× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঝুঁকি নিরসনে বিল্ডিং কোডের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি

ড. আকতার মাহমুদ

প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৩ ১২:৫৮ পিএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বন্যা-ঝড়-খরা-ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপরীতে অবস্থান করছে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা। মানবসৃষ্ট এসব দুর্ঘটনায় অনেক প্রাণ ও সম্পদহানির উদাহরণও আমাদের রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করা না গেলেও সে সম্পর্কে সতর্ক থাকলে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এখন দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে কি নাÑ সেটাই বড় বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অগ্নিনিরাপত্তার সার্বিক ব্যবস্থা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। প্রতিনিয়ত অগ্নিদুর্ঘটনাকে সামনে রেখে বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করি। শহরে অগ্নিঝুঁকির ক্ষেত্রে একাধিক বিষয় রয়েছে। শহরের বিভিন্ন ভবন অগ্নিঝুঁকিতে থাকা, ভবনের ভেতর গ্যাস জমাট বেঁধে থাকার ঝুঁকি, ভূমিকম্পে ধসে পড়ার ঝুঁকি বাদেও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রচলিত আইন না মানার প্রবণতা অগ্নিঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এগুলো ছাড়াও বেশ কয়েকটি কারণ এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের নগরব্যবস্থায় আবাসন প্রকল্পে জনঘনত্ব অনেক বেশি। তা ছাড়া পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার অপ্রতুলতার দরুন নগরজীবনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তাই অগ্নিঝুঁকি নিয়ে যদি আলাদা করে কিছু বলতে হয়, তাহলে প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে আলোচনা করতে হবে। শহরে এমন অনেক ভবনই আছে যেগুলো অগ্নিঝুঁকিতে আছে। বিশেষত গণজমায়েত হয় এমন ভবনগুলো রয়েছে সর্বাধিক ঝুঁকির মুখে। বিভিন্ন মার্কেট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস ভবনগুলো এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এসব জায়গায় মানুষ কেনাকাটা অথবা সেবা নিতে আসে। ফলে গণজমায়েত হয়। প্রাথমিকভাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞ দল নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং ঝুঁকি হ্রাসকরণে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেবেÑ এমনটাই সচরাচর বৈজ্ঞানিক পন্থা বলে স্বীকৃত। এই কাজ করার ক্ষেত্রে শহরকে বিভিন্ন ব্লকে ভাগ করা হবে নাকি ওয়ার্ডে ভাগ করা হবেÑ তা পরিকল্পনা অনুসারে নির্ধারণ করতে হবে।

অনেকে অভিযোগ করেন, নগরে পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্র্যান্ট নেই। অবিলম্বে ফায়ার হাইড্র্যান্টের ব্যবস্থা করার দাবিও নানা মহল থেকে ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। মনে রাখতে হবে, পুরো নগরে ফায়ার হাইড্র্যান্টের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং সব এলাকায় পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্র্যান্টের ব্যবস্থা একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এজন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও রসদ প্রয়োজন। অথচ বিগত এক বছরে যে কটি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে তা থেকে একটি কথা স্পষ্টÑ আমাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই সময়সাপেক্ষ কোনো প্রকল্পের প্রতিপালন করার। এখন আমাদের দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তারপর হয়তো আমরা দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনার দিকে এগোতে পারি। কিন্তু প্রথমে নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় দ্রুত কী ব্যবস্থা হতে পারে? অবশ্যই আগুন নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করা। নগরব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মার্কেট গড়ে উঠছে। এই মার্কেটের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে। যতদিন পর্যন্ত নগরে ফায়ার হাইড্র্যান্ট নেটওয়ার্ক গড়ে না ওঠে, ততদিন পর্যন্ত আপৎকালের কথা চিন্তা করে মার্কেটে আলাদা জলাধারের ব্যবস্থা করতে হবে। একসময় নগরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জলাশয় থাকলেও এখন আর নেই। চাইলেও আর এই জলাশয়গুলো ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু যেসব জলাশয় এখনও টিকে আছে, সেগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সংরক্ষণের আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতোমধ্যে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে এসব জলাশয় চিহ্নিত করা আছে। কিন্তু চিহ্নিত করে রাখলে তো হবে না। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, অধিকাংশ সময় চিহ্নিত করা জলাশয় বিভিন্ন কারণে ভরাট হয়ে যায়। এমনটি যেন না হয়, সেজন্য দায়িত্বশীল প্রত্যেককেই নজর আরও গভীর করতে হবে। নগরে জলাশয় বেদখল কিংবা ভরাট হয়ে যাওয়ার পেছনে মানবসৃষ্ট কারণের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক কারণও রয়েছে। সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ওসমানী উদ্যানের একটি জলাশয় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। একটি পার্ক নির্মাণ করতে গিয়ে জলাশয়টি ব্যবহারের উপযুক্ত নেই আর। উল্লেখ্য, বঙ্গবাজারে ভয়াবহ আগুন নেভানোর সময় এই জলাশয় আমাদের কোনো কাজে আসেনি। অথচ জলাশয়টি ব্যবহারোপযোগী থাকলে অন্তত পানির সংকট নিয়ে অস্বস্তি কিছুটা হলেও কমত। বঙ্গবাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল থেকে পানি আনতে হয়েছে।

