দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৩ ১৪:০০ পিএম
আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৩ ১৪:৩৬ পিএম
পঙ্কজ ভট্টাচার্য।
পরিচয় তাঁর বহুমাত্রিক। এক সময়ের কীর্তিমান ফুটবলার এবং আজীবন রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখি ও সংস্কৃতিচর্চায়ও নিবেদিত ছিলেন। কিন্তু সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নীতিনিষ্ঠ নির্মোহ মানুষ হিসেবে মুখ্য পরিচয়ধারী ছিলেন।
তিনি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। ষাটের দশকের ছাত্রআন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধপর্ব পর্যন্ত ইতিহাসে একরকম পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে দেখতে পাই। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে আরও বেশি উদ্ভাসিত হতে দেখি, তাঁর প্রিয় অঙ্গন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক-অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও রাজনীতির মাঠে পঙ্কজদাকে বরাবরই দেখা গেছে নেতৃস্থানীয় একজন নিরলস কর্মী ও সংগঠক হিসেবে। পঙ্কজদাকে আমি প্রথম দেখি আমার এলাকায় ১৯৮৮ সালে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বক্তৃতাদানকালে। সুঠাম ও দীর্ঘদেহী পঙ্কজদার বক্তৃতা শুনে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম। তার পর যখন আমার সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়, সেই মধ্য নব্বইয়ের দশকে তখন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে ক্রমান্বয়ে স্নেহধন্য হয়ে উঠি। আজীবন অনমনীয় এই যোদ্ধা অনেকের কাছেই বরণীয়-স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
২৩ এপ্রিল দিবাগত রাত প্রায় সাড়ে বারোটায় রাজধানীর পান্থপথে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পঙ্কজদার জীবনাবসান ঘটে। এর মধ্য দিয়ে শুধু একটি প্রাণপ্রদীপই নিভে যায়নি, একই সঙ্গে ৮৪ বছরের আলোকোজ্জ্বল কর্মময় রাজনৈতিক অধ্যায়েরও অবসান ঘটল। পঙ্কজদাকে অনেকেই গণতন্ত্রের পক্ষে আপসহীন-শক্ত মেরুদণ্ডধারী ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। এর সামান্যটুকু প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচন-উত্তর। ওই নির্বাচনে প্রশ্নবিদ্ধ বিজয় লাভের পর তথাকথিত বিজয় উল্লাসের নামে দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াত জোটের কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী এবং তৎকালীন সরকারের আশীর্বাদপুষ্টরা যে সহিংসতা চালিয়েছিল, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ওপর, তা এই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে কদর্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। লালমোহন, আগৈলঝরা, রামশীলসহ দেশের বিভিন্ন জনপদে বিজয় উল্লাসের নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতাকর্মীরা যে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর উপশম আজও হয়নি। বিচারের বাণী এ দেশে কীভাবে নিভৃতে-কাঁদে এবং ন্যায়বিচার এখানে এখনও কত সুদূরপরাহত- এর একটি মাত্র খণ্ডিত দৃষ্টান্ত ওই অধ্যায়। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে স্মৃতিকাতরতার ছায়া পড়ল মানসপটে। ২০০১ সালের সম্ভবত ৯ নভেম্বর (তারিখটি এর দু-একদিন আগে-পিছে হতে পারে, সঠিক তারিখ মনে পড়ছে না) প্রয়াত শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, লেখক, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর অধ্যাপক অজয় রায় ফোন করে জানালেন, তাঁদের সঙ্গে আমাকে লালমোহনে যেতে হবে। স্যার যখন ফোন করেন তখন পঙ্কজদাও স্যারের পাশে ছিলেন। স্যারের কথা শেষ হওয়ার পর তিনি বললেন, পঙ্কজ বাবুর সঙ্গে কথা বলো। রাশভারী পঙ্কজদার দরাজ কণ্ঠের উচ্চারণ আজও আমার কানে ভাসে। তিনি বললেন, ‘আমরা আগামীকাল সকালেই ঢাকা থেকে সরাসরি রওনা হব। তুমি রমনা থানার সামনে থেকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হবে।’ অজয় স্যার এবং পঙ্কজদার নেতৃত্বে কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক লালমোহনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই দলে আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ সংবাদকর্মী।
আমরা সেখানে প্রায় এগারো দিন প্রথম দফায় অবস্থান করেছিলাম। ভোলার একটি সরকারি অতিথিশালা থেকে আমরা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লালমোহনে অবস্থান করে ঘটে যাওয়ার ঘটনার তথ্য-উপাত্ত তুলে আনছিলাম। এর পর আরও কয়েক দফা অজয় স্যার এবং পঙ্কজদার সঙ্গে লালমোহন, রামশীলসহ আরও কয়েকটি বিপন্ন-বিপর্যস্ত জনপদে গিয়েছিলাম। সেই দুঃসহ স্মৃতি নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। কারণ, দেশের সচেতন মানুষ মাত্রই ওই মর্মন্তুদ অধ্যায় সম্পর্কে জ্ঞাত। ওই অধ্যায়টি পঙ্কজদার প্রয়াণের পর তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করতে গিয়ে টেনে আনার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
ওই সময়ে ভোলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক যিনি ছিলেন তিনি অজয় স্যারের সরাসরি ছাত্র। তিনি হঠাৎ এক মধ্যরাতে অতিথিশালায় ছুটে এসে অজয় স্যার ও পঙ্কজদাকে বিনয়ের সঙ্গে বললেন- স্যার, আপনারা ভোলা থেকে চলে যান। আমি হয়তো আপনাদের রক্ষা করতে পারব না। ভোলার তৎকালীন ওই জেলা প্রশাসকের আতঙ্কগ্রস্ত মুখাবয়ব আজও ভুলিনি। জেলা প্রশাসকের অনুরোধের প্রত্যুত্তরে খর্বাকৃতির দুঃসাহসী অজয় স্যার ও পঙ্কজদা প্রায় সমস্বরে বলে উঠেছিলেন, ‘আমরা কারও শক্তি নিয়ে এখানে আসিনি। আমরা এসেছি মানবতার পক্ষে কাজ করতে। বিপন্ন-বিপর্যস্তদের পাশে দাঁড়াতে।’ জেলা প্রশাসক ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে ফিরে গেলেন। এই দুজন সিংহপুরুষের সঙ্গে তখন কাজ করতে গিয়ে দেখেছি নৈতিকতার শক্তির জোর কত প্রবল। নৈতিকতা ও মানবতার আলো ব্যক্তিকে কীভাবে ইতিহাসের উজ্জ্বল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এর সাক্ষ্যও সেদিন পেয়েছি, প্রয়াত শ্রদ্ধাস্পদ দুজন মানুষের নেতৃত্বে মানবতার পক্ষে কাজ করতে গিয়ে।
‘আমার সেইসব দিন’ পঙ্কজ ভট্টাচার্যের জীবনীগ্রন্থ পাঠে এও জেনেছি, কীভাবে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলেন। মাস্টারদা সূর্য সেনের জন্মস্থান চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামে ১৯৩৯ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পঙ্কজদার জন্মের পূর্বাপর নোয়াপাড়া আরও অনেক উজ্জ্বল মানুষের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিকমনস্ক হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট পঙ্কজদার জীবনে তৈরি হয় সেই স্কুলজীবনেই। ১৯৫৪ সালে তিনি জড়ান ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে। পাকিস্তানি শাসনামলে ওই বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে এ ভূখণ্ডে প্রগতিবাদী রাজনীতিকদের পথ কোনোভাবেই মসৃণ ছিল না। ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সংযুক্তির মাধ্যমে পঙ্কজদার যে রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়, এর পরবর্তী ধাপগুলোও ছিল কঠিন। ১৯৬৪ সালে প্রথম তিনি কারাগারে যান। তার পর আরও কয়েকবারই তিনি কারাগারে গেছেন। ১৯৬৭ সালে তার বিরুদ্ধে ‘স্বাধীন বাংলা ষড়য্ন্ত্র মামলা’র অভিযোগ আনা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গভীর সাহচার্য তিনি পেয়েছিলেন তখনই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ইতিহাসের পাতা থেকেই জেনেছি, জেল থেকে যেদিন তিনি মুক্তি পান, তখন তাঁকে মাথা নিচু করে ফটক দিয়ে নয়, পুরো ফটক খুলে দিতে বঙ্গবন্ধু জেল কর্তৃপক্ষকে বলেছিলেন। মাথা উঁচু করেই পঙ্কজদা জেল থেকে সেদিন বেরিয়ে এসেছিলেন।
এ রকম বর্ণাঢ্য অধ্যায় তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনজুড়েই রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মোজাফফর ন্যাপের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে দলটি যখন খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ে, তখনও পঙ্কজদা দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে ‘ঐক্য ন্যাপ’-এর ব্যানারে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়েছেন। তারপর তাঁরই সৃষ্ট সংগঠন ‘সামাজিক আন্দোলন’। জীবনের শেষ পর্যন্ত ওখানেই যুক্ত ছিলেন রাজনৈতিকযোদ্ধা, ন্যায়ের সারথি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। ক্ষুদ্র পরিসরে আদর্শবান, অনুসরণযোগ্য এই ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করা দুরূহ। আজ ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাকে নাগরিক শ্রদ্ধা জানানোর পর পোস্তগোলা মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। এই মহতীর সঙ্গে রয়েছে আমার বেশকিছু স্মৃতি। আজ তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে। অনেক সংগ্রামী অধ্যায়ের প্রত্যক্ষদর্শী ও নেতৃস্থানীয় কর্মী, সংগঠক এবং ইতিহাসের আলোকদীপ্ত ব্যক্তিত্ব , বীর মুক্তিযোদ্ধা পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে বিনম্র শ্রদ্ধা।