মোদি-বাইডেন বৈঠক
এম হুমায়ুন কবির
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৩ ০২:১১ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
মোদি-বাইডেনের
কাঙ্ক্ষিত বৈঠক দেশীয় সংবাদমাধ্যম তো বটেই,
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বরাজনীতি ও প্রটোকলসহ নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য সফর। বিশেষ আমন্ত্রণে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রটোকল নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন। সফরে নরেন্দ্র মোদিকে সাদরে অভ্যর্থনা জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরে দুই দেশের মধ্যে একাধিক চুক্তি,
সমঝোতা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে,
যার অনেকটাই সামরিক বিষয়াদি কেন্দ্রিক। সবমিলিয়ে কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সফরটিকে সফল বলা যেতেই পারে।
ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিবর্তনের সূচনা ২০০৫ সালে সিভিল নিউক্লিয়ার চুক্তির মাধ্যমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির মাধ্যমে শুধু ভারতের সঙ্গেই পারমাণবিক অবকাঠামো একসঙ্গে ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক দিনে মোদি-বাইডেন
বৈঠকের পূর্বাপর যা দেখা গেছে তাকে বলা যায় ২০০৫ সালের ওই চুক্তির বর্ধিত রূপ। রাষ্ট্রীয়ভাবে জো বাইডেন ও নরেন্দ্র মোদির এই সম্পর্ককে লাভ ও অগ্রগতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে গেলে একাধিক উল্লেখযোগ্য দিক আমাদের সামনে উঠে আসবে। প্রথমত,
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে উন্নত প্রযুক্তি দিতে রাজি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরস ঘোষণা করেছে,
তারা ভারতের হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড বা হ্যালের সঙ্গে মিলে ভারতে বিমানবাহিনীর জন্য জেট ইঞ্জিন তৈরি করবে। এ চুক্তির ফলে যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন তৈরি করবে তারা। এ চুক্তির আওতায় জেনারেল ইলেকট্রিকের তৈরি ই-৪১৪ ইঞ্জিন
এখন ভারতে তৈরি হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে,
যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের উচ্চ প্রযুক্তি এর আগে অন্য কোনো দেশকেই দেয়নি। বর্তমান বিশ্বে জেনারেল ইলেকট্রিকস এবং রোলস রয়েস ইঞ্জিন প্রস্তুতিতে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান বলে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া ভারতের জন্য একটি বড় সুবিধা। দ্বিতীয়ত,
সামরিক বাহিনীর জন্য ভারত তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ড্রোন কিনবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এ ক্ষেত্রে ড্রোন কেনার থেকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ড্রোন প্রযুক্তিকে। এই প্রযুক্তি ভারতের সক্ষমতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেবে। প্রতিরক্ষা,
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি বাদেও ভারতের জন্য রয়েছে আরেকটি সুখবর। যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রন প্রযুক্তিগত সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি ভারতে তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এই বিষয়গুলোর সবই ভারতের বড় অর্জন। কারণ দেশটি অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে উন্নত প্রযুক্তি এনে নিজেদের উৎপাদনগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো,
ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ আইনকানুনের বিষয়ে কিছু পরিবর্তনে রাজি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের সঙ্গে তাদের ভিসা জটিলতা কমানোর আশ্বাস দিয়েছে। এখন মার্কিন অঞ্চলে যে জাহাজগুলো চলাচল করে সেগুলো প্রয়োজনে ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। অর্থাৎ এই বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশে সামরিক,
প্রতিরক্ষা ও উন্নত প্রযুক্তির আদান-প্রদানের
পথ সুগম হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে,
দ্বিপক্ষীয়তার বাইরে এই বৈঠকে সংগঠিত চুক্তি বা আলোচনা এই অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক কী কী ফলাফল আনতে পারে। বলা বাহুল্য,
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন যে বিশ্বকাঠামো ছিল তা পরিবর্তিত হয়ে এখন মাল্টিপোলার বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তা ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছে। এই মাল্টিপোলার বিশ্বে ভারতের মতো শক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র পাশে চায়। কারণ ইন্দো-প্যাসিফিক
অঞ্চল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন একা সামাল দিতে পারবে বলে মনে করছে না। তাই তাদের এই অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য বন্ধু প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া তাদের নির্ভরযোগ্য বন্ধু। এই মুহূর্তে তারা ভারতকে নির্ভরযোগ্য সহায়ক শক্তি হিসেবে পাশে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক
অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তার রোধে ভারতের সহায়তা তাদের জরুরি। অন্যদিকে ভারত এই অনুধাবনে এসেছে,
বিশ্বরাজনীতিতে দেশটি এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই বলেছিলেন,