অগ্নিঝুঁকি নিরসনে এই মুহূর্তে আমি বিল্ডিং কোড ও ফায়ার কোডকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিই। ভবন নির্মাণসংক্রান্ত আইন ও অগ্নিনিরাপত্তা আইনÑ এই দুটো আইনের সমন্বয়ে একটি চেকলিস্ট তৈরি করা জরুরি। এই চেকলিস্ট অনুসারে নগরে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সমস্যাগুলো সারিয়ে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকা শহরের সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধ্বংস করে মাল্টিস্টোরিড ও অত্যাধুনিক করে ফেলা হবেÑ এমনটি ভাবার যুক্তিসংগত কারণ নেই। এটিকে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশাও বলা যাবে না। ২০১৭ সালে রাজধানীর প্রায় ১৭০০ ভবনের ওপর একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। দেখা গেছে, প্রায় ১৩০০ ভবন বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভবনগুলোর ঝুঁকি কি কমানো সম্ভব? অগ্নিনিরাপত্তা আইন ও বিল্ডিং কোডের মাধ্যমে সহজেই ঝুঁকি কমানো যাবে। এই দুটো আইন অনুসরণ করে একটি চেকলিস্ট তৈরি করতে হবে। তবে এ কাজ ধাপে ধাপে করতে হবে। একসঙ্গে এমন কাজ করা সম্ভব নয়। এ কাজ করার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত মার্কেটের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, মালিক, ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হবে। এই কাজের সফল বাস্তবায়নে দোকান মালিক ও মার্কেট কমিটিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সচরাচর আইন না মানার প্রবণতা প্রত্যেকের মধ্যে থাকে। সেজন্য আইনের প্রয়োগ করতে হয়, যেন সবাই আইন মানতে বাধ্য হয়। প্রশাসন যদি আইন প্রণয়নে আরও কঠোর হয়, তাহলে প্রত্যেকেই আইন মানবে। এই মুহূর্তে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে গাফিলতি কিংবা হেলাফেলার সুযোগ নেই। একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ঘটে চলেছে আর আমরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছি মাত্র। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। যদি ফল পেতে হয়, তাহলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আইনের প্রতিপালন ও বাস্তবায়নই অগ্নিঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। এক্ষেত্রে শুধু নোটিস জারি করা কোনো সমাধান নয়। নোটিস জারি করা অনেকটা নিজের দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার মতো দায়সারা একটি বিষয়। কিন্তু সতর্কবার্তা জানিয়ে নোটিস দেওয়া যে ফলপ্রসূ কিছু নয়, তার বড় প্রমাণ বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ড। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাটি পরিদর্শন করে সবকিছু চিহ্নিত করে দিয়ে আসতে হবে। তবে অগ্নিঝুঁকি ঠেকানো সম্ভব হবে।

পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি সামলাতেও আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি দরকার। ২০১০ সালে হাইতি ও চিলিতে ভূমিকম্প বা সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কে ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। হাইতিতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার এবং চিলিতে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৫১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই ভূমিকম্প পরবর্তীকালে মৃতের সংখ্যা দীর্ঘ হতে থাকে। ৯ ফেব্রুয়ারি নাগাদ মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ হাজারেরও বেশি। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হাইতি, চিলি এবং তুরস্কের নগরগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে চিলিতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরও প্রাণহানির সংখ্যা ছিল অনেক কম। এর কারণ, চিলিতে ষাটের দশকে ভূমিকম্পের পর যে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড তৈরি করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে এই কোড মেনেই সব ভবন নির্মাণ করা হয়। এ জন্যই দেশটিতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। বাংলাদেশেও বিল্ডিং কোড তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ নেই। আমরা যদি যথাযথভাবে বিল্ডিং কোড প্রয়োগ করতে পারি, তাহলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে। সেইসঙ্গে বিল্ডিং কোডের পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত সব আইন ও বিধিমালারও যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।


  • নগর পরিকল্পনাবিদ ও অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা