× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাজেট প্রতিক্রিয়া

লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাসী, আছে অসঙ্গতিও

ড. সেলিম রায়হান

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৩ ০০:০৯ এএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

বলা হচ্ছিল, কঠিন সময়ে আশার বাজেট আসতে চলেছে এমনকি ৩১ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে আশ্বাস দেওয়া হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে, ২০৪১ সালের মধ্যে সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ। সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশা ছিল স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষা খাতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অপরদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাবিত হয়েছে। বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ২৫ হাজার ১২২ কোটি টাকা, যা গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের চেয়ে ৮ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা কম। এ ছাড়া বরাদ্দ কমেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের। এই দু’ক্ষেত্রেই বরাদ্দ কমানো সমর্থনযোগ্য নয়। চলমান বৈশ্বিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের আশঙ্কা বাড়ায় খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই। অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাড়ছে। বিশেষত কৃষি খাতে বরাদ্দ কমানোর বিষয়টি বোধগম্য নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে বাজারে কৃষিজ পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সেজন্য কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর প্রক্রিয়াকে নানাভাবে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়াটাই তো যুক্তিযুক্ত। তাই সঙ্গতই এই দুই খাতে বরাদ্দ কমানোর বিষয়টি সমর্থন করা যাচ্ছে না।

বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে শিক্ষা ও আইসিটি খাতেকিন্তু শিক্ষা উপকরণ, মোবাইল ডেটা, মোবাইল ফোনের দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছেসঙ্গত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, বরাদ্দ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় কতটা হয়েছে। প্রথমত, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। জিডিপির অনুপাতে মাত্র ২ শতাংশ অর্থ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হয়। অথচ বরাদ্দ দ্বিগুণ করা উচিত ছিলশিক্ষা খাতকে সার্বিকভাবে বিচার করলে হবে না। শিক্ষা খাতকে বিজ্ঞান, মানবিক, বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে ভাগ করে নেওয়া হয়। তারপর প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়Ñ এরকম কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিতে হয়। যদি এভাবে আমরা ভাগ করে দেখি তাহলে দেখব শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অনেক কম। বাজেট তৈরির সময় শিক্ষা খাতের বিষয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করা জরুরি। এছাড়া বরাদ্দই শেষ কথা নয়। বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে পারলে শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় ও খরচ কমে আসবে। এমনকি তার প্রভাব উপকরণের ওপরও পড়বে। বরাদ্দকৃত অর্থের সুষম বণ্টনের অভাব, এজন্যই পণ্যদ্রব্য এবং অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ছে। এজন্যই দেখা যাচ্ছে, আইসিটি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও মোবাইল ডেটা বা ফোনের দাম বাড়ছে। আগে যে দামে কেনা যেত, দেখা যায় বরাদ্দ বাড়ানোর পরও আর তা কেনা যাবে না। এই সমন্বয়হীন দিকগুলো গভীরভাবে নজরে নেওয়া দরকার।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশ মোট বাজেটের ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, আর সঞ্চয়পত্র বিক্রিসহ ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ নেওয়া হবে ২৩ হাজার কোটি টাকা লক্ষ করা দরকার, সম্প্রতি সরকার ব্যাংক খাত থেকে অস্বাভাবিক মাত্রায় ঋণ নিচ্ছে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়লে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় ব্যক্তি বিনিয়োগের জন্য ঋণপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ব্যাংক যখন সরকারকে ঋণ দেবে তখন তা বিপুল পরিমাণের হয়ে থাকে তাই ব্যাংকে ঋণপ্রবাহের ঘাটতির চাপ ব্যক্তিঋণের ক্ষেত্রে পড়াটা অস্বাভাবিক নয় সরকার যদি ব্যক্তি খাতের কথা চিন্তা করে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ না নেয় তাহলে সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভর করতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন ব্যাংক নোট ছাপিয়ে এই ঋণ প্রদান করবে যদি এমনটা হয় তাহলে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বেড়ে যায়, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু হতে পারে না বোঝা যাচ্ছে, এই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই আমার ধারণা সরকারের ঋণ নেওয়া বাড়ানোর ফলে ব্যক্তি ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের নানা খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয় এই বাড়তি চাপ একাধিক সমস্যা তৈরি করে একদিকে ব্যাংক খাতে ঋণ নেওয়ার ফলে ব্যক্তিঋণ প্রবাহে বাড়তি চাপ তৈরি হবে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া মানে মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কা বেড়ে যাওয়া সরকারের সম্ভবত এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা রয়েছে দেখার বিষয়, এই সমস্যাগুলোকে বাজেট বাস্তবায়নের সময় সরকার কতটা সফলভাবে তা করতে পারে

