× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রামনাথ বিশ্বাস : বাংলাদেশের কিংবদন্তি ভূপর্যটক

আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:৪৯ পিএম

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:৫৪ পিএম

বাংলাদেশের কিংবদন্তি ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস।

বাংলাদেশের কিংবদন্তি ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস।

রামনাথ বিশ্বাস সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। গুগল করলে হয়তো বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটে তার সম্পর্কে ভাসা ভাসা তথ্য পাওয়া যাবে। এমনই এক ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় রামনাথ বিশ্বাস বাইসাইকেলে চেপে পুরো পৃথিবী ঘুরেছেন। হয়তো তার লেখা বইয়ের কিছু ছবি পাওয়া যাবে। ট্রিনো ম্যাগাজিনে একবার রামনাথকে নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করি আমরা। লেখাটি উইকিপিডিয়া বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল এবং উইকিপিডিয়ায় রামনাথ সম্পর্কে এখন একটি লেখা পাওয়া যাবে।

উইকিলিকসের যুগে বাস করা সত্ত্বেও রামনাথ সম্পর্কে তথ্য অপ্রতুল। কিন্তু উইকিপিডিয়া কিংবা ইন্টারনেটের মতো তথ্যভান্ডার থেকে রামনাথ বিশ্বাসের নামটি আমরা বাদ যেতে দিতে পারি না। আজ যার কথা বলতে চলেছি তিনি মূলত একজন বাঙালি পর্যটক। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে একটি সাইকেলে চড়ে পুরো পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন। মজার বিষয় হলো, নোবেল পুরস্কারজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রামনাথের এই অভিযাত্রা শুরু করার আগে শুভকামনা জানাতে একটি বইয়ে তার অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। পর্যটন জগতের বহু মহারথীর জন্ম এই প্রাচ্যে। অতীশ দীপঙ্করের সময় থেকে আজ পর্যন্ত, আমাদের নিজ দেশের মানুষ হোক বা না হোক, পুরো পৃথিবী ঘুরেছেন এমন অনেক মানুষকেই খুঁজে পাওয়া যাবে প্রাচ্যে। যদি এ ধারণা সত্য হয় তাহলে গঙ্গা উপকূলে যত অভিযাত্রীর জন্ম হয়েছে তাদের মধ্যে রামনাথ ধ্রুবতারা বলেই বিবেচিত হবেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, বাইসাইকেলে চেপে তিনি সারা পৃথিবী ঘুরেছেন। ৩৫ বছর বয়সে হঠাৎ ভ্রমণের রোখ চেপেছিল তার । ১৯৩১-১৯৪০, এই ৯ বছরে তিনটি পর্যায়ে ভ্রমণ সম্পন্ন করেন। 

রামনাথ বিশ্বাসের জন্ম ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারি। তার বাবা ছিলেন কট্টরপন্থি ব্রাহ্মণ। পুরোহিত হিসেবে সমাজে তার বেশ নামডাক ছিল। রামনাথের মা দিনের বিরাট একটি অংশ স্থানীয় শিবমন্দিরেই কাটিয়ে দিতেন। বানিয়াচং নামের ওই গ্রামে শিবমন্দিরটি আজও অক্ষত অবস্থায় আছে। গ্রামটি বাংলাদেশের (এমনকি সারা বিশ্বে) সর্ববৃহৎ গ্রাম বলে পরিচিত। গ্রামটি যথেষ্ট পরিচিত হলেও রামনাথের নাম অনেকেরই অজানা। তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন গ্রামটি স্বাধীন দেশের সিলেট জেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম হবে। রামনাথের সময়ে এই গ্রামে প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ বসবাস করতেন।

স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অবশ্য বেশ কিছু মুসলিম পরিবারও ছিল। খুব অল্পবয়সেই রামনাথ মাকে হারান। মাত্র দুই বছর বয়সে রামনাথ টাইফয়েড ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। মাতৃহীনা বালকটিকে ওই সময় দেখভালের কেউ ছিল না। ওই সময়ে পরিচর্যার অভাবে তিনি আজীবন শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন। স্কুলে পড়ার সময় অকস্মাৎ একদিন তার বাবা মারা যান। বাবার এই আকস্মিক মৃত্যুর জন্য পাড়া-প্রতিবেশীরা রামনাথকে অপয়া বলে দোষারোপ শুরু করে। বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত থেকেই বাকি জীবন কাটাতে হয় তাকে। অবশ্য তাতে তিনি স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সুযোগ পান। একা একাই জীবনসংগ্রামে লিপ্ত হন। যেমনটা বলেছি, বানিয়াচং গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। একশ বছরের ধারাবাহিক ধর্মীয় বিভেদ এখানেও প্রভাব রেখেছিল। নিজ ধর্মের অনুশাসন ও আদর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করতেন সবাই। কিন্তু রামনাথ এসব ধর্মীয় বিভেদে বিশ্বাসী ছিলেন না। গ্রামের প্রায় সবার সঙ্গেই তার হৃদ্যতার সম্পর্ক। গরু কিংবা শূকরের মাংস খাওয়ার ব্যাপারেও তেমন বাছ-বিচার করতেন না। ওই সময়ে সমাজে এমন কিছু করার কথা ভাবাও অকল্পনীয়। স্বভাবতই সমাজ তাকে ত্যাগ করেছিল। গ্রামের কেউ তার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখেনি। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি বাঙালি লেবার কোরে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে বেশিদিন কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি কারণ বেশিক্ষণ মার্চ করলেই তিনি ক্লান্ত হয়ে যেতেন। রামনাথের ওজন ১০০ পাউন্ডের কম হওয়ায় তাকে দ্রুত সেনাবাহিনী থেকে ছাঁটাই করা হয়। এদিকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রামনাথ ফের কোরে সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে ১৯১৭ সালে তিনি কমিশন কোরে যোগ দেন। রামনাথ বিশ্বাসকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন তাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীতে চাকরি করার সময় রামনাথের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। কাজের খাতিরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তাকে নিয়মিত যাতায়াত করতে হতো।

১৯১৮ সালে যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা একবার কল্পনা করলেই বিষয়টি বোঝা সহজ হবে। তখনও এই দুই দেশের অনেক অঞ্চল রয়ে গেছে অনাবিষ্কৃত। ভারি আগ্নেয়াস্ত্র বহনের জন্য এরোপ্লেনেরও ব্যবস্থা ছিল না। সৈন্যদের প্রতিদিন অন্তত ৩০ মাইল মার্চ করতে হতো। ক্লান্তিকর হলেও রামনাথ কিন্তু এই মার্চ উপভোগ করতেন। কারণ প্রতিদিনই নতুন কিছু না কিছু দেখার সুযোগ মিলছিল। এভাবেই প্রতিনিয়ত ভ্রমণে তার উৎসাহ বাড়তে শুরু করে, যদিও স্বাস্থ্য ক্রমেই খারাপ হয়ে উঠছিল। একবার তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। সেজন্য ১৯২৪ সালে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। তবে মনে মনে সংকল্প করেছিলেন পুরো পৃথিবী ঘুরে বেড়াবেন এবার, কিন্তু জীবন তার জন্য অন্য পরিকল্পনা রেখেছিল। ইংরেজি, মালয়, চীনা এবং হিন্দি ভাষায় অসামান্য দখল থাকায় তিনি সিঙ্গাপুরে মাইনার কোর্টের একজন খনিজীবী হিসেবে নতুন কর্মজীবন শুরু করেন। একথা সত্য, ভ্রমণের নেশা তার জন্মগত নয়। সিঙ্গাপুরে চাকরির সময় বন্দরের বৈচিত্র্য দেখে মুগ্ধতার রেশ একসময় আকর্ষণে রূপ নেয়। অবশেষে ৩৫ বছর ইস্তফা দিয়ে পৃথিবী ঘুরতে বের হন। কর্মজীবনে সামান্য কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। সেই টাকায় একটি বাইসাইকেল কিনে ফেলেন। এই বাইসাইকেলে চেপেই তার ভ্রমণপর্বের আনুষ্ঠানিকতার শুরু। 

উদযাপনের জন্য উপযুক্ত দিনই বটে! ১৯৩১ সালের ৭ জুলাইয়ের ওই দিনটি ছিল মঙ্গলবার। রামনাথ কুইন্স স্ট্রিট থেকে যাত্রা শুরু করবেন (সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে পুরোনো সড়ক। বর্তমানে সড়কটি আরব স্ট্রিট/কাম্পাং গ্লাম এবং লিটল ইন্ডিয়ার মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। এখানেই বাস টার্মিনালে কুয়ালামপুর থেকে মালেশিয়ার বাস পাওয়া যাবে। বাস টার্মিনালের পাশেই একটি ট্যাক্সি স্ট্যান্ড আছে, যেখানের ট্যাক্সিতে চেপে আপনি জেবিতে পৌঁছুতে পারবেন)। স্থানীয় বাঙালিদের গড়ে তোলা এক মসজিদের সামনে তিনি সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। হাজারো স্থানীয় দর্শক ভিড় জমিয়েছে এই ঐতিহাসিক যাত্রার সাক্ষী হতে। রামনাথ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি তাকে বিদায় জানাতে এত মানুষ ভিড় করবে! রামনাথ প্রত্যাশা করেছিলেন কয়েকজন কাছের বন্ধুই শুধু তাকে অভিবাদন জানাতে আসবেন।

রামনাথের ভাষ্যমতে, “বাতাসে জোর গুঞ্জন। চারপাশে ‘আল্লাহু আকবার’ ‘বন্দে মাতরম’-কে ছাপিয়ে যাচ্ছিল।” মানুষের এই ঢল তাকে ভীষণভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ভবিষ্যতে ভ্রমণের উৎসাহও তিনি এই অভিজ্ঞতা থেকেই নিয়েছেন। তার সাইকেলের সামনে ত্রিভুজাকৃতি ছোট ব্যানারে লেখা ছিল ‘হিন্দু অভিযাত্রী’। মানুষের ওই ভিড় থেকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও পেয়েছিলেন। ধর্মের চেয়ে ব্যক্তি ও তার অর্জন অধিক গুরুত্বপূর্ণ! কিন্তু সামনের যাত্রাপথ আরও কঠিন। ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় করা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই। এ ছাড়া ভারতে ভিসা কিংবা ট্রাভেল পারমিট জোগাড় করা তখন বেশ কঠিন। এই কারণে যাত্রাপথে বহুবার তাকে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সাইকেলের পেছনের চাকার ওপরের র‌্যাকে সবসময় অটোগ্রাফ সংযুক্ত একটি বই, মশারি এবং লম্বা কাপড় বেঁধে রাখতেন। এ ছাড়া কাঠের একটি বাক্সে সাইকেল ঠিক করার যন্ত্রপাতিও রাখতেন। বলা বাহুল্য, এই পুরো অভিযাত্রায় পকেটে এক টাকাও রাখেননি।

রামনাথ বিশ্বাস করতেন সঙ্গে টাকা রাখা মানেই নিজ স্বার্থ হাসিলে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। দর্শন বিষয়ে তিনি একটি বই লিখেছিলেন। ওই বইয়ে টাকা ছাড়া পুরো পৃথিবী ভ্রমণের পরামর্শ দিয়েছেন। জীবনে যত দেশ পরিদর্শন করেছেন সেসব দেশের মধ্যে চীন তাকে বেশি মুগ্ধ করেছিল। ১৯৩১ সালে মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ড হয়ে তিনি ইন্দোচীনে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে পেকিং। এই শহরটি তার সবচেয়ে প্রিয় বলে জানা গেছে। পেকিং থেকে প্যাডাল ঘুরিয়ে মাঞ্চু মুকদেন এবং বোর্ডিং শহর ঘুরে বেড়ান। অবশেষে আন্তং থেকে কোরিয়া এবং তারপর নৌপথে ফের জাপানের কোবেতে পৌঁছান ১৯৩২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর।

পরবর্তী সময়ে রামনাথের ভ্রমণকাহিনি ধারাবাহিকভাবে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বই আকারেও প্রকাশিত হয়েছে অনেক লেখা। প্রায় একশ বছর আগে বেরিয়ে পড়েছিলেন অজানাকে জানার উদ্দেশ্য নিয়ে। অথচ এমন এক কিংবদন্তিকে আমরা এখনও চিনতে পারিনি। সম্প্রতি হবিগঞ্জ জেলায় রামনাথ বিশ্বাসের পৈতৃক ভিটা দখল করে নেওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কিংবদন্তিতুল্য এই ভূপর্যটকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এমন সংবাদ আমাদের মনে দুঃখ দেয়। রামনাথ বিশ্বাসের স্মৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের। আমরা মনে করি, তার জীবন-কর্ম আরও মনোযোগ ও গবেষণার দাবি রাখে। পরিশেষে রামনাথ বিশ্বাসেরই উক্তি দিয়ে লেখাটি শেষ করছি, ‘দেশ দেখা যার একমাত্র কাজ, তার আবার হারিয়ে যাওয়া কী?’

লেখক : প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন

প্রবা/ইউরি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা