× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্যাংকিং ব্যবস্থা

বিএসইসির সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত

ড. আবু আহমেদ

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৩ ১০:০১ এএম

আপডেট : ০৯ মে ২০২৩ ১০:০২ এএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৩১ (১) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ব্যবস্থা বা তার কাছে রক্ষিত অর্থের বিপরীতে সুদ দিতে পারে না। অথচ ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বিভিন্ন ব্যাংকের স্পেশাল নোটিস ডিপোজিট (এসএনডি) ধরনের হিসাবে রক্ষিত অর্থ ও তার সুদ থেকে আয়ের পরিমাণ জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সেই সঙ্গে এই সুদ আয় বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা হিসাবে জমা দেওয়া কিংবা তাদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ৫ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন খবর পাওয়ার পর সঙ্গত কারণেই একাধিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে দেশের ব্যাংকিং খাত নানা সমস্যায় পড়বে। ব্রোকারেজগুলো যদি তাদের বিনিয়োগকারীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টের বিপরীতে সুদ প্রদান করে, তা হলে তা অবৈধ হবে। ব্যাংকের চলতি হিসাব কিংবা সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার পরিবর্তে বিওর মাধ্যমে ব্রোকারেজগুলোতে টাকা রাখতে উৎসাহিত হবে মানুষ। ফলে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো এক সময় শ্যাডো বা ছায়া ব্যাংকে রূপ নেবে। বিএসইসি সম্প্রতি যে ঘোষণা দিয়েছে তা আমাদের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুরুতে ঘোষণা দেখে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের লাভ দৃশ্যমান হলেও প্রকৃতপক্ষে এর সুফলভোগী হবেন গুটিকয়েক বড় বিনিয়োগকারীই। বলা যায়, বড় বিনিয়োগকারীরা এখন সব দিক থেকেই লাভবান হবেন। এতদিন বিও হিসাবে কোটি কোটি টাকা ফেলে রাখলে তারা বাড়তি কোনো টাকা পেতেন না। এখন বাড়তি টাকার পাশাপাশি আয়কর সুবিধা পাওয়ার ইচ্ছায় ব্যাংকে সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টের বদলে তারা বিও অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখবেন। এমনটা হলে প্রচলিত ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমবে এবং ব্যাংকে আমানতের তারল্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।

যদিও বিএসইসির এই ঘোষণাটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এ বিষয়ে অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একাধিকবার তারা প্রস্তাব উপস্থাপন করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। অবশ্য এ ব্যাপারে বিএসইসির সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্তের একটি আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ৩ এপ্রিল অবশ্য বিএসইসি নিজেদের মতো করেই নির্দেশনা জারি করেছে। ডিএসইকে চিঠি দিয়ে সব উৎস থেকে ইনভেস্টরস প্রোটেকশন ফান্ডে অর্থ জমা হয়েছে কি না তা জানতে চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ এপ্রিল ট্রেকহোল্ডারদের বরাবর একটি চিঠি দেয় ডিএসই। তাতে বলা হয়, ২০২১ সালের ২১ জুন জারি করা বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী ট্রেকহোল্ডার কোম্পানির সমন্বিত গ্রাহক হিসাবের (সিসিএ) অবণ্টনকৃত মুনাফার অর্থ ইনভেস্টরস প্রোটেকশন ফান্ডে জমা হওয়ার বিধান রয়েছে। সে অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত জমাকৃত অর্থের ব্যবহার-সংক্রান্ত তথ্য আগামী ১১ মের মধ্যে ছক অনুযায়ী পাঠাতে হবে। ছকে মুনাফার পরিমাণ, বণ্টনকৃত ও অবণ্টনকৃত অর্থের পরিমাণ জানাতে বলা হয়েছে। তাদের এই নির্দেশনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও কিছু জানে না। অর্থাৎ এই সিদ্ধান্ত এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায়। আমরা জানি, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগকারীকে বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুবিধার্থে করা অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে যদি সাধারণ ব্যাংকের মতোই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তা হলে প্রচলিত ব্যাংকিং খাত মুখথুবড়ে পড়বে। কারণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠান বাদে ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্টগুলো যদি আমানতের বিপরীতে মুনাফা দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়, তা হলে প্রচলিত ব্যাংকের সব সুযোগসুবিধা পেয়ে যাবে। অর্থাৎ আমানতকারীর টাকা তারা অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করে বিপুল অর্থ সঞ্চয় করতে পারবে। তখন ব্রোকারেজ হাউসগুলো বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কিনে নেবে এবং ওই শেয়ারের লভ্যাংশ দিতে না পারলে সুদ দেওয়ার প্রস্তাবনা দেবে। যদি ব্রোকারেজ হাউস থেকে এই বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়, তা হলে মানুষ সাধারণ ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব কেন খুলবে? যদিও বিএসইসি দাবি করছে, বিনিয়োগকারীর স্বার্থেই এমন নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রচলিত আইনের সঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে আমরা ভিন্নচিত্রই দেখতে পাই।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এক্ষেত্রে একটি বড় ভুল করছে। তাদের উচিত শেয়ার কেনার নামে ব্রোকারেজ হাউসগুলো যেন অর্থ গচ্ছিত রাখতে না পারে তা নিশ্চিত করা। বিও অ্যাকাউন্টের গুরুত্বটি বোঝা জরুরি। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে হলে বিনিয়োগকারীকে বিও অ্যাকাউন্ট করতে হয়। বিনিয়োগের সময় শেয়ারের উদ্বৃত্ত অর্থ উত্তোলন ও লেনদেন বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করতে হয়। গচ্ছিত এই অর্থ বিও অ্যাকাউন্টে সুদবিহীন অবস্থায় থাকে।

