ড. হারুন রশীদ
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৩ ১৩:৩৩ পিএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৩ ১৩:৪৫ পিএম
ড. হারুন রশীদ। প্রতীকী ছবি
প্রযুক্তির ছোঁয়া আর টাকার জোর- এই দুয়ে মিলে জনজীবনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আর তাই হয়তো বিদ্যার্জনের জন্য এখন অনেক ক্ষেত্রেই মেধার প্রয়োজন হয় না। টাকা ঢাললেই মিলছে এসএসসি, এইচএসসি, বিএ, এমএ পরীক্ষা পাসের সনদ। এমনকি এমবিবিএসের সার্টিফিকেটও। অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যার্জনের স্বীকৃতিপত্র পাওয়ার জন্যও খুব বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে না।
একটি কম্পিউটার, ভালো মানের প্রিন্টার আর ছাপার কাগজ থাকলেই শুরু করা সম্ভব নতুন ও লাভজনক এ ব্যবসা। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্যও পরিশ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে। প্রযুক্তির আশীর্বাদে অপরাধীচক্র টাকাও বানিয়ে ফেলছে। সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদ জালকারী এমন একটি চক্র ধরা পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর হাতে।
চক্রটি অনেক দিন ধরে নীরবে টাকার বিনিময়ে দেশের বিভিন্ন চলমান এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশন এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন, বিভিন্ন বোর্ডের সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার মার্কশিট ও সার্টিফিকেট বিক্রি করছিল। এগুলো বোর্ড অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরবরাহ করা মূল কাগজ দিয়েই তৈরি করা। আবার সনদগুলো অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা। ফলে অনলাইন ভেরিফিকেশনেও পাওয়া যেত সত্যতা।
পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় দুই কক্ষের ভাড়া বাসায় দীর্ঘদিন চলেছে এসব জালিয়াতি কর্মকাণ্ড। জীর্ণ কক্ষের এক পাশে খাট, অন্যপাশে টেবিলে রাখা কম্পিউটার ও প্রিন্টার। ছোট্ট এ কক্ষেই তৈরি হয়েছে দেশের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সনদ ও নম্বরপত্র (সার্টিফিকেট ও মার্কশিট)। এসব সনদ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকাও হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্রটি। সম্প্রতি চক্রটির কয়েক সদস্যকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করায় সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে ভয়ঙ্কর এই জালিয়াত চক্রের কথা।
গ্রেপ্তারকৃতদের মাঝে একজন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেলিকমিউনিকেশনে পড়াশোনার পর দুটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানিতে চাকরিও করেছে। এখন নিজেই বিভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠান খুলে বিক্রি করছে জাল সনদ। এই চক্রটি অনেক দিন ধরেই অর্থের বিনিময়ে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, স্নাতকোত্তর, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার নম্বরপত্র এবং সনদ বানিয়ে সেগুলো বিক্রয় করেছে।
সনদগুলো তৈরি হতো বোর্ড অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরবরাহ করা মূল কাগজ দিয়েই। পরে সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা হতো; যাতে অনলাইন যাচাই-বাছাইয়ে সনদের সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব হয়। অনলাইনে জাল সনদ অন্তর্ভুক্ত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। আশঙ্কার বিষয়, এভাবে টাকার বিনিময়ে জাল সনদধারীরা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকতার মতো পেশায়ও যুক্ত হচ্ছেন।
সরকারি তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে জাল সনদে চাকরি করছেন কয়েক হাজার শিক্ষক। এদের কেউ কেউ ধরা পড়লেও বাকিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে শিক্ষার মান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জাল সার্টিফিকেটধারীরা কীভাবে এমপিভুক্ত হলেনÑ প্রশ্ন উঠেছে সেটি নিয়েও।
শিক্ষা সনদ জালিয়াতির পাশাপাশি জাল টাকাও এক আতঙ্কের নাম। জাল সনদ যেমন দেশে যোগ্য শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান ধ্বংস করে, তেমনি জাল টাকা আর্থিক ক্ষতি করে। অনেক সময় তা বিড়ম্বনার কারণ হয়েও দাঁড়ায়।
সারা দেশে জাল নোট প্রস্তুতকারী অর্ধশতাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত খবরে জানা যায়। শিক্ষাসনদ জালিয়াতির মতো টাকা জাল করার ব্যাপারটিও বড় অপরাধ। এ ধরনের বড় প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত থাকে রাঘব বোয়ালরা। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর অভিযানে যারা ধরা পড়ে তারা সাধারণ কারিগর।
মূলত নোট জাল করার কাজে এরা সরাসরি জড়িত থাকে। কিন্তু নেপথ্য কারিগরদের খোঁজ কেউ পায় না। ফলে জালিয়াতচক্রের মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় কিছুদিন পরপরই তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর যারা ধরা পড়ে, তারাও একসময় আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে। নোট জালিয়াতচক্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কথাও শোনা যায়।
উগ্র জঙ্গিবাদী গ্রুপও এসবের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দাদের হিসাবে প্রতিবছর প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার জাল মুদ্রা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট হুমকি। সামনে কোরবানির ঈদ। গরুর হাটকে কেন্দ্র করে এ সময়ে জাল টাকার চক্র তৎপর হয়ে ওঠে। কাজেই এ ব্যাপারে এখনই তৎপর হতে হবে।
সনদ জাল করা এবং টাকা জাল করা কোনটিই সাধারণ অপরাধ নয়। এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কোনো বিকল্প নেই। যে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাল সনদ তৈরিতে সহযোগিতার অভিযোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার মান বজায় রাখতে এটা অত্যন্ত জরুরি।
কারা সদন ছাপার অরিজিনাল কাগজ সরবরাহ করে, কারা অনলাইনে সনদ যাচাইয়ের সুযোগ করে দেয়, তাদের খুঁজে বের করতে না পারলে জালিয়াতি বন্ধ করা অসম্ভব। শিক্ষা বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ সশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল হতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এই ভয়ানক অপরাধীদের তেমন কোনো শাস্তিই হয় না।
গত এক দশকে পাঁচ হাজারেরও বেশি মামলা ঝুলে আছে জাল নোট প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু সাক্ষীর অভাবসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতায় এসব মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। তা ছাড়া বড় বড় রাঘব বোয়াল এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকায় রহস্যজনক কারণে মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। অথচ এদের শাস্তি না হলে পরিস্থিতি দিন দিন মারাত্মক রূপ নেবে।
জাল কারবারের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে যে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব- এ ব্যাপারে সবাই একমত। কাজেই প্রয়োজনে নতুন আইন করে হলেও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে এদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।