২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে আইএমএফের ঋণের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও সংস্থাটি থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়ার শর্ত পূরণের প্রতিফলন থাকছে আইএমএফ বলেছে, আগামী সাড়ে তিন বছর ধরে স্বাভাবিক গতির চেয়ে দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে আর সেই কৌশল প্রণয়ন করতে হবে এই জুনের মধ্যে এনবিআরকে শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটও করতে হবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আয় বৃদ্ধির জন্য ৬০ হাজার ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) কেনার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে আগামী অর্থবছরে ভ্যাট বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি নতুন পাঁচটি ভ্যাট কমিশনারেটও তৈরি করবে এনবিআর এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রণয়ন করতে হবে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সময়ভিত্তিক সূত্র অভ্যন্তরীণ বাজারসহ নানা খাতে সঙ্ত কারণেই বাড়বে ব্যয় জমি-ফ্ল্যাট কেনাসহ বাড়তে পারে ৫০ ধরনের মাশুল এগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য কিছু অসুবিধা তো বটেই একদিকে ব্যয় বাড়ছে কিন্তু সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি নানা ধরনের সেবার ক্ষেত্রেও গুনতে হবে বাড়তি টাকা গুনতে হবে অর্থাৎ আয় বাড়ানোর পথ মানুষকে খুঁজতেই হবে বিষয়টি অত সহজ নয় অর্থাৎ অর্থনীতিতে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে

প্রত্যাশা ছিল, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে সরকার অর্থনীতিকে সংহত করার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে বাজেট প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যস্ফীতিকে বেশি প্রাধান্য দিলে আমাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হতো কীভাবে উচ্চমূল্যস্ফীতি কমানো যায় এ ব্যাপারে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত বাজেট প্রয়োজন ছিল অর্থনীতিকে সংহত করার মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করার একটি পরিকল্পনা গড়ে নেওয়া যেত অর্থনীতিকে সংহত করার ক্ষেত্রে বাজেট এবং সমন্বয়ের মধ্যে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে কারণ বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কথা বারবার বলা হয়েছে এ ছাড়া উচ্চ হারে ব্যক্তি বিনিয়োগের বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে ব্যক্তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক বড় খাতের সম্ভাবনা দেখানো হচ্ছে যেহেতু বাজেটে ঘাটতি রয়েছে সেহেতু এখানে একটি প্রশ্ন তৈরি হয় বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে আর যদি ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নেয় তাহলে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা ঋণ পেতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হবেন এই সমস্যা বা ঋণপ্রবাহের ঘাটতি তাহলে মেটানো হবে কীভাবে? ব্যাংক যদি অর্থ সরবরাহ করতে না পারে তাহলে ব্যক্তি বিনিয়োগের প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে নানাভাবে তাই বলতে হচ্ছে, বাজেটে অনেক ধরনের অসামঞ্জস্য আছে

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাজেটে অগ্রাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট নয় কোথায় কতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা আমাদের কাছে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি তবে বাজেট পাস হওয়ার এখনও অনেক সময় বাকি এক্ষেত্রে আলোচনাসাপেক্ষে এই ঘাটতি ও সমস্যাগুলো শনাক্ত করে একটি সংশোধনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি সামষ্টিক অর্থনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, এক্সচেঞ্জ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এসব ক্ষেত্রে আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া একটু উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হয়ে যায় প্রত্যাশা করা হচ্ছে, আগামী বছর মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নেমে আসবে এতদিন এ নিয়ে কোনো কাজ হয়নি আচমকা এক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তাও স্পষ্ট নয় বাজেটের সংশোধনের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে

 

  •  অর্থনীতিবিদ  নির্বাহী পরিচালকসানেম

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা