সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৩ ০০:৩৪ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
অবৈধভাবে অভিবাসন প্রচেষ্টার ফল কতটা মর্মান্তিক হতে পারে, এর অনেক নজিরই আমাদের সামনে রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তার পরও বন্ধ হয়নি জীবনযাত্রার মান উন্নতকরণের লক্ষ্যে ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। ২৪ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ভূমধ্যসাগরে ট্রলারডুবি : নরসিংদীর ১৩ যুবক নিখোঁজ, একজনের মরদেহ উদ্ধার’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ফের এরই মর্মন্তুদ সাক্ষ্য দিল। দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে ভাগ্যান্বেষী কিছু যুবক লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইতালি যাচ্ছিলেন। মাঝপথে ভূমধ্যসাগরে ট্রলারডুবিতে বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার ১৩ যুবকের নিখোঁজের খবর মেলে। এর মধ্যে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ট্রলারে আরও অনেকেই ছিলেনÑ যাদের মধ্যে নারীসহ আরও বাংলাদেশি রয়েছেন। আমাদের স্মরণে আছে, গত মার্চে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় ১৭ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। লিবিয়া থেকে অবৈধপথে তারাও ইতালি যাচ্ছিলেন।
আমরা
দেখছি, বিগত কয়েক
বছর ধরে বাংলাদেশিদের
লিবিয়া হয়ে ইউরোপ
যাওয়ার বিপজ্জনক ঝোঁক
বেড়েছে। ইতোমধ্যে লিবিয়া
উপকূলে দেশটির কোস্টগার্ডের
সদস্যদের হাতে ইতালিগামী
অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী আটক হন,
আবার অনেকের সলিলসমাধি
ঘটেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীল মহলগুলোর তরফে
অবৈধ অভিবাসনের ব্যাপারে
বারবার সতর্কতা জারি
করে সচেতনতা সৃষ্টির
প্রয়াস চালানো সত্ত্বেও
এর যে কোনো
ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি, ভূমধ্যসাগরে ফের সংঘটিত ঘটনাটি
এরই সাক্ষ্যবহ। আমরা
জানি, অতীতে জল ও স্থলপথে
মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনের
ফাঁদে পা দিয়ে
অনেকেই বিভিন্ন দেশে
কর্মসন্ধানে পা বাড়িয়ে
চরম বিপদে পড়েন। ইউরোপের
দেশগুলোতে উন্নত জীবনযাপন
ও কর্মের সন্ধানের
পথ বাতলে দিয়ে
দালালরা বিপুল অঙ্কের
টাকা হাতিয়ে নিয়ে
অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে
যে ক্ষতের সৃষ্টি
করেছে, তা অপূরণীয়। সংবাদমাধ্যমেই
বহুবার উঠে এসেছে, দালালদের প্রলোভনের
ফাঁদে পা দিয়ে
ভিটেমাটি খুইয়ে উন্নত
জীবনের প্রত্যাশায় বিদেশ
যেতে গিয়ে রিক্ত
হাতে আবার অনেকেই
স্বভিটায় ফিরে এসেছেন। তা ছাড়া অনেক
ক্ষেত্রেই প্রবাসে অবস্থানরত
অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের
জীবনযাপনের আরও মর্মস্পর্শী
অনেক ঘটনাই ঘটেছে। এক সময় মালয়েশিয়া
ও থাইল্যান্ডের জঙ্গলে
অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা বাংলাদেশিদের কঙ্কালপ্রাপ্তি
ও গণকবরে দেহাবশেষ
উদ্ধার সংবাদের শিরোনাম
হতো। সম্প্রতি নৌপথে
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে
যাওয়ার প্রচেষ্টা এবং অনেক ক্ষেত্রে
অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের করুণ
পরিণতির খবর সংবাদমাধ্যমে
প্রায়ই উঠে আসছে। সার্বিকভাবে
বলা যায়,
বাংলাদেশ থেকে ব্যাপকহারে
অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ
অভিবাসন ঘটেছে এবং ঘটছে।
দেশের
কর্মহীনদের অবৈধ অভিবাসী
হওয়ার অভিশাপ থেকে
রক্ষা করে নির্বিঘ্ন
জীবনযাপনের পথ মসৃণ
করতে কাগজে-কলমে অনেক
পরিকল্পনা নেওয়া হলেও
বাস্তবে যে এর রূপদান কাঙ্ক্ষিত
মাত্রায় হয়নিÑ
ভূমধ্যসাগরে সংঘটিত সাম্প্রতিক
সর্বশেষ ঘটনাটি এরও সাক্ষ্য দেয়। ডিজিটাল
বাংলাদেশ ও আগামীর
স্মার্ট বাংলাদেশের সুফল
সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়
পৌঁছে দেওয়ার জন্য
অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ
অভিবাসনের পথ রুদ্ধ
করতেই হবে। এর প্রতিরোধে প্রশাসনিক
ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে
সামাজিক উদ্যোগ নেওয়ার
বিষয়টিও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসন
আমাদের জন্য অবশ্যই
আশীর্বাদ। কিন্তু অবৈধ
অভিবাসন কোনোভাবেই যে কল্যাণকর নয়, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন
করে দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। আমরা
দেখেছি, দালালচক্রের ফাঁদে
পা দিয়ে শিক্ষিতও
অনেকেই প্রতারণার শিকার
হয়ে পথে পথে ঘুরছেন। দালালদের
হাতে অর্থ ও জীবন সঁপে
দিয়ে যারা উন্নত
জীবন ও কর্মপ্রত্যাশার
স্বপ্নে বিভোর,
তাদের হুঁশ ফিরুক। যে অর্থ দালাল
চক্রের হাতে তুলে
দিয়ে যারা উন্নত
জীবনের পথ খোঁজেন, এর চেয়ে
অনেক কম অর্থ
বিনিয়োগ করে দেশে
আত্মকর্মসংস্থানের পথ বের করা দুরূহ
নয়। এ ব্যাপারে
সাধারণ মানুষের মধ্যে
সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি
কর্মসৃজনের পথ সম্প্রসারিত
করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ
নিতে হবে।
আমাদের
দেশে ১৮ থেকে
৪০ বছর বয়সি
নাগরিকের সংখ্যা বিশ্বের
অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও
বেশি। এই জনগোষ্ঠীকে
মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে যদি দেশ-বিদেশে নিয়মতান্ত্রিক
পন্থায় কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ত
করা যায়,
তাহলে সার্বিক প্রেক্ষাপট
বদলে দেওয়াও দুরূহ
নয়। একই সঙ্গে
নতুন নতুন শ্রমবাজার
সন্ধানের পাশাপাশি কর্মোদ্যোগীদের
স্বচ্ছপথে বিদেশ যাওয়ার
ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে
হবে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা কম হয়নি বটে, কিন্তু মানবপাচারের
অভিশাপ ঘোচানো যায়নি। আমরা
মনে করি,
যারা জীবনবিনাশী এই অপতৎপরতায় লিপ্তÑ তাদের মূলোৎপাটন
করে কর্মক্ষমদের জীবনমানের
নিশ্চয়তার বিধান নিশ্চিত
করা জরুরি। আমরা
চাই, বাংলাদেশিরা বিশ্বের
বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে
পড়ুক। কিন্তু কোনোভাবেই
তা অবৈধপথে নয়।