মোহাম্মদ আলী শিকদার
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:৫৪ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
প্রকৃতিতে ঋতু পরিবর্তনের ছোয়া লেগেছে। চৈত্রের শেষে পুরোনো পাতা ঝরিয়ে গাছেরা সেজেছে নতুন পত্রপল্লবে। চলছে চৈত্রসংক্রান্তি উৎসব পালনের প্রস্তুতি। আনন্দমুখর পরিবেশে যখন সাজছে পাহাড় তখনই আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে সংঘাতে জড়াল পাহাড়ি সশস্ত্র দুই সংগঠন। ৮ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬ এপ্রিল বিকাল সাড়ে ৫টার পর থেকে ৭ এপ্রিল দুপুর ১টা পর্যন্ত পাহাড়ে দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মূলত কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মধ্যকার সংঘাতে আটজনের প্রাণহানির মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ওই প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর সদৃশ পোশাক পরিহিত আটজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পাহাড়ে বহু আগ থেকেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর চাঁদাবাজি করে এমন কিছু গোষ্ঠী রয়েছে। প্রতি মাসে তারা বিপুল অঙ্কের টাকা ওখান থেকে চাঁদাবাজির মাধ্যমে তুলে নেয়। এককালে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা এ কাজ করত বলে ব্যাপক অভিযোগ আছে। কিন্তু পার্বত্য শান্তিচুক্তির আগমুহূর্তে পক্ষে-বিপক্ষে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে ওরা। শান্তিচুক্তির বিপক্ষে অবস্থানরত গোষ্ঠীগুলো তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চাঁদাবাজির আশ্রয় নেয়। যেহেতু তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তাই আধিপত্য বিস্তারও তাদের ভাবনায় ব্যাপক গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এই সশস্ত্র গোষ্ঠী এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও তারা অতীতে হামলা চালিয়েছে। পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্তিত্ব খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ আর নেই। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তো বটেই, দেশের অখণ্ডতার জন্যেও এই গোষ্ঠী হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এদের উৎসে নজর দিয়ে শিকড় উৎপাটনে নতুন করে কর্মকৌশল নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
আঞ্চলিকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী
সংগঠন একসময় শ্রীলঙ্কা, মালেয়শিয়াসহ আরও অনেক দেশেই ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশেও এমন সশস্ত্র
গোষ্ঠীর অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশের ও দেশের বাইরে নানা
যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, এমন কথাও রয়েছে। এমনটি ধারণা করা যায়, যোগাযোগ তৈরি হয়েছে বলেই
অস্ত্র চোরাকারবারের নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক বিশ্বজুড়ে
তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু অস্ত্র সংগ্রহের অর্থ তারা পায় কোথা থেকে,
এ প্রশ্ন উঠেছিল এবং এখনো উঠছে। হয়তো প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনেক পাঠকেরই স্মরণে আছে,
এর আগেও এই কলামেই লিখেছিলামÑ আনসারুল ইসলাম, আল শরিক লা এবং হরকাতুল জিহাদের মতো ধর্মীয়
উগ্রবাদী সংগঠনগুলো এখনও সক্রিয় রয়েছে। উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা পাহাড়ে গা ঢাকা দিয়েছে।
এরাই কেএনএফের আশ্রয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের
অর্থের জোগান দিচ্ছে আর তারা এর বিনিময়ে তাদের দিচ্ছে প্রশিক্ষণ। সংবাদমাধ্যমে এরকম
খবর আমরা আগেও দেখেছি।
দেশে যে জঙ্গি
সংগঠনগুলো রয়েছে তাদের কারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে, তাো সচেতনদের না জানার কিছু নেই। ধর্মান্ধতা
ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বাদেও অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য
অনেকে জঙ্গি সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও লন্ডন বাদেও বিভিন্ন দেশের
উগ্রবাদী সংগঠন থেকে দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো অর্থ সংগ্রহ করেÑ এমন খবর সংবাদমাধ্যমেই
উঠে এসছে বহুবার। এমনকি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরেও উগ্রবাদী সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতার খবর
আমরা পেয়েছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাটি গহিন ও দুর্গম। যুক্তিভিত্তিক মন এক ধরনের
সম্ভাব্যতার কথাও না ভেবে পারে না। মিয়ানমার সীমান্ত থেকেও সম্ভবত এই বিচ্ছিন্নতাবাদী
গোষ্ঠীগুলোকে নানাভাবে অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। আপাতত এর পেছনে কোনো প্রমাণ নেই, তবে
এক ধরনের সন্দেহ ঠিকই মনে কাজ করে। কারণ মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্যরা
আমাদের সীমান্তেও অবস্থান করছে, এও নতুন কথা নয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনটির
নাম ‘আরসা’। এই সংগঠনের নেতা আতাউল্লাহ জুনুনি। তিনি পাকিস্তানের নাগরিক। ভুলে গেলে
চলবে না, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে যে সহিংসতার সূত্রপাত তা আরসাই শুরু করেছিল। আরসাসহ মিয়ানমারের
অন্যান্য উগ্রবাদী সংগঠন বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সরকার তাদের দমনে
আন্তরিক প্রচেষ্টা চালালেও পুরোপুরি নির্মূল করতে পারছে না। এই সংগঠনগুলো সরকারের ওপর
নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে বলেই এমন অপতৎপরতা চালাচ্ছে বলে আমি মনে করি। এই মুহূর্তে
কারা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে এবং কিভাবে তারা অপতৎপরতা চালাচ্ছে, তা দ্রুত চিহ্নিত
করা জরুরি। এর পেছনের কারণগুলোর সন্ধানে নজর দিতে হবে উৎসে এবং সময়ক্ষেপণ না করে।
পার্বত্য শান্তিচুক্তি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাফল্যের একটি অন্যতম অধ্যায়। তবে পাহাড়ে ফিরে ফিরে সহিংসতার
ঘটনায় এই প্রশ্ন ওঠে, তবে কি শান্তিচুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি? বিচ্ছিন্নতাবাদী
সংগঠনের অপতৎপরতার ভিত্তিতে পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিষয়টির তুলনা করার কোনো কারণ দেখি
না। পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা,
শিক্ষাক্ষেত্র, চিকিৎসাসহ সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলের
বিভিন্ন জায়গায় স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এমনকি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা
করা সম্ভব হয়েছে। উন্নতমানের হাসপাতাল ও ইন্টারনেট সেবা তারা পাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়,
পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এখন শুধু জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা এখন জাতীয় অর্থনীতিতেও
সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা
এর সবই তাদের দেওয়া হচ্ছে।
পার্বত্য শান্তিচুক্তির
যতগুলো ধারা আছে এর সবই প্রায় বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এখনও বড় দুটি ধারা বাস্তবায়ন করা
যায়নি। প্রথমটি ভূমিমালিকানা সংকট সম্পর্কিত বিষয়। এ জন্য জাতীয় কমিটি, আইন ও কমিশন
থাকলেও এসবের কার্যকারিতা দৃশ্যমান নয়। দ্বিতীয়টি, স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালীকরণ
বিষয়ক। পার্বত্যাঞ্চলে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন এবং
প্রশাসক নিযুক্তকরণের বিষয়টিও রয়েছে। কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলে এখনও ভোটার তালিকা সম্পূর্ণভাবে
করা সম্ভব হয়নি। আঞ্চলিক পরিষদও সেখানে শক্তিশালী নয়। যদি এই দুটি সমস্যার সমাধান করা
যায় তাহলে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা কঠিন কিছু হবে না। কারণ স্থানীয় প্রশাসন
শক্তিশালী হলে পার্বত্যাঞ্চলে বিভক্তির রেখা সংঘাত-সহিংসতার দিকে ঠেলে দিত না। বরং
এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সতর্ক অবস্থানে গা ঢাকা দিতে বাধ্য হতো। এখনও কেন পার্বত্যাঞ্চলে
স্থানীয় প্রশাসন শক্তিশালী করা সম্ভব হয়নি, এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। ১৯৯৭ সালে
শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হওয়ার পরবর্তী ৮-৯ বছর তা বাস্তবায়নের ধারা অব্যাহত থাকে। কিন্তু
পরে তা অব্যাহত রাখা যায়নি নানা কারণে। শান্তিচুক্তির পর দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল
ও অস্থিরতার কারণে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ধারা ধরে রাখা যায়নি। যদি ওই সময় সরকার
সদিচ্ছা রাখত তাহলে আজও পাহাড়ের সবুজে রক্তের দাগ লাগত না। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি দৃশ্যমান
হতো না। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং তা চলমান রাখতেই
হবে। এমনটি করা না গেলে শান্তিচুক্তির সুফল কাঙ্ক্ষিত যাত্রায় মেলার আশা করা কঠিন।
স্রোতস্বিনী নদীতে কখনও শ্যাওলা জমতে পারে না। নদীর স্রোত শ্যাওলাকে ধুয়ে-মুছে নিয়ে যায়। যখনই নদীর গতিপথে কোনো প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হয় তখন তা অনেক ক্ষেত্রে বদ্ধ জলাশয়ে রূপ নেয়। পার্বত্যাঞ্চলের শ্যাওলারূপী উগ্রবাদী সংগঠনগুলো ক্ষতি করছে নানাভাবে। এই শ্যাওলা দ্রুত নির্মূল করতে হবে। বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিরক্ষার বিষয়ে আন্তরিক। তার পরও পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে সক্রিয় রয়েছে বিপথগামীরা। পার্বত্য এলাকায় দুর্গম অনেক জায়গা থাকায় অভিযান চালানো কিছুটা কঠিন। তবে পার্বত্যাঞ্চলে নিরাপত্তা আরও জোরদার করতেই হবে। সামনে বৈসাবি উৎসব। তখন পার্বত্য জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিতে হবে বেশি। মনে রাখতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের ভূখণ্ডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি আমাদের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদও। এই অঞ্চলের শান্তি রক্ষা করার দায়িত্ব যূথবদ্ধভাবে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী, বিপথগামীদের নির্মূলের ছকও কষতে হবে দ্রুত এবং এর বাস্তবায়ন জরুরি।