ড. মুহিত্তিন আতামান
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৩ ১৪:০৫ পিএম
আপডেট : ০৪ মে ২০২৩ ১৪:০৬ পিএম
ড. মুহিত্তিন আতামান
আধুনিক অস্ত্রের ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করে পরাশক্তিগুলো একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কিন্তু তারা ভিন্নভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার এক পদ্ধতি করে নিয়েছে, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ স্নায়ুযুদ্ধ। একাধিক রাষ্ট্রের বিবাদকে ব্যবহার করে তারা যুদ্ধাবস্থা পরোক্ষভাবে তৈরি করে। তারপর পেছন থেকে যুদ্ধের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি যুদ্ধের নানা কলকাঠি নাড়তে থাকে।
এমনকি যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতার জন্য অস্ত্র ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে থাকে। স্নায়ুযুদ্ধের মাধ্যমে সর্বপ্রথম প্রক্সিযুদ্ধ ধারণার সূত্রপাত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া তখন কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার কথা ভেবে দুটি দেশ মিত্রশক্তির সঙ্গে নানাভাবে সম্পর্ক রক্ষা করেছে যেন প্রক্সিযুদ্ধের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জড়িয়ে না পড়ে। স্নায়ুযুদ্ধ অতীতের ঘটনা। কিন্তু আজও পশ্চিমা পরাশক্তি প্রক্সিযুদ্ধ চালু রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা সচরাচর দুই ধরনের প্রক্সিযুদ্ধের কথা বলেন। প্রথম ধরনের যুদ্ধ থামানো সম্ভব, কারণ দুটো পক্ষ এখানে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। উদাহরণ হিসেবে সিরিয়া সংকটের কথাই ধরা যাক। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তিনটি পক্ষ কাজ করছে। এখানে বাশার আল আসাদের রেজিম ইরান ও রাশিয়ার সমর্থন পেয়েছে এবং পিকেকে সিরিয়ার শাখা মার্কিন সমর্থন পেয়েছে। এ ছাড়া সিরিয়ার প্রধান গোষ্ঠীগুলো তুরস্কের সরাসরি সমর্থন পাচ্ছে। দ্বিতীয় ধরনের প্রক্সিযুদ্ধ মূলত বিশ্ব রাজনীতির শক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রভাবে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এর বড় উদাহরণ। আঞ্চলিক শক্তি ও বিশ্ব রাজনীতির বড় শক্তিরা একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে প্রক্সি রাষ্ট্র বেছে নেয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাঁকবদলের জন্য এই প্রক্সিযুদ্ধকে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়। রাশিয়া একাধিক রাষ্ট্রকে প্রক্সি রাষ্ট্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এমনকি চীন, রাশিয়া, ভারত ও তুরস্কও বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক সংকটে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালায়।
সুদানের গৃহযুদ্ধও একটি নতুন অপকৌশলের পথ ধরে সৃষ্ট। দুঃখের বিষয়, এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে। ১৫ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত ৫০০-এরও বেশি মানুষ এই গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। আবদেল ফাত্তা আল বুরহানের নেতৃত্বাধীন সুদানিজ আর্মি এবং সুদানের প্যারামিলিটারি গ্রুপ র্যাপাইড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যকার এই সংঘর্ষে এক হাজারেও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুদানের এই জটিল অবস্থানে যেকোনো ক্ষমতাধর আঞ্চলিক কিংবা বৈশ্বিক শক্তি প্রভাবিত করতে পারে। ইতোমধ্যে বাইরের কিছু শক্তি সুদানের এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে নিজ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছে। কোনো শক্তি সুদানের স্বর্ণখনি দখলের কথা ভাবছে, কোনো পক্ষ নীলনদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছে।
সুদানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একাধিক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, মিসর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। এই মুহূর্তে সুদান যে নাজুক অবস্থায় রয়েছে তার সদ্ব্যবহারও এই রাষ্ট্রগুলো করতে শুরু করেছে। বিশেষত সুদানে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে যারা তাদের সঙ্গে এই রাষ্ট্রগুলোর ভালো যোগাযোগ রয়েছে। সুদানের মধ্যে সংকটাবস্তা থাকুক এমনটাই আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক শক্তির ইচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, রাশিয়ার ওয়েগনার প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের খাফতার এই মুহূর্তে যে ভূমিকা পালন করে চলেছে, তা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় সুদানেও একটি প্রক্সিযুদ্ধ চলমান।
সুদানে যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে মানুষের জীবন নানাভাবে পর্যুদস্ত হবে। এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা শতকের কোঠায় থাকলেও দ্রুতই তা হাজার পার করার সম্ভাবনা রয়েছে। এই যুদ্ধের আরেকটি অমানবিক দিক, খাদ্যসংকট এবং দারিদ্র্যের কশাঘাতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করা। এমনিতেই সুদান একটি নিম্ন আয়ের দেশ এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হওয়ায় নানা সমস্যায় ভুগছে। যুদ্ধাবস্থা যে খাদ্যসংকট আরও তীব্র করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুদান যুদ্ধের তৃতীয় সমস্যাটি আরও ভয়াবহ, কারণ এই সমস্যার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার সুদানিজ পার্শ্ববর্তী দেশ চাঁদ ও ইথিওপিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। তা ছাড়া জাতিসংঘ তাদের জন্য অল্প ত্রাণ পাঠালেও তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। শুধু সুদানেই নয়, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান, চাঁদ, লিবিয়া, মিসর, ইরিত্রিয়া এবং ইথিওপিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে চলমান গৃহযুদ্ধ। তবে এই সমস্যার তীব্রতা এখনই অনুমান করা যাচ্ছে না।
তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আফ্রিকার ওই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করার ক্ষেত্রে শরণার্থী সমস্যা যেন বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরণার্থী সমস্যা পার্শ্ববর্তী আফ্রিকান অঞ্চলগুলোর অর্থনীতিতে আঘাত হানবে। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধ যত প্রলম্বিত হবে মানব ও অস্ত্র পাচারের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ যেন বিষফোড়া হয়ে দাঁড়াবে। তুরস্কের ডেইলি সাবাহ পত্রিকা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর : আমিরুল আবেদিন