‘আমরা কারও বিরুদ্ধে অবস্থান করছি না। বরং আমরা আমাদের প্রাপ্য মর্যাদা পেতে চাই।’
আমি মনে করি,
মাল্টিপোলার বিশ্বে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সমন্বয় এই সফরে ঘটেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক
অঞ্চলে চীনের উত্থান ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের
সম্পর্কের সমন্বয়কের প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। বিগত কয়েক বছরে চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত সংঘাতের পর ভারত সহযোগী শক্তি পাশে রাখার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মেনে নিয়েছে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সহায়ক শক্তির সহযোগিতা না পেলে ভারতের পক্ষে চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হয়ে যাবে। এ কারণেই ভারত গত দু-তিন বছর যুক্তরাষ্ট্রের
দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। কাজেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলকে ঘিরে নতুন এক ধরনের ভূ-রাজনীতি
তৈরি হচ্ছে। সেখানে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাইডেন তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এই পররাষ্ট্রনীতির আলোকে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক,
ইউক্রেন যুদ্ধকে দেখতে চাচ্ছেন। যদিও বাইডেন প্রশাসন সার্বিকভাবে মোদিকে ইতিবাচক ভূমিকায় রেখেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ও নানা মহলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বাইডেন যেকোনো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও কাঠামো সুসংহত রাখার পক্ষে। মোদিকে কিন্তু বৈঠকে এ বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। যদিও মোদি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তার পরও গণতন্ত্রের বিষয়টি বৈঠকে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই বৈঠকে মাল্টিপোলার বিশ্ব,
ভূ-রাজনীতি, দ্বিপক্ষীয়
সম্পর্কের পাশাপাশি পরিবর্তনশীল বিশ্বে গণতন্ত্রের গুরুত্বও বেশ জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে। ধারণাগতভাবে আমি মনে করি,
এই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গণতন্ত্রের পক্ষাবলম্বনের বিষয়েও প্রত্যয় পাওয়া গেছে। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয়তার বাইরেও নীতি-নৈতিকতাবিষয়ক
অর্জনও এখানে এসেছে। মোদি-বাইডেন
কাঙ্ক্ষিত বৈঠকে তাকিয়ে ছিল ঢাকা। এর আগেও প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে,
এই বৈঠকে বাংলাদেশ ইস্যু আলোচিত হবে। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয় বা জানা যায়নি। কিন্তু গণতন্ত্র,
মানবাধিকার,
সবার সমান সুযোগ-সুবিধা
নিশ্চিতের বিষয়টি যে গুরুত্বপূর্ণ,
এ বিষয়টি হোয়াইট হাউস থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকেও এ বিষয়টির সঙ্গে একমত হতে হয়েছে। তাই তাদের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে কি না তার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো গণতন্ত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দুই রাষ্ট্রের প্রত্যয়ের ঘোষণাটি।
ভারত,
চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রÑ
এই তিন দেশই আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। চীনকে মোকাবিলার জন্য ভারত-যুক্তরাষ্ট্র
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু এর মানে এই নয়,
প্রভাবের কারণে আমরা কোনো পক্ষাবলম্বন করব। আমাদের কাছে প্রতিটি পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীন,
ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রÑ
এই তিনটি রাষ্ট্রই আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মূলত আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে নির্ধারণ করতে হবে কার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে আমরা সবার সঙ্গেই সম্পর্ক রাখব। কারও সঙ্গে বৈরিতার পথ অবলম্বন করার প্রয়োজন নেই। এ কথা সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদের স্বার্থে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। কারণ চীন এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান আমদানিকারক রাষ্ট্র। তাই চীনকে বাদ দিয়ে আমাদের চলা কঠিন। আবার নিরাপত্তা সহযোগী হওয়ায় ভারতকেও আমরা বাদ দিতে পারব না। ভৌগোলিক অবস্থার কারণেই ভারতের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এ ছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে ভারত দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক রাখতে হবে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। এমনকি কূটনৈতিকভাবে নানা বিষয়েও তারা আমাদের বড় সমর্থক।
রোহিঙ্গা ইস্যু, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমর্থক হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমাদের অভ্যন্তরীণ মতামত যত শক্তিশালী হবে আমরা ততই এগিয়ে যেতে পারব। ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমাদের কূটনৈতিকভাবে কৌশলী হতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের অভ্যন্তরীণ মতামতের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যদি আমরা ঐকমত্যে পৌঁছুতে পারি, তাহলে এই ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।