প্রেক্ষাপট
ডা. শারমিন মিজান, পিএইচডি
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৩ ০০:৩৫ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রথমেই
প্রয়োজন সুষম খাদ্য। যেন তারা বয়স অনুযায়ী সঠিকভাবে বেড়ে ওঠে। অর্থনৈতিক বাস্তবতায়
দেশে সব অভিভাবক সন্তানদের জন্য সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে পারেন না। পুষ্টি বিষয়ে অসচেতনতাও
অনেকাংশে দায়ী। ফলে সমাজে শিশুদের একাংশ বিকাশের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে।দ্রুত নগরায়ণ
ঘটছে এমন শীর্ষস্থানীয় ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা
ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী আমাদের শহরগুলোতে বসবাসকারী পাঁচ কোটি তিন লাখ মানুষের মধ্যে
৪০ শতাংশই শিশু। বছর পাঁচেক আগে পরিচালিত ‘চাইল্ড ওয়েল বিয়িং সার্ভে’ এবং এমআইসিএসের
তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে বস্তিতে থাকা শিশুদের অবস্থা গ্রামের শিশুদের চেয়ে অনেক খারাপ।
এর কারণ শিশুদের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর উপাদানের অনুপস্থিতি।
শহরাঞ্চলে দরিদ্র পরিবারগুলোতে বাড়ন্ত শিশুদের
পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক মা-বাবা শিশুসন্তানদের
মায়ের দুধের সম্পূরক খাবার কখন ও কীভাবে দিতে হবে সে সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না।
অথচ শিশুর জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ এবং পরবর্তী সময়ে সম্পূরক হিসেবে
পরিমাণ মতো শর্করা, আমিষ, খনিজ এবং ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের
জন্য খুবই জরুরি। কারণ বয়স উপযোগী পুষ্টিকর খাবার খাওয়ালে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
তৈরি হয়, পশাপাশি তার শারীরিক গঠনও উন্নত হয়।দুঃখের বিষয়, দেশে তীব্রতম অপুষ্টিতে আক্রান্ত
শিশুদের বাবা-মায়ের অসচেতনতা এই সংকট মোকাবিলায় বড় বাধা। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে,
শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির তীব্র মাত্রার প্রকোপ বেড়েছে। ২০২১ সালে তীব্রতম অপুষ্টিতে
আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল ২০২০ সালের তুলনায় ৭২ শতাংশের
বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, তীব্রতম
অপুষ্টি পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিভিন্ন
সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের সিটি করপোরেশন ও বিভাগীয় শহরের বস্তিতে পাঁচ বছরের কম বয়সি
৪০ শতাংশ শিশু অপুষ্টিজনিত খর্বকায় অর্থাৎ বয়স অনুযায়ী তাদের যে দৈহিক উচ্চতা থাকার,
তা হয়নি। অপুষ্টির কারণে শিশুরা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয় বেশি। এমন শিশুর শিক্ষা থেকে
ঝরে পড়ারও ঝুঁকি থাকে। তাদের কর্মদক্ষতাও অন্যদের তুলনায় কম। আমরা জানি, জন্মের এক
ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে অবশ্যই মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এই দুধে এমন অনেক উপাদান
থাকে, যা শিশুকে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করে। সরকারি হিসাবে বছরে পাঁচ বছরের
কম বয়সি যত শিশু মারা যায় তাদের বেশিরভাগই নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায়।
বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে অনেক
এগিয়েছে। খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর উপাদানের উপস্থিতি বাড়াতে সরকার উদ্যোগী হয়েছে। সরকারের
এ উদ্যোগ সফল করতে, বিশেষ করে শহরে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবারে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের
পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো উৎসাহিত করতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়
কাজ করছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি
প্রজেক্ট (ইউপিএইচসিএসডিপি) নামের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ১৩টি
পৌরসভা এলাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মা ও শিশুদের স্বল্পমূল্যে উন্নত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা
দেওয়ার পাশাপাশি বাবা-মাকে তাদের পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের সুষম খাবার খাওয়ানোর বিষয়ে
সচেতন করছে।
অসচেতন বাবা-মা সুষম খাবারকে ব্যয়বহুল মনে করেন। এই ধারণা যে ভুল এবং সহজলভ্য অনেক খাবারই যে পুষ্টিকর, সে সম্পর্কে তাদের অবহিত করা হচ্ছে। শিশুদের প্রতিদিনের আহারে খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি উপাদানের যথাযথ সমন্বয়ে সুষম খাদ্যতালিকা সম্পর্কে সবার জানা দরকার। এ কাজে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীদের আন্তরিকতার পাশাপাশি সব বাবা-মাকেও সচেতন করে তোলার পাশাপাশি মা-বাবারও নিজ উদ্যোগ প্রয়োজন।