সুকান্ত দাস
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৩ ১৬:২০ পিএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৩ ১৬:২১ পিএম
চিংড়ি চাষে অধিক মুনাফার লোভে অধিকাংশ মানুষ তাদের দুই ফসলি তিন ফসলি জমি কেটে ঘের তৈরি করেছে। যদিও এতে লাভ কম নয়। কারণ চিংড়িকে সাদা সোনা বলা হয়। কিন্তু চিংড়ি চাষের কারণে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
গলদা চিংড়ি মিষ্টি পানিতে চাষ করা গেলেও, বাগদা চিংড়ি চাষ করতে নোনা পানির দরকার হয়। নোনা পানির কারণে দেশের দক্ষিণবঙ্গের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক সময়ের ফসলি জমি কেটে চিংড়ি চাষ করার কারণে ধানের চাষ আজ হুমকির মুখে।
নোনা পানির প্রভাবে গোটা দক্ষিণ উপকূল থেকে ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে অসংখ্য প্রজাতির মাছ ও পশুপাখি। প্রথম দিকে কিছু কৃষক চিংড়িচাষের দিকে ঝুঁকলেও কয়েকবার চিংড়ি চাষ করে লোকসান হওয়ার পর তাদের সেই ইচ্ছে উবে গেছে। এখন অধিকাংশ ঘেরে প্রভাবশালীরা চিংড়ি চাষ করেন। এখানেই আসল সমস্যা। নোনা পানিতে কৃষকের ক্ষতি হলেও, প্রভাবশালীদের ক্ষমতার দাপটে কৃষকদের কথা কেউ শোনে না। সাধারণ কৃষকরা এখন অনেকটা বাধ্য হয়েই চিংড়ি চাষ করেন।
বাগেরহাট খুলনা সাতক্ষীরা এলাকায় ভবন তৈরি করার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ভবনের দেয়ালে ফাটলের সৃষ্টি হচ্ছে। দেয়ালের রঙ খসে পড়ে যাচ্ছে। এলাকার লোকজন এর জন্য নোনা পানিকে দায়ী করছেন। অনেক পুরোনো গাছ মারা গেছে দক্ষিণ অঞ্চলে নোনাপানি ঢোকার পর। আগে চারদিক সবুজে ঢাকা ছিল। কিন্তু এখন আর তেমন নেই। নোনা পানির কারণে অনেক গাছপালা মরে গেছে। নারিকেল-সুপারির ফলন খুব ভালো ছিল এক সময় এই অঞ্চলে। কিন্তু লবণ পানি ঢোকার কারণে নারিকেল-সুপারির ফলন অনেক কমে গেছে। অনেকে বাধ্য হয়েছে চিংড়ি চাষ করতে। কারণ দেখা গেছে আশপাশের সবাই চিংড়ি চাষ করেন। ফলে সেই সব জায়গায় নোনা পানি থাকে। ঘেরের বাঁধের মধ্যে থেকে নোনা পানি ধানের জমিতে প্রবেশ করে। এ কারণে জমির ফসল উৎপাদন কম হয়। ফলে গরিব কৃষক বাধ্য হয়ে ধানচাষ বন্ধ করেন।
দেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগর সাগরের নোনা পানির প্রভাব এলাকার প্রকৃতির ওপর পড়ছে। এটা তো প্রাকৃতিকভাবে হচ্ছে। কিন্তু চিংড়ি ঘেরের কারণে মানবসৃষ্ট কৃত্রিমভাবে গ্রামগঞ্জের মাটি লবণাক্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের গবেষণায় জানা গেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের জেলা- বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার কৃষিজমি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। চিংড়িচাষের জন্য নোনা পানি আনতে স্লুইসগেট ছিদ্র করে বাঁধ দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। যার কারণে এসব এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চলের একটা বড় অংশ সমুদ্রের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তার ওপর কৃত্রিমভাবে তৈরি এই সংকটের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। চিংড়ি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় শিল্প তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে তা করায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই সমস্যার প্রভাব সমগ্র দেশের ওপর পড়ছে। নোনা পানির কারণে কাজ হারানো মানুষ কাজের খোঁজে শহরে আসছে। এতে শহরের জনসংখ্যা বাড়ছে। আবার অনেক বড় সংখ্যক মানুষের আয় কমে যাওয়ায় এর প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ছে। এই দিক বিবেচনা করে বলা যায়, এ সমস্যা শুধু দক্ষিণবঙ্গের মানুষের নয়; বরং সমগ্র দেশের। এ কারণে যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।