ভদন্ত স্বরুপানন্দ ভিক্ষু
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৩ ১৩:৫১ পিএম
সাম্য, মৈত্রী, অহিংসাবাদের অন্যতম প্রচারক মহামতি গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধিজ্ঞান বা সর্বজ্ঞতা লাভ, মহাপরিনির্বাণ লাভ এই ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বিশাখা নক্ষত্রে বুদ্ধের জন্ম আর বৈশাখ মাসে এই পূর্ণিমা হয় বলে একে বৈশাখী পূর্ণিমা বলেও অভিহিত করে। এই পূর্ণিমার মাধ্যমে বুদ্ধের সমগ্র জীবনপ্রবাহের চিত্র আমাদের মাঝে ভেসে ওঠে।
খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে এই দিনে মহামতি বুদ্ধ শাক্য রাজবংশে রাজপুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। নাম রাখা হয় সিদ্ধার্থ। শৈশব থেকেই সিদ্ধার্থ ছিলেন চিন্তাশীল এবং ভোগৈশ্বর্যের প্রতি ছিল না আকর্ষণ। মানুষের দুঃখে তাঁর হৃদয় বিগলিত হতো। জ্যোতির্বিদরা গণনা করে বলেন, রাজকুমার হয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা হবেন অথবা সন্ন্যাস গমনে পূর্ণজ্ঞানী মহাপুরুষ হবেন। বেড়াতে বেরিয়ে রাজপুত্রের চোখে পড়ল একদিন আর্তপীড়িত ব্যক্তি, আরেক দিন দেখল জরাভারগ্রস্ত বৃদ্ধ, তৃতীয় দিনে একটি শবযাত্রা, চতুর্থ দিন সৌম্যমূর্তি সন্ন্যাসী। সন্ন্যাস গ্রহণে দৃঢ়সংকল্প সিদ্ধার্থ রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন মানুষের দুঃখ দূর করার উপায় অন্বেষণে। রাজ্যের সিংহাসন, পিতার স্নেহ, পত্নীর প্রেম, নবজাতকের আকর্ষণ কিছুই সিদ্ধার্থকে ধরে রাখতে পারল না।
সংসার ত্যাগের পর ছয় বছর কৃচ্ছ্রসাধন করে বিভিন্ন স্থানে ও নানা জনের সান্নিধ্যে শিক্ষা লাভ করেও দুঃখ নিবারণের কোনো সম্যক পন্থা পেলেন না। পরে তিনি কঠোর তপস্যা ত্যাগ করে মধ্যপন্থা অনুসরণ করে গয়ার কাছে বোধিবৃক্ষের তলে এক শুভ মুহূর্তে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে তাঁর মন সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ হলেন বুদ্ধ বা সম্যক জ্ঞানী বা সর্বজ্ঞতাপ্রাপ্ত।
শুধু নিজের মুক্তি নয়, পৃথিবীর সব মানুষকে দুঃখ-কষ্ট থেকে চিরমুক্ত করার জন্য তিনি তাঁর ধর্মবাণী প্রচার করতে লাগলেন। বুদ্ধত্ব বা সর্বজ্ঞতা লাভের মাধ্যমে বুদ্ধ যে চারটি সত্যের জ্ঞান লাভ করেছিলেন তাকে চতুরার্য সত্য বলে। এই চতুরার্য সত্য হলো : ১. জীবন দুঃখময়। ২. দুঃখময় জীবনের কারণ আছে। ৩. জীবন দুঃখের উৎপত্তিনিরোধ ও দুঃখের বিনাশসাধনই দুঃখ নিরোধ। এবং ৪. কি উপায়ে জীবনে দুঃখের অবসান করতে পারি তা চতুর্থ আর্যসত্য।
বুদ্ধত্ব লাভের পর বুদ্ধ তাঁর জীবপ্রেম, অহিংসা, মানবতাবাদ, নানা বর্ণে সমতা, মৈত্রী ও করুণাসম্পন্ন ধর্ম বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য প্রচার করেন। এভাবে সুখ ও মঙ্গলপ্রদায়ী ধর্ম দীর্ঘ ৪৫ বছর নানা স্থানে, নানা মানুষের কাছে প্রচার করেন এবং তিনি সংঘ প্রতিষ্ঠা করে তাদেরকে মানুষের দুঃখ নিবারণের জন্য, অহিংসার ধর্ম প্রচারের জন্য দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। অনেক রাজা-মহারাজা বুদ্ধের ধর্মে দীক্ষা লাভ এবং সে শিক্ষায় রাজ্য পরিচালনার মাধ্যমে রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। একদিন কুশীনগরের পাবা নগরের মল্লদের শালবনে যমক-শাল বৃক্ষের নিচে অন্তিম শয্যা রচনা করেন। বুদ্ধ বলেন, “হে ভিক্ষুগণ! সমস্ত সংস্কার অনিত্য, ক্ষয়শীল। জ্ঞান-সম্প্রযুক্ত মনে সম্যক স্মৃতিসহকারে অর্থাৎ অপ্রমাদের সাথে নিজ নিজ কর্তব্য সম্পাদন করবে।” বুদ্ধ তাঁর শেষ উপদেশবাণী বলে ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে রাতের শেষ যামে ৮০ বছর বয়সে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন অর্থাৎ অনিত্যতার চরম সত্য নিয়মে ধরাধাম ত্যাগ করেন। বুদ্ধ পূর্ণিমার শেষ বা তৃতীয় ঘটনা গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ।
আমরা অশান্ত বিশ্বের শান্তি কামনা করি। আজ বিশ্বব্যাপী মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ রোধের জন্য, পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বুদ্ধের দেওয়া মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষার শিক্ষা করার। কেননা যুদ্ধ জয়ে শত্রু বাড়ে আর পরাজয়ে বাড়ে দুঃখ। জগতে শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার উপশম হয় না, মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতার উপশম হয়; এটাই চিরন্তন সত্য ধর্ম। এটাই বুদ্ধের ধর্ম। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।