রাশিয়া
নিনা এল. ক্রুশ্চেভা
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৩ ০০:২৫ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ যে পরিকল্পনা অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে না তা সহজেই অনুমেয়। রাশিয়ার মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিন রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ওপর একের পর এক আক্রমণ পরিচালনা করছে। রাশিয়ার ভাড়াটে সেনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভাগনারের প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিন মস্কোর সামরিক নেতৃত্বকে উৎখাতের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার বাহিনীর যোদ্ধাদের ওপর হামলাকারী এসব সামরিক নেতাকে উৎখাতের জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাবেন। এদিকে রাশিয়ার প্রসিকিউটর জেনারেল বলেছেন, সশস্ত্র বিদ্রোহের মামলায় ভাগনার প্রধানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ৬২ বছর বয়সি ইয়েভজেনি প্রিগোজিন বলেছেন, তার বাহিনী এরই মধ্যে ইউক্রেন সীমান্ত থেকে রাশিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রেমলিন যেহেতু নিয়ন্ত্রণ রেখেছে দাবি করছেÑ তা হলে ওয়াগনার বাহিনী এভাবে আক্রমণ চালিয়ে পার পায় কী করে? ভ্লাদিমির পুতিন এদিকে বলেছেন, ইয়েভেনি প্রিগোজিন রাশিয়ার সামরিক ক্যাম্পগুলোতে সিপাহী বিদ্রোহ সংগঠিত করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভ্লাদিমির পুতিন বিশেষায়িত সামরিক
বাহিনী তৈরি করেন নিজের একাধিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। ইউক্রেনের পুরো অঞ্চলকে
ইউক্রেনের সেনামুক্ত করার পর তিনি পূর্ব ডনবাস অঞ্চল স্বাধীন করার পরিকল্পনা
করেছিলেন। পুতিন এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার মুহূর্তে রাশিয়ার ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। তা ছাড়া
পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তাকে ইউক্রেন হামলায় বাধ্য করেছে এমন দাবিও করেছিলেন। পুতিন
বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যে পরিবর্তন এনেছেন। এগুলো যুদ্ধের ময়দানের পরিবর্তনের ফলে
ঘটেছে। বিশেষত বিগত এক বছরে একাধিকবার রাশিয়ান সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে
আসতে হয়েছে। তা ছাড়া পুতিনও অনেক কিছু অনুমান করতে পারেননি কিংবা তার
পরিকল্পনা অনুযায়ী তা হয়নি। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে পুতিন জয়ের জন্য ওয়াগনার
বাহিনীর ওপর একটু বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। বিষয়টি পুতিনের জন্য যে ভালো কিছু
বয়ে আনেনি তা রাশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিই বলে দেয়।
মে
মাসে রাজনৈতিক ব্লগার কনস্টানটাইন ডগলভকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রিগোজিন জানান,
“রাশিয়া ইউক্রেনে
হামলা চালিয়ে ‘নাৎসিমুক্তকরণ’ কিংবা ‘সামরিক বাহিনী দূরীকরণ’-এর কিছুই করতে পারেনি। উল্টো তারা
ইউক্রেনকে পুরো বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এই যুদ্ধের শুরুতে যদি তাদের
কাছে ৫শ ট্যাংক ছিল, তা হলে এখন ৫ হাজার ট্যাংক আছে। আর যুদ্ধের
শুরুতে যদি তাদের ২০ হাজার প্রশিক্ষিত সেনা ছিল, তা হলে এখন ৪ লাখ সেনা রয়েছে।”
প্রিগোজিন মূলত
রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণিকে অভিযুক্ত করতে চাচ্ছেন। বিশেষত সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন
কর্মকর্তাদের অনেকেই এই যুদ্ধকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। রাশিয়ানদের প্রিগোজিন
যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বারবার জানিয়েছেন এবং এও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি
সম্ভবত বিদ্রোহ করবেন। প্রিগোজিন তার ঘোষণা বাস্তবায়ন করছেন। প্রিগোশিনের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে
সামরিক আইন চালু করতে হবে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে
হবে। তা না হলে রাশিয়ার কোনো আশা নেই।
প্রিগোশিনের
এই অভিযোগ ফেলে দেওয়ার নয়। রাশিয়ার অভিজাত সামরিক বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণের
ব্যাপারে বরাবরই অনীহা দেখা গেছে। পুতিনের ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টিরই ডুমা
প্রদেশের ডেপুটি কনস্টানটাইন জাটুলিন বলেছিলেন, যুদ্ধে অগ্রসর হয়ে তেমন লাভ নেই। কারণ এর
কোনো ফলাফল নেই। তার মতে, রাশিয়ার উচিত সংগঠিত হয়ে এগিয়ে যাওয়া। এ ছাড়া
কোনো পরিকল্পনা তাদের ছিল না যুদ্ধ নিয়ে। এই সিদ্ধান্ত ভ্রম ছাড়া কিছু নয়। অথচ
রাশিয়ার অভিজাত সমাজের অধিকাংশ মানুষের ধারণাÑ ‘এই যুদ্ধ তারা হারবে না’। এভাবে চলতে থাকলে রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার মতো
রাষ্ট্রে পরিণত হবে। যুদ্ধের নামে তারা মানুষের জীবনযাপনের মান,
নিরাপত্তা, এমনকি সার্বভৌমত্বও ত্যাগ করতে রাজি। তা ছাড়া
রাশিয়া ক্রমান্বয়ে চীনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার বিষয়টিও ভালো কিছু নয়। সবকিছুই রাশিয়ার
নেতার আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য, আর কিছু নয়।
প্রিগোশিনের
অবশ্য এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। রাশিয়ার মানুষ আপাতত তাদের আরামদায়ক জীবন পরিত্যাগ
করে তাদের ‘অনন্য সভ্যতা’ নামক অদ্ভুত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে শামিল
হোকÑ এই
তার প্রত্যাশা। এই স্বপ্ন রাশিয়ার অভিজাতদের মধ্যে নেই দেখে সে ক্ষুব্ধ। বিশেষত
রাশিয়ান অঞ্চলে ইউক্রেন ইতোমধ্যে হামলা পরিচালনা করছে এবং সেখানে অনেক রাশিয়ান
মারা যাচ্ছে। এমন সময়ে একত্রিত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হতে পারে না। প্রিগোশিনের
প্রোপাগান্ডা সহজাতভাবেই সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারেনি। কিন্তু প্রিগোজিন
রাশিয়ানদের জমিয়ে রাখা ক্রোধ উদগিরণের সুযোগ করে দিয়েছে। জানুয়ারিতে মস্কো
গিয়েছিলাম। তখন ক্রেমলিনবাসীদের মধ্যে এই যুদ্ধ নিয়ে বিরক্তি স্বচক্ষে দেখে এসেছি।
রাশিয়ানরা
এখন সবখানেই শত্রুপক্ষ দেখতে পাচ্ছে। তাদের সন্দেহপ্রবণতা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে
যে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সামরিকায়ন হলেও তাদের আপত্তি নেই। হ্যা,
তারা এখনও পুতিনের
সমর্থক। কিন্তু যুদ্ধের দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুতিনের সক্ষমতা নিয়েও তাদের সন্দেহ
বাড়ছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে প্রিগোজিন যে স্বপ্ন দেখছে তা বাস্তবায়নের পথে?
সহজ উত্তর হলো,
এখানে প্রিগোশিনের
প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তার নৃশংসতা ও সক্ষমতার কারণেই তিনি
গুরুত্ব পাচ্ছেন। প্রিগোজিন অবশ্য পুতিনকে সোজাসুজি চ্যালেঞ্জ জানাননি। কারণ তিনি
যখন সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজাতদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন, তখন সঙ্গত কারণেই পুতিনের থেকে নজর সরে
যায়। সম্ভবত প্রিগোশিনের দাবির সঙ্গে পুতিনও অনেকাংশে একমত। এ কথা
মানতে হবে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও পুতিনের পক্ষে মাঠপর্যায়ে
বিপ্লব সংগঠনের সক্ষমতা নেই।
পুতিন একটি কাঠামোর ভেতর থেকে ক্ষমতার চর্চা করছেন। কিন্তু প্রিগোশিনের সে বালাই নেই। কিন্তু এও বুঝতে হবে, প্রিগোজিন নিজেই ওই কাঠামোর দাস। তিনি এতদিন এই কাঠামোর হয়েই কাজ করেছেন। ইতিহাসের পাঠ থেকে শিক্ষা নিতে গেলে তাকে রাসপুতিনের সঙ্গে তুলনা করতে হয়। এই মুহূর্তে রাশিয়ার মূল সমস্যা নেতৃত্ব। পুতিনের সামনের পথ মনে হচ্ছে অন্ধকার। প্রিগোশিনের দাবিগুলোতে তার বিচার করতে হবে সূক্ষ্মভাবে। যদি তা না করতে পারেন তাহলে যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার প্রভাব অনেকাংশে কমে যাবে। বিশেষত এই সামরিক বাহিনী যদি তাদের বিপ্লব পরিচালনা করতে থাকে, তা হলে সামাজিক পর্যায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়বেÑ যা সামাল দেওয়া এক কথায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন