× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সেলিনা শেলীর মন্তব্য ও সুযোগসন্ধানীদের মৌতাত

ড. মোহীত উল আলম

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৩ ০২:০৭ এএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

সম্প্রতি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে চট্টগ্রামের এক কলেজের শিক্ষয়িত্রী বিপদে পড়েছেন তার নাম সেলিনা আক্তার শেলী আর কলেজটির নাম চট্টগ্রাম বন্দর মহিলা কলেজ তিনি ওই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তার স্ট্যাটাসের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িকভাবে কর্মচ্যুত করে, যা তদন্তসাপেক্ষে চূড়ান্ত বরখাস্তে রূপ নিতে পারে ফেসবুকে এরপর থেকে ওই শিক্ষয়িত্রীর পক্ষে-বিপক্ষে মতামতের ঝড় বইছে শেলী নিজেই কবি হিসেবে খুব প্রতিভাবান এবং পরিচিত ফলে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক মহলে শুধু নয়, পুরো দেশে শেলীর চাকরি হারানোর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঢেউ উঠছে আজ (১৯//২৩) এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন ফেসবুকের মাধ্যমে জানলাম শেলীর চাকরির পুনরুদ্ধারের দাবিতে ঢাকার শাহবাগে মানববন্ধন হবে

এই পরিস্থিতির আলোকে আমার কিছু নিজস্ব অভিমত উপস্থাপন করতে চাই ফেসবুক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সক্রিয় মাধ্যম মানুষের কোনো অঙ্গের সঙ্গে যদি ফেসবুকের তুলনা করা হয়, সেটি হবে জিভ ফেসবুক একান্তই প্রযুক্তিনির্ভর একটি যোগাযোগমাধ্যম প্রযুক্তিপূর্ব যুগে লেখালেখির মাধ্যমে আগে যে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো, তাতে যে শারীরিক দূরত্ব ছিলÑ সেটি কখনও মোচন করা যেত না অথচ ফেসবুকের ধরনটা হচ্ছে শারীরিক দূরত্বটা যেন থেকেও নেই, যাকে প্রযুক্তির ভাষায় ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বলা হচ্ছে অর্থাৎ ফেসবুকে যখন কেউ তার টাইমলাইনে একটা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, এর প্রতিক্রিয়া এমন হয় না যে একজন যেন আরেকজনকে বা বহুজনকে লিখে একটা বার্তা দিচ্ছেন বরঞ্চ প্রতিক্রিয়া এমন হয়, একজন যেন আরেকজনের সঙ্গে কিংবা বহুজনের সঙ্গে কথা বলছেন ফেসবুক তাই লেখালেখির মাধ্যম হলেও এর বাস্তব প্রতিক্রিয়া হয় কথা বলার মতো সরাসরি ধর্মীয় এবং নিধর্মীয় বহু ব্যক্তি প্রাচীনকাল থেকেই এই সিদ্ধান্তে এসেছেন, মানুষকে সবচেয়ে বেশি সংযত থাকতে হবে তার জিভ নিয়ে বলা হয়, কথা দিয়ে মানুষের মন ভাঙা নাকি ইবাদতখানার দেয়াল ভাঙার চেয়েও নিকৃষ্ট কাজ শেক্সপিয়ারের আলোচিত নায়ক হ্যামলেট তার মায়ের ওপর ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘আই উইল স্পিক ড্যাগার্স টু হার, বাট ইউজ নান’ (আমি আমার জিভকে ছুরির মতো ব্যবহার করব, যদিও কোনো ছুরি ব্যবহার করব না)

ফেসবুকে কোনো স্ট্যাটাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এটা মনে রাখতে হবে, প্রতিক্রিয়াটা নেতিবাচক হলে বা প্রতিপক্ষের বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হলে সেটা হবে ঝগড়া বা মারামারি সংঘটিত হওয়ার মতো একটি ব্যাপার কারণ প্রযুক্তির সুবিধার কারণে খড়ের গাদায় আগুন লাগার মতো এটি দ্রুত অন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়ে শুধু কথা নয়, ছবির ক্ষেত্রেও তাই বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা আইনও তৈরি হয়েছে গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্য দিয়ে বেসামাল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তবে আইনটি বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে বলে শুরু থেকেই নিয়ে বিতর্ক চলছে সম্প্রতি সরকারের দিক থেকে বলা হয়েছে অচিরেই কিছু সদর্থক সংশোধনী বা পরিমার্জন আনা হবে আমি মনে করি, গণতন্ত্রের শোভা বর্ধনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তথা বাক স্বাধীনতা অপরিহার্য, কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতা নয়

সেলিনা আক্তার তার স্ট্যাটাসেরামাদানশব্দটা নিয়ে মজা করেছেন কিন্তু ফেসবুক যেহেতু জিভের মতো কাজ করে, নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দানকারীরা বলছেনÑ তাতে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে আমার কাছে মনে হয়েছে স্ট্যাটাস দানকারী কী বলেছেন সেটা নয়, কিন্তু তার বলার মধ্যে সম্ভবত একটু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি ছিল বিধায় প্রতিক্রিয়া এমন জোরালো হয়েছে বলা বাহুল্য, ওই স্ট্যাটাসে মুসলমানেরা যেমন (সবাই নন), তেমনি হিন্দুরাও (সবাই নন) অখুশি হয়েছেনÑ এমন কথাও শোনা গেছে তবে খুশি-অখুশির কথা বাদ দিয়ে এমনই যদি স্ট্যাটাসটিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টি থেকে দেখা যায়, তা হলে বলতে হবে রামাদান আমাদের কাছে নতুন চালুকৃত শব্দ আমরা বলি রোজা, আর রমজান শব্দটা কবি নজরুল সেই রমজানের রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদবলে বিখ্যাত করে গেছেন অন্যদিকে, শব্দের ধ্বনিগত মিল থেকে কারোর মনেরামাদানশব্দ শুনলে অন্য শব্দও চলে আসতে পারে এটা কেউ লিখলে সেটা নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভীষণ বাহাস তৈরি করা কতটা সঙ্গত?

বলা বাহুল্য, দেশে অতি তীব্রভাবে উগ্রবাদী আচার-আচরণ অনুসরণের জন্য একটি মৌতাত তৈরি হয়েছে, যাতে উগ্রবাদীরা রাজনৈতিক সুবিধা আদায়েরও প্রচেষ্টায় নিয়োজিত আছেন তারা যে শেলীর আচানক মন্তব্যের পালে হাওয়া লাগিয়ে নিজেদের পাল ওড়াচ্ছেন না, তাও নয় হীনস্বার্থবাদী-সুযোগসন্ধানীদের তো স্বভাবই সুযোগ খোঁজা শেলীর মন্তব্যকে পুরোপুরি একটি সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টায় একটি মহল যে সক্রিয়, তাও বোঝা যায় কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তার মন্তব্যের জন্য ভদ্রমহিলা চাকরি প্রায় খুইয়ে ফেলতে যাচ্ছেন অর্থাৎ তার জীবিকা নির্বাহের উপায়টি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা গেছে এর ফলে একটা মারাত্মক মানবিক সমস্যা তৈরি হলো, অর্থাৎ অমানবিকতার ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে একটা শব্দগতফান’-নির্ভর ক্ষণিক উত্তেজনা প্রদানকারী মন্তব্যের জন্য একজন তার পেশা হারিয়ে ফেলবেন, এই পরিণতিতে যাওয়ার আগে তাকে নিন্দাজ্ঞাপনপূর্বক কর্তৃপক্ষীয় হুঁশিয়ারি দেওয়া যেত কি না, সেটিও একটু যাচাই করে দেখা যেত মনে হয় কিংবা সে সুযোগ কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করেছে কি না, জিজ্ঞাস্য থেকে যাচ্ছে তাও

