মেজর (অব.) একেএম শাকিল নেওয়াজ
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:১৪ পিএম
আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:১৭ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি, বিশেষ করে রাজধানীতে ক্রমেই কতটা প্রকট
হয়ে উঠছে সাম্প্রতিক একের পর সংঘটিত কয়েকটি ঘটনাই এর সাক্ষ্য দেয়। সম্প্রতি ঢাকায় কয়েকটি
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুধু হতাহতের মর্মন্তুদ চিত্রই আমরা প্রত্যক্ষ করিনি, একই সঙ্গে
সম্পদহানির চিত্রও অনেক স্ফীত হয়ে উঠেছে। একেকটি ঘটনার পর বিভিন্ন মহল থেকে নানারকম
কথা শোনা গেছে কিন্তু এই সত্য অস্বীকারের কোনো পথ নেই, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি নিরসনে কার্যত
কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এসব ব্যাপারে আসলেই কথা হয়েছে বিস্তর এবং হচ্ছেও, কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের
ঝুঁকিহ্রাস কিংবা জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের যথেষ্ট
ঘাটতি যে রয়েছে এই অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ ক্ষীণ।
বঙ্গবাজারে আগুন নিয়ন্ত্রণে সাত ঘণ্টা এবং ১৫ এপ্রিল নিউ সুপার
মার্কেটে ভয়াবহ আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রায় চার ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে
এত সময় লাগার পেছনে চারটি কারণ রয়েছে। প্রথম
কারণ, নিউমার্কেটে উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যেমন নেই তেমনি ব্যবসায়ীদের অগ্নিনির্বাপনের
উপযুক্ত প্রশিক্ষণও নেই। দ্বিতীয়ত, ফায়ার সার্ভিসকে আগুনের বিষয়ে অবহিত করার ক্ষেত্রে
কালক্ষেপণের ফলেও আগুন বড় আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। এমন সময় ফায়ার সার্ভিসকে
আগুনের পরিসর দেখে আরও সতর্ক হতে হয়। কারণ অগ্নিনির্বাপণ কৌশলে ভুল হলে আগুন বাড়বেই।
তাই রিসপন্ডিং অফিসারকে লক্ষ রাখতে হয় তার টেকনিক আদৌ ঠিক কি না। তৃতীয়ত, অগ্নিনির্বাপণের
জন্য পর্যাপ্ত পানির জোগান আছে কি না এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য। চতুর্থত, উৎসুক জনতার ভিড় অনেকাংশেই উদ্ধারকার্য
ব্যাহত করে। এই চারটি সমস্যা আমাদের ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের অগ্নিনির্বাপণে বিলম্বের
সবচেয়ে বড় কারণ। সাম্প্রতিক ঢাকায় ঘটে যাওয়া প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনার ক্ষেত্রেই এ বিষয়গুলো
পরিলক্ষিত হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সূর্যোদয়ের পরপরই ঢাকায় নিউ সুপার মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের
খবর জনমনে ফের চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে। ইলেকট্রনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে যখন মানুষ এই চিত্র
দেখছিল তখন সঙ্গত কারণেই তাদের মানসপটে অতীতের ঘটনাগুলো ভেসে উঠছিল।
অগ্নিনির্বাপণের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত দিকও বিবেচনা করা জরুরি। যেখানে
আগুন লেগেছে, সেখানকার অবকাঠামো কীভাবে তৈরি তাও অগ্নিনির্বাপণ পদ্ধতি নির্ধারণ করে
দেয়। অনেক সময় অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে আগুন নেভানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন প্রাকৃতিক
প্রতিকূলতাও আগুন বড় করে তুলতে পারে। বাণিজ্যিক বিপণি এলাকায় তাই পর্যাপ্ত পানির মজুদ
রাখতে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের সিংহভাগ মার্কেটেই এমন ব্যবস্থা নেই। এমনটি
শুধু যে মার্কেটের ক্ষেত্রেই, তাও নয়। পুরো ঢাকা মহানগরীতে প্রয়োজনের নিরিখে জলাধার
একেবারেই অপ্রতুল। একটি বড় মার্কেট তৈরি করা গেলে তার বেজমেন্টে বড় পানির ট্যাংক করা
খুব কঠিন কিছু নয়। যদি বেজমেন্টে করা সম্ভব না হয় ছাদ কিংবা মার্কেটের বাইরে খোলা অংশেও
করা যায়। কিন্তু সদিচ্ছার অভাব থাকায় এমন কিছুই হচ্ছে না। নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসায়িক
স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। নিউ সুপার মার্কেটের অবকাঠামোগত দিকটি ভেবে দেখা দরকার।
ওখানে দোকানগুলো ঘিঞ্জি। খরচ বাঁচাতে একটি ছোট অংশই একাধিক ব্যবসায়ীকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
এভাবে দোকান বণ্টন করার ফলে ওই মার্কেটের ওপর অগ্নিঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া
কঠিন হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে অগ্নিকাণ্ডের
সময় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদেরও কিছু করার থাকে না। সচরাচর নতুন ভবনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন
বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পুরাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই বেশি
কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যখন রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে তখন সুরাহার একটি পথ তৈরি
হবে সহজে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এটিও এক ধরনের সমস্যা সমাধানের অন্যতম উপায়
বইকি।
যেকোনো ব্যবসায়িক বিপণি কেন্দ্রে অগ্নিঝুঁকি কমানোর জন্য স্থানীয়
জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে তদারকি সংস্থা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর চেয়ে জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ বেশি রয়েছে। যদিও এমন পদক্ষেপ
নেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি দৃশ্যমান। তবে হ্যা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও এখানে
কিছু কর্তব্য রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কাজের পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উৎসুক জনতার ভিড়ে ফায়ার সার্ভিস
কর্মীদের কাজ করতে নানা অসুবিধা হয়। বঙ্গবাজারের ঘটনার কথাই ধরা যাক। উৎসুক জনতা চারপাশে
ভিড় করে সেলফি তুলেছে বা ভিডিও ধারণ করেছে। এসব কারণে আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিস
কর্মীদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ওপর
হামলাসহ গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ওই গাড়ি আর অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহার করা যাবে না।
এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতির বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে
তাই এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে। ফায়ার সার্ভিস আইনের ১৮ নাম্বার ধারায় বলা হয়েছে,
ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দায়িত্বরত অবস্থায় কোনো হামলা, ভাঙচুর কিংবা প্রতিবন্ধকতার শিকার
হলে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এ ক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তিকে সর্বনিম্ন ছয়
মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আমরা দেখছি, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অগ্নিনির্বাপণ করতে
গিয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মী অর্থাৎ অগ্নিযোদ্ধারা হতাহতও হচ্ছেন। তারা সজ্ঞানে দায়িত্বপালনে
ত্রুটি করেনÑ এমনটি আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু তাদের যখন দায়িত্বপালন করতে গিয়ে বৈরী
পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, এর প্রতিকার কিংবা প্রতিবিধান কি সে রকমভাবে নিশ্চিত হয়?
দুর্যোগের আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে পরিকল্পনা
পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমে অবকাঠামোগত পরিকল্পনায় অগ্নিঝুঁকি নিরসনের বিষয়গুলো
খতিয়ে দেখতে হবে। বাণিজ্যিক বিপণি কেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রথমেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা
নিতে হবে। কোথায় গাড়ি পার্কিং করা হবে, কোথায় কতটুকু জায়গাজুড়ে দোকান দেওয়া যাবে, আগুন
মোকাবিলার প্রাথমিক সরঞ্জাম কোথায় কি পরিমাণে থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে পর্যাপ্ত
প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনা পর্যায়ে নীতিনির্ধারণের মাধ্যমেই
মূলত অগ্নিঝুঁকির আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কারণ পরিকল্পনার সুষ্ঠু
বাস্তবায়ন সম্ভব হলে তাতে শুধু অগ্নিঝুঁকিই কমবে তা নয়, বরং কখনও আগুন লাগলে ফায়ার
সার্ভিস কর্মীরাও দ্রুত তা নেভানোর ব্যবস্থা নিতে পারবেন। ভবনের পরিকল্পনা করার পর
তা রাজউকের কাছে পাঠানো হবে। রাজউক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে অনুমোদন
দেওয়ার পর অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করা যাবে। ভবন নির্মাণের সময় তদারকি সংস্থাগুলোকে
নজর রাখতে হবে। নির্মাণাধীন প্রক্রিয়ায় যেন পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করা হয় তাও নিশ্চিত
করতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বিপদসঙ্কুল কোনো পথের
কথা এতটা ভাবার দরকার হবে না। পরিকল্পনা অনুসারে সবকিছু বাস্তবায়ন করা গেলে দুর্যোগে
আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন কিছু নয় বলে মনে করি। নিউ সুপার মার্কেটে আগুন
লাগার উৎস নিয়ে এখনও সঠিক তথ্য মেলেনি। আশা করি, তদন্তে আগুনের উৎস সন্ধান হবে এবং
এর প্রতিবিধান অর্থাৎ যা কিছু করণীয় সব নিশ্চিত করা হবে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দায় তদারকি সংস্থাগুলো কোনোভাবেই এড়াতে পারে
না। আমাদের স্মরণে আছে, বঙ্গবাজার মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ২০১৯ সালেই চিঠি
দেওয়া হয়েছিল। ঝুঁকিপূর্ণ শনাক্ত হওয়ার পরও সেখানে ব্যবসা পরিচালিত হয়েছে। চিঠি পাঠানোর
চার বছর পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীরা ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। বিশেষত ঈদের
আগে তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা, তা সংবাদমাধ্যমে কল্যাণে অনেকেরই জানা আছে। এই দীর্ঘ
সময়েও তদারকি সংস্থা কোনো পদক্ষেপ কেন নেয়নি, সেটিও একটি প্রশ্ন। তদারকি সংস্থার দায়িত্ব
জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু তারা যদি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে আইন কার্যকারিতা
হারাবে। ফলে বাড়বে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। এমন ঝুঁকিপূর্ণ
জায়গায় যারা ঋণ দিচ্ছে, ওই ব্যাংক বা বীমা প্রতিষ্ঠানও কোনোভাবে দায় এড়াতে পারে না।
নিউ সুপার মার্কেটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত
ডিজি নাশকতার আলামত খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ ব্যাপা,। তাই কোনো
মন্তব্য না করাই শ্রেয়। তবে মনে রাখতে হবেÑ প্রাকৃতিক, দাবানল অথবা দুর্ঘটনাজনিতÑ এই
তিনটি কারণে আগুন লাগতে পারে। নিউ সুপার মার্কেটের ক্ষেত্রে প্রথম দুটি আমাদের বাদ
দিতে হবে। বাকি থাকে দুর্ঘটনাজনিত। দুর্ঘটনাজনিত আগুন লাগার পেছনে অবহেলা কিংবা গাফিলতির
সম্পর্ক রয়েছে। বৈদ্যুতিক সংযোগের ক্ষেত্রে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করলে শর্টসার্কিটের
মাধ্যমে আগুন লাগতে পারে। অনেক সময় সিগারেট কিংবা কয়েল থেকেও আগুনের সূত্রপাত হয়। অসাবধানতাবশত
যেখানে-সেখানে সিগারেট ছুড়ে ফেললে আগুন লেগে যেতে পারে। বিশেষত নিউ সুপার মার্কেটের
মতো এলাকায় এমন অনেক পণ্য আছে, যেগুলোতে সহজেই আগুন লেগে যেতে পারে। তবে হ্যাঁ, নাশকতার
জন্য আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে। তবে নিউ সুপার মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কেন ঘটেছে
তা তদন্তকারী সংস্থাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে। এজন্য আমাদের আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া
উপায়ান্তর নেই। নিরাপদ মহানগর-নগর-শহর-জনপদ নিশ্চিত করার দায় যাদের, তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে
দায়িত্বপালনে নিষ্ঠ হলে এমন বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়ার
পথ বন্ধ হবে। নিউ সুপার মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফের অনেক সতর্কবার্তা মিলল। তা
যেন আমলে থাকে।