সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৩ ১২:৪৭ পিএম
অলঙ্করন : প্রবা
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে দেশের প্রতিটি মানুষকে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনলাইন থেকে জানা যায়, ৫ জুন সকালে গণভবন প্রাঙ্গণে ‘পরিবেশ মেলা-২০২৩’ এবং ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান বৃক্ষমেলা ২০২৩’ উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৮৪ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ’৮৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্দেশ দেওয়া আছে, প্রতিবছর দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীরা ১ আষাঢ় থেকে তিনটি করে গাছ লাগাবে। তার মধ্যে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগানোর কথা বলা আছে।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সাধারণের মনে দোলা দিলেও ক্ষমতাসীন-স্বার্থলোভী কিছু মানুষের মনে যে তা দোলা দেয় না, তাদের মনে যে কোনো প্রতিফলন তৈরি করে না, তাদের যে এ নিয়ে কোনো বিচার নেই, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অন্য আরেকটি প্রতিবেদনে। ‘সবুজ ম্যানগ্রোভ বন এখন বিরানভূমি’ শিরোনামে ৫ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমাদের শুধু উদ্বিগ্ন করেনি প্রতিবাদী হতেও তাগিদ দিয়েছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ক্ষমতাসীন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের একদল নেতা। তারা গত দেড় বছরে কেটে নিয়েছে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় ম্যানগ্রোভ বনের ১৫ হাজারের বেশি বাইন গাছ। দখল করেছে ৩০০ একর জমি। যদিও প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদকের কাছে দখলকারীরা দাবি করেছেন এসব জমির প্রকৃত মালিক তারাই। বন বিভাগ এ নিয়ে ১৯টি মামলা করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এসব মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। তাই ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস করে মাছের ঘের তৈরির কার্যক্রমও বন্ধ হয়নি।
গরমে আজ অবস্থা
সবার চরমে। সূর্যের চোখ রাঙানি যে দাবদাহ ছুটিয়েছে, তাতে হাঁসফাঁস জীবন। অবস্থা এতটাই
চরমে যে, পরিবেশ রক্ষার নানা বার্তা ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। কিন্তু এসব নীতিকথা
যেন শুধু প্রচারের জন্যই, বাস্তবায়নের জন্য নয়। তাই বার্তাগুলো যেমন নীরবে-নিভৃতে কাঁদছে,
তেমনি হারিয়েও যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা কয়েক বছর ধরেই জোরেশোরে পরিবেশ রক্ষার কথা বলছেন।
তারা সম্ভাব্য বিপর্যয়ের শঙ্কাও জানিয়েছেন। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের কী করতে হবে, তাও
বলছেন তারা। কিন্তু আমরা ভেবেই রেখেছি, ‘বকো আর ঝকো কানে দিয়েছি তুলো, মারো আর ধরো,
পিঠে বেঁধেছি কুলো’। আমরা এ থেকে বেরুতে চাইছি না। আর চাইছি না বলেই মহেশখালী উপজেলার
হোয়ানক ইউনিয়নে বঙ্গোপসাগরের কাছে জামিরার খাল এলাকায় এমন দখলদারিত্ব কায়েম হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষা
করতে হলে গাছ বাঁচানো কত জরুরি তা কারও অজানা নয়। তারপরও এভাবে বন উজাড় করা কোনোভাবেই
বরদাশত করা যায় না। পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বসম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের সরকারও আন্তরিকতার
সঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু তা পুরোই বিফলে যাবে, যদি না এই দুর্বৃত্তদের রোখা যায়। এক্ষেত্রে
আমরা সাড়ম্বরে শুধু পরিবেশ দিবস পালন নয়, বরং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা
বলি। যারা ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করে মাছের ঘের, লবণের ঘের তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে
পরিবেশ-সংক্রান্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগের কথা বলি। সেই সঙ্গে এও বলি, পরিবেশকে অবজ্ঞা
করে কোথাও যেন কোনো প্রকল্প গড়া না হয়। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা
যায়, পরিবেশ বাঁচানো তো দূরের কথা, বরং পরিবেশকে উপেক্ষা করেও অনেক উন্নয়ন প্রকল্প
হাতে নেওয়া হয়েছে। উন্নয়নের নামে যদি আমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করি, প্রকারান্তরে তা আমাদেরই
ধ্বংস ডেকে আনবে। তাই আমরা শুধু বিশেষ দিনের জন্য নয়, সারা বছরই পরিবেশ নিয়ে ভাবার
কথা বলি। আজকে যে অবস্থা, গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে এসেছে,
তার কুফল তো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি সবাই। তারপরও কেন গাছের ওপরই সবাই খড়্গহস্ত? কেন
কারণে-অকারণে গাছ কাটার দিকেই আমাদের উৎসাহ? সম্প্রতি রাজধানীতে গাছ কাটার প্রতিবাদে
বিবেকবান মানুষকে আমরা সোচ্চার হতে দেখেছি। তাদের ভাবনায় গাছের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার
মনোভাব দেখেছি। দেশের প্রতিটি মানুষ পরিবেশ রক্ষায় এভাবে সোচ্চার হোন, আমরা সে কথাটিই
জোর দিয়ে বলি। আরও বলি, গাছ-বন উজাড় করার বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার হোন, প্রতিবাদ করুন
নিজের অবস্থান থেকে। সেই সঙ্গে আমরা সাধারণ মানুষকে বলি, আসুন ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাই
এবং বেড়ে ওঠা গাছ না কাটি।