অর্থাৎ বিও অ্যাকাউন্ট অনেকটা প্রচলিত ব্যাংকের চলতি হিসাবের মতো। বিনিয়োগের লভ্যাংশ আসার পর বিনিয়োগকারী পুরো অর্থই তুলে নিতে পারেন। যদি ভবিষ্যতে ওই ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে তিনি আবার শেয়ার কিনতে চান, তা হলে এই অ্যাকাউন্টে টাকা জমা রাখতে পারেন। কিন্তু ব্রোকার স্বপ্রণোদিত হয়ে গচ্ছিত অর্থের বিপরীতে সুদ দেবে আইন অনুসারে- এমনটা কোনোভাবে হতে পারে না। তা ছাড়া নিকট অতীতে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে অর্থ লোপাটের খবরও নতুন কিছু নয়। বিনিয়োগকারীর অর্থ এখানে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এর আগেও বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস অর্থ লোপাটের ঘটনায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যেমন- সম্প্রতি দেশের প্রধান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সদস্যভুক্ত ব্রোকার হাউস অ্যাংকর সিকিউরিটিজ লিমিটেডের গ্রাহকদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টে ১ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। এক বিনিয়োগকারীর টাকার অন্য বিনিয়োগকারীকে দেওয়াসহ নিয়মবহির্ভূত অনিয়মের কারণে ঘাটতি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। সাম্প্রতিক ঘটনাটি বাদেও অতীতে বহু ব্রোকারেজ হাউসের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে। বিএসইসির এই ঘোষণা অনুমোদন পেলে ব্রোকারেজ হাউসগুলো বাড়তি সুবিধা পাবে। কারণ গচ্ছিত অর্থের জন্য তাদের দায়বদ্ধতা কম। বিএসইসিও এক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করতে পারছে না। যদি তদারকি ও কঠোর নজরদারি থাকত, তা হলে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ কিংবা বানকো সিকিউরিটিজের মতো প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করে পালাতে পারত না।

বিনিয়োগকারীদের টাকা ব্রোকারেজ হাউসের অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত রাখার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পর লভ্যাংশের টাকা সরাসরি বিনিয়োগকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অটোমেশন পদ্ধতিতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তা ছাড়া বিনিয়োগকারী যদি ভবিষ্যতে কোনো শেয়ার ক্রয় করে, তা হলে ব্রোকার তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অটোমেশন পদ্ধতিতেই টাকা কেটে নিতে পারে। ব্রোকারের কাছে অর্থ রাখা কোনোমতেই নিরাপদ নয়। বরং অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ব্রোকারের কাছে টাকা রেখে প্রায়শই বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে জটিলতা সমাধানের পথে না গিয়ে বিএসইসি এমন ভুল পথে কেন হাঁটছে তা একটি বড় প্রশ্ন। শেয়ারবাজারের ওপর মানুষের আস্থা দিনের পর দিন কমছে। সেখানে নতুন এই সিদ্ধান্ত আস্থার সংকট আরও বাড়াতে পারে। এখানে আরেকটি প্রশ্ন করতেই হয়, ব্রোকার হাউস গচ্ছিত অর্থের ব্যবহারে কীভাবে মুনাফা করছে, কতটুকু মুনাফা করছে- তা বিনিয়োগকারী জানবেন কীভাবে? আর তাকে জানানো হলেও কি কি নীতিমালা অনুসরণ করে জানানো হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ নীতিমালা প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার আছে এবং ব্যাংক সেভাবেই তার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সব দিক বিবেচনায় বিএসইসির নতুন সিদ্ধান্তটিকে বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না বলেই আমি মনে করি।

বিএসইসির এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও কিছু জানে না বলে জানা গেছে। তবে আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি করাই মঙ্গলজনক। যদি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়ে যায়, তা হলে ব্যাংকের সঙ্গে সমবায় সমিতির কোনো পার্থক্য আর থাকবে না। এর নেতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজারের ওপরও পড়বে। কারণ ব্রোকারই তখন শেয়ারবাজারের সব কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং বিনিয়োগকারীর সঙ্গে শেয়ারবাজারের সম্পৃক্ততা টাকা দেওয়া পর্যন্তই থাকবে। শেয়ারবাজারের নিয়ম অনুসারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীকে নিতে হবে। কিন্তু বিএসইসির নতুন সিদ্ধান্ত অনুসারে ব্রোকার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সব দায়দায়িত্ব নিচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এভাবে বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ অনিরাপদ হয়ে পড়বে। ব্রোকারের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করায় বিনিয়োগকারী আর শেয়ারবাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে না। বিনিয়োগকারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ব্যতীত শেয়ারবাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো পথ নেই। তাই বিএসইসির এই সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। বরং প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং ব্রোকার হাউসের বিও অ্যাকাউন্টে অটোমেশন ব্যবস্থা দ্রুত চালু করতে হবে। এভাবে ব্যাংকের তারল্য সংকট কমবে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে কেমন পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা করে একটি পরিকল্পনা তৈরি করা কঠিন কিছু নয়। মূল বিষয় হলো, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ব্রোকারদের ছায়া ব্যাংক গড়ে তোলার সুযোগ করে দেওয়া মোটেও ভালো কিছু হতে পারে না। বিনিয়োগকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট দূর করার জন্য দ্রুত অটোমেশন পদ্ধতির মাধ্যমে সমন্বয় করা জরুরি।


  • অর্থনীতিবিদ ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা