ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৩ ১৩:২৪ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
ফুটবলের প্রধান খলনায়ক সাংগঠনিক দুর্বলতা। বছরের পর
বছর এই দুর্বলতা বিরাজ করলেও এর উত্তরণ নিয়ে ভাবা হয়নি। চিন্তায় আনা হয়নি সংস্কার।
অনেকের ধারণা, এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে। ইতিহাস বলে অবধারিত কিছু হয় না। সাংগঠনিক
দুর্বলতার জন্য ফুটবল প্রতিষ্ঠানটি সব সময় নড়বড়ে রয়ে গেছে। এ জন্যই এর মধ্যেকার
সমস্যাগুলো এখন পর্যবসিত হয়েছে। বর্তমানে ফুটবল ফেডারেশন যে সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে,
এটি রোগের উপসর্গ মাত্র। রোগ আসলে ভিন্ন জায়গায়।
ফুটবলের আবেগে আদর্শবোধ ও জাতীয় স্বাধীনতার চেতনার
স্থান বড় কম। ঘুণেধরা ফুটবল চত্বরকে মেরামত করা চার-পাঁচ জনের কাজ নয়। সবাইকে
এগিয়ে আসতে হবে। ফুটবলের স্বার্থে হাত ধরে কাজ করতে হবে। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে
কাজ করার ছবি তো ফুটবলে নেই। এক ‘প্যানেলে’ নির্বাচন করার পরও কী ভীষণ বিভাজন,
রেষারেষি আর বিরোধিতা। আত্মকলহ থেকে ফুটবল বের হতে পারেনি। জনতুষ্টিবাদ সংস্কৃতি
ফুটবলের পরিস্থিতিকে একটি সংকটময় জায়গায় নিয়ে গেছে। ফুটবলে সব সময় ‘আসকারা’ পেয়েছে
অনিয়মতান্ত্রিক কার্যকলাপ। যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। বর্তমান সংকট নিয়ে
ফেডারেশনের নীতিনির্ধারকরা এবং বাইরে থেকে ফুটবলসংশ্লিষ্ট মহল অপরিপক্ব ও
বিচ্ছিন্নভাবে যে ভাষায় এবং যেভাবে কথা বলছেন তা ফুটবলের জন্য ভালো নয়। এগুলো ভালো
উদাহরণ হয়ে থাকবে না।
ফুটবল ফেডারেশন একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি
পরিচালনার দায়িত্বে আজ যারা আছেন, কাল তারা নাও থাকতে পারেন। এটাই নিয়ম। ব্যক্তি
বিশেষকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় ভাবার কোনো সুযোগ নেই। ফুটবলে বড় একটি সমস্যা
ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব এবং ‘ইগো’। ব্যক্তির সাংগঠনিক দক্ষতা এবং কার্যক্রম
সঠিকভাবে পরিচালনা করার যোগ্যতা আছে কি না, সেটি আলোকপাত না করে ব্যক্তিগত আক্রমণ
এবং তর্কের লড়াই চলছে এখানে। ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবলের স্বার্থে নেই শক্ত অঙ্গীকার।
সচেতনতাও বাড়ছে না। ফুটবলে আদর্শিক অবস্থার গুরুত্ব নেই। বহু রকম অনৈতিকতার জালের
মধ্যে আটকে আছে ফুটবল। এটাও ওপেন সিক্রেট যে ফুটবলে অনেকেরই ভূমিকা দুই নৌকায় পা
দিয়ে চলা। ফুটবল চত্বরে আমরা নানা ধরনের ডিগবাজি দেখে অভ্যস্ত। ফুটবল ফেডারেশনের
কার্যকলাপ নিয়ে হয়তো বিরাট জনগোষ্ঠীর মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এর প্রভাব
সুদূরপ্রসারী। ফুটবল চত্বরে অস্থিরতা বাড়া, বিশ্বাসে চিড় ধরার পরিণাম শুভ হতে পারে
না। সংগঠকদের মধ্যে অন্তর্কলহ এবং বিভিন্ন ধরনের বিবাদ ফুটবলের মৌলিক কার্যক্রমকে
ব্যাহত করে। ফুটবলে স্থিতিশীলতা ছাড়া উপায় নেই। লাগামহীন কথাবার্তা দেশের ফুটবলের জন্য
বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
ফুটবলে চলছে নৈতিকতার সংকট। নারী-পুরুষে বৈষম্য বাড়ছে।
অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই ফুটবলের
চাকা সামনের দিকে নয়Ñ পেছনের দিকে ছুটে চলেছে। বিবেক মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি।
যা দিয়ে মানুষ ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ ও হিতাহিতের পার্থক্য উপলব্ধি করে অশুভকে
প্রতিহত করে। মানব প্রবৃত্তির কাছে অনেক সময় বিবেকের পরাজয় ঘটে। পরাজয়ের প্রথম
কারণ দুর্বলচিত্ততা এবং অপর কারণ সামাজিক বৈষম্য। ফুটবলে নীতি বিসর্জন, অবিশ্বাস,
ফাঁকিবাজি, শোষণ, বিচ্ছিন্নতা, বিশৃঙ্খলা এবং স্থবিরতা খেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
করছে। এই যে ফুটবল বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধাক্কা খাচ্ছে এর কারণ
সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং দায়বদ্ধতার অভাব। শুধু আমাদের দেশে নয়, অন্যান্য দেশের
ফুটবল সংগঠনেও তীব্র ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। দেশের ফুটবলে
জাতীয় পর্যায়ে কিছু সংগঠক জবাবদিহিকে থোড়াই কেয়ার করেন। ফুটবলে সুবিধাবাদী সংখ্যায়
কম। তার পরও তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন প্রজন্মের সংগঠকরা জানেন
না স্বাধীনতার আগে তাদের পূর্বসূরিরা কি অবস্থায় ছিলেনÑ আর তারা কি অবস্থায় এখন
আছেন।
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে দেশের মানুষ অনেক
কিছু দ্রুত জানতে পারছে। তাতে দ্রুততর সময়ে গঠিত হচ্ছে জনমত। বিভিন্ন কারণে কিছু
ফুটবল সংগঠকদের ভাবমূর্তি এখন নিম্নমুখী। তারা নিজেদের পায়ের নিচে মাটি হারিয়েছেন।
ফুটবলের সংস্কৃতি ভালো নয়। এখানে একদল আরেক দলের পেছনে সব সময় লেগে আছে। ফুটবলের
ভালোও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে উদযাপন করতে পারেন না। সবাই মিলে ফুটবল ঘিরে স্বপ্ন দেখার
অবকাশ কেন হলো নাÑ এর উত্তর শুধু সংগঠকরা দিতে পারবেন। ফুটবলে আমরা এখন কোথায়
দাঁড়িয়ে আছি? আমাদের ফুটবলে তো নেই নতুন স্বপ্নের রঙ। এত জটিলতা আর সমন্বয়হীনতার
মধ্যেও ফুটবল বড় মাঠগুলোতে গড়ায়Ñ এটি অবাক হওয়ার বিষয়। দর্শক খেলা দেখতে যান না
সেটি আরেকটি বিষয়।
বাংলাদেশের ফুটবল শোচনীয় অবস্থা থেকে কীভাবে উত্তরণ হবে বলা মুশকিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগ এবং আশঙ্কার পাল্লা ভারী হচ্ছে। অপরিপক্বতা, পাগলামি, জেদ এই দেশের ফুটবলকে অতীতে ভুগিয়েছে। আমাদের স্মরণে আছে, অতীতে নারী জাতীয় দলকে অর্থের দোহাই দিয়ে ২০১৪ সালে প্যারিস অলিম্পিকের ফুটবল বাছাইয়ে পাঠায়নি বাফুফে। কৌশল অবলম্বন করেছিল ঝিকে মেরে বৌকে শেখানোর। পুরো বিষয়টিই বুমেরাং হয়। এরপরের ধাক্কা আর্থিক ব্যবস্থাপনা অনিয়ম, কর্তব্যে অবহেলা এবং জালিয়াতির অভিযোগে ফিফা বাফুফের সাধারণ সম্পাদককে দুই বছরের জন্য ফুটবলের সব কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করে। এর পর কয়েকদিন বাফুফে এবং বাফুফের বাইরে প্রচুর হৈ চৈ। কেউ কেউ পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন। কেউ কেউ নিজেকে কোনো কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই জানিয়ে মিডিয়ায় কড়াই গরম করেছেন। এদিকে অনূর্ধ্ব-১৭ নারী দল এশিয়ান ফুটবলে প্রথম রাউন্ডে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবে আলোচনা আর তর্কের প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। ওপরেই উল্লেখ করেছি ফুটবল এখন খুব খারাপ সময় পার করছে। এর সমাপ্তি কীভাবে ঘটবে জানি না। তবে বিভিন্ন ধরনের আশঙ্কা, অস্বস্তি আর উদ্বেগ নিয়ে লেখার ইতি টানতে হচ্ছে।