সম্পাদক
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ০২:৪৬ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
বঙ্গবাজারের
ভয়াবহ আগুনের দগদগে
ক্ষত এখনও দৃশ্যমান। ওই ভয়াবহ ঘটনার
এগারো দিন পর ১৫ এপ্রিল
ভোরে ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে
আগুনের ঘটনা রহস্যের
দানা যেন পুষ্ট
করে। ১৬ এপ্রিল
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর শীর্ষ
প্রতিবেদনে নিউ সুপার
মার্কেটে এই আগুনের
উৎস আগের মতোই
অজানা বলা হয়েছে। আবারও
নিঃস্ব হয়ে গেলেন
অনেক ব্যবসায়ী। ঈদের
ঠিক আগে এই সর্বনাশ ব্যবসায়ীদের
পক্ষে পুষিয়ে ওঠা যেমন দুরূহ, তেমনি কেন বারবার ‘ ভোরের এই রহস্যময় আগুন’, তাও প্রশ্ন। সাম্প্রতিক
এই ঘটনাগুলোয় প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা তদন্তের
নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি
এও বলেছেন,
মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড নাশকতা
কি না তা তদন্ত করে দেখা হবে। নাশকতার
আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকও।
ঢাকা
নিউ সুপার মার্কেটে
প্রায় চার ঘণ্টার
আগুনে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি
হয়েছে দুই থেকে
আড়াই শ কোটি
টাকা। পুড়ে ছাই হয়েছে অন্তত
আড়াই শ দোকান। এর বাইরে আরও পাঁচ শতাধিক
দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম
তো বটেই,
সমাজের নানা মহল থেকেও প্রশ্ন
উঠেছে, এত আগুন-বিস্ফোরণ কিসের
আলামত? একের পর এক আগুন
ঘিরে এই যে নানা সংশয়
ও প্রশ্ন,
তা অমূলক বলে উড়িয়ে না দিয়ে এর উৎসে নজর দেওয়ার প্রতি
আমরা জোর দেই। অপরিকল্পিত
নগরায়ণ, অগ্নিঝুঁকি নিরাপত্তা
হ্রাসের করণীয় ব্যাপারে
ঘাটতি, অগ্নিদুর্যোগ মোকাবিলায়
সক্ষমতার অভাব,
অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, প্রয়োজনীয় জলাধারের
অভাব ইত্যাদি অভিযোগ
নতুন নয়। কিন্তু
সম্প্রতি রাজধানীতে একের
পর এক আগুনের
ভয়াবহ ঘটনাগুলো এসব অভিযোগ ছাপিয়েও
আরও যেসব প্রশ্ন
দাঁড় করিয়েছে এর কোনোটিই তদন্ত
কিংবা খতিয়ে দেখার
বাইরে রাখার অবকাশ
আছে বলে আমরা
মনে করি না। ঢাকা
মহানগরীতে আগুনসহ বিভিন্ন
ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায়
পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতির বিষয়টিও
আমরা গুরুত্বের সঙ্গেই
দেখতে চাই। কয়টি
সংস্থা এমন দুর্যোগ
মোকাবিলায় জড়িত বেশিরভাগ
ক্ষেত্রে তা অজানা। আমরা
জানি, মহানগরের দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনায় স্ট্যান্ডিং অর্ডার
অন ডিজাস্টারের ক্ষেত্রে
মূল দায়িত্ব কাগজপত্রে
সিটি করপোরেশনের। অথচ সব সেবা
সংস্থা কিন্তু সিটি
করপোরেশনগুলোর নিয়ন্ত্রণে নেই। দুর্যোগ
মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমরা
মনে করি,
এও বড় ধরনের
জটিলতা। ঢাকা মহানগরের
জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কুড়ি
বছর মেয়াদি রাজউকের
একটি মাস্টার প্ল্যানের
কথাও আমরা জানি। এই মাস্টার প্ল্যান
প্রণয়নের আগে নগর পরিকল্পনাবিদদের সুপারিশ
কিংবা মতামত নেওয়া
হয়েছিল। মহানগর-নগর-শহর কিংবা
দেশের যেকোনা জনপদকে
নিরাপদ করতে হলে যেমন সুপরিকল্পনা
ও এর যথাযথ
বাস্তবায়ন প্রয়োজন,
তেমনি প্রয়োজন প্রত্যেকটি
সেবা সংস্থার মধ্যে
যথাযথ সমন্বয়। কিন্তু
দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রে
যে যথেষ্ট ঘাটতি
রয়েছে এর সাক্ষ্য
মিলেছে রাজধানীতে সাম্প্রতিক
আগুন-বিস্ফোরণজনিত ঘটনাগুলোর
ক্ষেত্রেও।
বঙ্গবাজার
ও নিউ সুপার
মার্কেটের ঘটনা পুনরায়
গুরুত্বের সঙ্গে সতর্কবার্তাগুলো
আমলে নেওয়ার তাগিদ
দিয়েছে। অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার
কোনো ঘাটতি অগ্রাহ্য
করার ন্যূনতম অবকাশ
আর নেই। আমরা
গুরুত্বের সঙ্গে বলতে
চাই, এই ব্যবস্থায়
ঘাটতি থাকলে সর্বসাম্প্রতিক
বঙ্গবাজার ও নিউ সুপার মার্কেটের
মতো যেকোনো বাণিজ্যিক-আবাসিক কিংবা
বসত এলাকা মুহূর্তেই ‘জতুগৃহ’
হয়ে উঠতে পারে। আমাদের
স্মরণে আছে,
পুরান ঢাকাসহ বনানী
এবং ঢাকার আশপাশে
আরও কয়েকটি ভয়াবহ
আগুনের ঘটনা,
যার কোনোটিই দূর অতীতের নয়। এসব বিষয় নিয়ে
এযাবৎ কথা হয়েছে
বিস্তর, সিদ্ধান্ত গ্রহণের
ক্ষেত্রেও ঘাটতি ছিল না,
কিন্তু দৃশ্যত কাজের
কাজ কিছুই হয়নি। আমরা
মনে করি,
এই অবহেলা-উদাসীনতা অপরিণামদর্শিতার
নামান্তর। যে বিষয়গুলো
নতুন করে আমাদের
উদ্বেগান্বিত করেছে। এর কারণগুলো চিহ্নিত
করে উৎসে নজর না দিলে
অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে
মুক্তি পাওয়া দুরূহ। ঈদুল
ফিতরের আগে রাজধানীতে
একের পর এক আগুন-বিস্ফোরণজনিত ঘটনায়
যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে
তা অঙ্কের হিসাবে
যতটা না স্ফীতÑ তার চেয়েও
সত্য হলো,
এই ক্ষতি পুষিয়ে
নেওয়া দুরূহ। আমরা
ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেকের পাশে
সরকারকে দাঁড়ানোর আহ্বান
জানানোর পাশাপাশি এ কথাও স্মরণ
করিয়ে দিতে চাই, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে
বিন্দুমাত্র ছাড় নয়। দুর্যোগ
মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন
যেমন জরুরি,
তেমনি মহানগরের জলাশয়গুলো
পুনরুদ্ধার করে প্রাকৃতিক
ভারসাম্য রক্ষায়ও সমভাবেই
মনোযোগী হতে হবে। জীবনবিনাশী
এমন কর্মকাণ্ডের পেছনে
যদি কোনো কালো
হাতের সম্পৃক্ততা থাকে, তা হলে এরও কঠোর
প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে
হবে দেশ-জাতির স্বার্থেই। রাজধানীতে
আগুনের কারণ নিবারণের
চ্যালেঞ্জগুলো যেহেতু অচিহ্নিত
নয়, সেহেতু এর নিরসনও কঠিন
নয় বলে আমরা
মনে করি।