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত একজন স্ট্যাটাস দানকারী না- বুঝতে পারেন তার অত্যন্ত লঘুচ্ছলে দেওয়া স্ট্যাটাস বঙ্গবাজারে আগুন লাগার মতো কাণ্ড ঘটাতে পারে ব্যাপারটা হচ্ছে, ফেসবুক উন্মুক্ত লেখার বা ছবি প্রদানের মাধ্যম বলেই এখানে সবচেয়ে জরুরি হলোÑ এই কথা অনুধাবন করা, ব্যবহারকারী নিজেই নিজের সম্পাদক পত্রিকায় লেখা পাঠালে যেকোনো বিভাগে, একজন বিভাগীয় সম্পাদক থাকেন, তিনি লেখাটা সম্পাদনা করেন, যাতে পাঠকের কাছে গেলে লেখকের বা পত্রিকার কোনো বিপত্তি না হয় কিন্তু ফেসবুকে সেই সুযোগ নেই নিজেই নিজের সম্পাদক শিক্ষয়িত্রীর স্ট্যাটাস নিয়ে এই জন্য প্রতিক্রিয়া এত চরমে গেছে যে কারণ সবাই ভাবছেন তিনি তো একজন শিক্ষক এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক তিনি কেন রকম একটি হালকা কিন্তু উত্তেজক ধরনের স্ট্যাটাস দিলেন

এক্ষেত্রে একটা রাস্তা আমার মনে হয় সবাই অনুসরণ করতে পারি সেটি হলো, যে ধরনের স্ট্যাটাসের ফলে প্রতিক্রিয়ার আগুনে-হাওয়া বইতে পারেÑ সেই ধরনের স্ট্যাটাস ফেসবুকে আপলোড করার আগে ব্যবহারকারী তার আস্থাভাজন বিজ্ঞ কারও কাছে ব্যক্তিগতভাবে পাঠাতে পারেন মতামতের জন্য এই পদ্ধতিতে বেশ সুফল পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস আর দ্বিতীয় উপায়টি হলো, সরাসরি খোলাখুলি ক্ষমা চাওয়া মানুষমাত্রই ভুল করতে পারে বা মানুষমাত্রই নিজের অজান্তে সীমা অতিক্রম করতে পারে সে রকম হলে ক্ষমা চাইতে কোনো দোষ নেই বা সংকোচ থাকার কথা নয় ফেসবুক মতপ্রকাশ বা লেখার মাধ্যম সব ধরনের মানুষই এখানে আছে অর্থাৎ উদার, প্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা মানুষ যেমন আছে, তেমনি আছে ধর্মান্ধ, সংকীর্ণমনা, ঝগড়াটে বা বোধহীন, নিম্নরুচির মানুষও আছে কাজেই স্ট্যাটাস যদি রকমই হয় যে কোনো একটা গোষ্ঠী ক্ষেপে গেল, তা হলে বুঝতে হবে আপনি ফেসবুকের চরিত্রটাই বোঝেননি সিরিয়াস কথাবার্তা বলতে হবে ফেসবুকের বাইরে ফেসবুকের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা পেশাগত দিক উন্মোচন করে কোনো মতাদর্শভিত্তিক ডিসকোর্সে না যাওয়াই ভালো ফেসবুকের বিতর্ক তাই নিছক বিতর্ক ফেসবুককে জিভের সঙ্গে তুলনা করলাম, আর এর কর্মপদ্ধতির সঙ্গে যদি কোনো বিষয়ের তুলনা করতে হয় তা হলো জ্বলন্ত সিগারেট -নেভানো সিগারেটের আগুন থেকে যেমন সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়, তেমনি ফেসবুকে অসতর্ক স্ট্যাটাস পড়লে সে রকমের পরিস্থিতি তৈরি হয়

শেষ কথাটা হলো, মানুষমাত্রই রাজনৈতিক জীব তার যেমন পক্ষের লোক থাকবে, তেমনি বিপক্ষেও লোক থাকবে আপনাকে যারা পছন্দ করে না, তারা যে আপনাকে বিপদে ফেলার জন্য তক্কে তক্কে থাকবেন না তা তো নয় সেই অর্থে ফেসবুক একটা তাজা হ্যান্ড গ্রেনেড তাই ওই কথাটি বলেই শেষ করিÑ হ্যান্ডল উইদ কেয়ার


  • শিক্ষাবিদ  কথাসাহিত্যিক

 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা