× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

এম হুমায়ুন কবির

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৩ ১৪:৫১ পিএম

অলঙ্করন : প্রবা

অলঙ্করন : প্রবা

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে প্রশংসা করে কংগ্রেসে প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছে। ঘটনাটি আশ্চর্যজনক কিংবা অপ্রত্যাশিত কিছুই নয়। বাংলাদেশের সাফল্য কিংবা দুই দেশের অগ্রগতির ধারা আজ সারাবিশ্বেই প্রশংসনীয়। এই সাফল্যকে চিহ্নিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও দৃঢ়ভাবে একটি পরিণয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু এখন আমাদের সামনে সম্ভাবনার হাতছানি অনেক বেশি। যদি বিগত কয়েক দশকের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে, প্রতি দশকে আমরা ১ শতাংশ গড়ে প্রবৃদ্ধি পেয়েছি। সত্তরে ৩ শতাংশ, আশিতে ৪ শতাংশ এবং নব্বই দশকে আমরা পাঁচ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। ২০০০ সালের মধ্যে আমরা ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তার পর ধারাবাহিকভাবে আমরা ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছি। অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় আমরা বরাবরই এগিয়ে আছি। সব সরকারের আমলেই এই অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের একটি বার্তাই পৌঁছে দিতে হবে। বার্তাটি হলো, আমাদের এত সাফল্যের পেছনে সাধারণ মানুষের শ্রমের প্রত্যক্ষ ও ইতিবাচক অবদান রয়েছে। সব সরকারের সময়ে সাধারণ মানুষই রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এবং এখনও আছে। হ্যা, সাফল্যের জন্য সরকার কৃতিত্ব নেয় এবং সেটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু জনগণই যে মূল চালিকাশক্তি, তা আমরা অনেক সময়ই আমলে রাখি না। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সব সরকারই প্রায় একই ধরনের অর্থনৈতিক নীতিমালা নিয়ে থাকে। আমি মনে করি, অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের প্রশংসা বহু আগে থেকেই প্রাপ্য।

হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে (এইচডিআই) বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় যথেষ্ট ভালো। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সমীক্ষায় এ তথ্য প্রতিনিয়তই পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা আমাদের দৃষ্টি এড়াবে না। মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে এক ধরনের একাত্মতা রয়েছে। যেমনÑ রাজনৈতিক দল-মত নির্বিশেষে সবাই চান রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হোক। যতদিন পর্যন্ত ওদের এই সমস্যার সমাধান না হচ্ছে, অর্থাৎ রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজ ভূমে ফিরে না যেতে পারছে ততদিন পর্যন্ত নানা বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হতেই পারে। কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলমান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার জন্যও বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কংগ্রেসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে এ বিষয়গুলোই বারবার উঠে এসেছে। শুধু কূটনৈতিক অঙ্গনই নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতেও বাংলাদেশের ভূমিকা প্রশংসা কুড়িয়েছে। জাতিসংঘের কয়েকটি পরিষদে বাংলাদেশ নানাভাবে অংশ নিচ্ছে এবং অবদান রাখছে। ১৯৮৮ সাল থেকে আমরা শান্তিরক্ষী বাহিনীতে ব্যাপকভাবে কাজ করে চলেছি এবং দীর্ঘদিন ধরে শান্তিরক্ষা মিশনে অবদানকারী দেশ হিসেবে প্রথম সারিতে অবস্থান করছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে সব সরকারই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসে এ বিষয়টিরও পুনরাবৃত্তি হয়েছে। বাস্তবতারই একটি ইতিবাচক ফলাফল হিসেবে এই প্রস্তাবকে দেখতে হবে।

এ কথা সত্য, ওই প্রস্তাবে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বাইডেন, অ্যান্টনি ব্লিংকেন থেকে শুরু করে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনরত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত সবার সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারকরণের কথা হয়েছে। পশ্চিমা উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছে। ভারত, চীন এবং ইন্দোনেশিয়ার পর বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার দেশ। শুধু জনগোষ্ঠীই নয়, আমরা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণের দিক দিয়েও বর্ধিষ্ণু রাষ্ট্র। এখানে ব্যবসার অনেক সুযোগ রয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাদেও আন্তর্জাতিক পরিসরে শান্তিরক্ষা ও মানবাধিকারবিষয়ক ইস্যুতে একজোট হয়ে কাজ করার সুযোগও আমাদের আছে। সব দিক বিবেচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে চলেছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের পেছনে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থের বিষয়টি অগ্রভাগে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এশীয় অঞ্চলে তারা সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। ভৌগোলিক অবস্থান বিচারে বাংলাদেশের গুরুত্ব না বোঝার কারণ নেই। বঙ্গোপসাগরে বিশাল সমুদ্রসীমা আছে আমাদের। তা ছাড়া ভারত মহাসাগরে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগও আছে। অর্থাৎ দুই দেশের একজোট হয়ে কাজ করার অনেক সুযোগই আছে। যদি তা সম্ভব হয়, তা হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং উত্তরোত্তর সেই সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে।

মোটা দাগে দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দেশের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে অসত্য নয়, বৈষম্যের ছায়াও রয়েছে। বৈষম্য নিরসনে আমাদের কাজ করতে হবে। আমরা যেহেতু অর্থনীতিতে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারছি, সেহেতু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের অংশগ্রহণ আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি আরও বাড়াতে সহযোগিতা করবে, এ কথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বলে আসছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার চর্চা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। কিন্তু এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সম্পর্কের মাধ্যমে আমরা দ্বিপক্ষীয় নানা সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি অর্থনীতির পরিসর বাড়াতেও সক্ষম হচ্ছি। এ সময়েই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার পথ সুগম করা সহজ বলে আমি মনে করি। মুক্তিযুদ্ধে আমরা দুটো অনুপ্রেরণা দ্বারা পরিচালিত হয়েছি। একটি ছিল গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং অন্যটি হলো বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা। কাজেই দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম বলা যায়। তবে মার্কিন কংগ্রেসে আমাদের নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করায় অতিরিক্ত আত্মতুষ্টির কোনো কারণ নেই। বরং আমাদের অভ্যন্তরীণ শক্তি জোরদার করার জন্য কাজ করে যেতে হবে। শক্তি বৃদ্ধি করতে পারলে শুধু প্রস্তাবনা পর্যন্তই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সীমাবদ্ধ থাকবে না, তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে সহযোগিতার সুযোগও বাড়তে থাকবে।

মার্কিন কংগ্রেসে যে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে তা অনুমোদন পেলে আমাদের জন্য ইতিবাচক আরও কিছু ফল আসবে। ইতোমধ্যে নানা মহলে একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা দেখা দিয়েছে। র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার পর দুই দেশের মধ্যে শান্তিরক্ষাবিষয়ক সম্পর্কের কিছুটা অবনতি হয়েছে বলে আশঙ্কা করেছিলেন অনেকে। কংগ্রেসে বাংলাদেশবিষয়ক প্রস্তাব কি তবে এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার ইঙ্গিতবাহী? আমি মনে করি, একটি ঘটনা দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা ঠিক নয়। আমি নিজে দীর্ঘদিন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি বড় লেন্সে দেখে। কাজেই একটি জায়গায় সমস্যা থাকলে পুরো সম্পর্কেই ভাটা পড়বে তা কিন্তু নয়। র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে বড় ধরনের রিলিফ এসেছে। এমনকি ওদের সঙ্গে আমরা যেন আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী যেন আমাদের সঙ্গে আরও ভালোভাবে সংযুক্ত হতে পারে এবং সম্পর্কের গভীরতা যেন বাড়ে এ জন্য অনেক আলোচনা হয়েছে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে। এই প্রস্তাবের সঙ্গে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে মিলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই এবং আমি তা ঠিক বলে মনে করি না। স্যাংশন বলতে কি বোঝায়? মার্কিন প্রশাসনের মনে হয়েছে এই বিষয়ে তারা আমাদের সঙ্গে একমত হতে পারছে না। বিষয়টি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

বৈশ্বিক পরিসরে আমরা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে আছি। রোহিঙ্গা সংকট আমাদের ওপর চেপে বসার পর থেকেই ভূ-রাজনীতির নানা সমীকরণের মুখোমুখি আমরা হয়েছি। লক্ষণীয়, ভারত ও চীন একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অবস্থান প্রায় কাছাকাছি। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জোরালোভাবে সমর্থন দিচ্ছে। এই যে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, এটা আমরা কতটা উপলব্ধি করতে পারছি সেটা বোঝা জরুরি। আগে থেকেই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটা ধারা চলমান ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ম্রিয়মাণ ওই ধারাকে শক্তিশালী করে দিয়েছে। আমরা আগে, যেভাবে কূটনীতি করতাম এখন আর সেভাবে করতে পারি না। আমাদের প্রতিনিয়ত চিন্তা পরিবর্তন করতে হয়, মানসিকভাবে পরিবর্তিত হতে হয়। কূটনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে; নতুন কিছু আনতে হবে। তখন শুধু প্রশংসা নয়, বিশ্ব রাজনীতিতে আমরাও থাকব চালকের আসনে।


  • কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা