থা রয়েছে। বিগত
দশ বছরের যে মর্মস্পর্শী চিত্র
সেফটি অ্যান্ড রাইটস
সোসাইটির জরিপসূত্রে প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ উঠে এসেছে,
এর যথাযথ প্রতিকার
সঙ্গতই আমরা প্রত্যাশা
করি। মানুষের জীবন
কোনোভাবেই তুচ্ছ হতে পারে না। আইন ও নীতিমালা
লঙ্ঘনকারীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত
করার পাশাপাশি নির্মাণশ্রমিকদের
দুর্ঘটনাজনিত কারণে
কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপযু্ক্ত ক্ষতিপূরণ
প্রদানও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের
বীমার আওতায় আনার
বিষয়টিও ভাবা প্রয়োজন। মনে রাখা উচিত, এই বিষয়গুলো
শুধু আইনি বিষয়ই
নয়, নৈতিক ও মানবিকতার বিষয়ও
বটে।