ড. মইনুল হাসান
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৩ ০১:১৫ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
এদিকে এ বছরের শুরু থেকেই বিরোধী দল এবং কর্মজীবী সংগঠনগুলোর বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা রাজপথে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করে যাচ্ছেন। ফ্রান্সের জনরোষ স্তিমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং দিন দিনই তা সহিংস রূপ ধারণ করছে।
সরকারের পেনশনসংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংস্কার এমন অসন্তোষের কারণ। ২০৩০ সালে অবসর গ্রহণের বয়স ৬২ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ বছর করার সরকারের উদ্যোগের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে কর্মজীবী জনতা। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য হচ্ছে, ‘জীবন মানেই শধু কাজ নয়, জীবনকে উপভোগ করার জন্য কিছুটা সময় চাই।’ কাজ করতে করতেই যদি সমাধির নিচে আশ্রয় নিতে হয়, তা হলে জীবনের আলো, রূপ-রস, গন্ধ অধরাই রয়ে যাবে।সরকার বলছে, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। যন্ত্র মানুষের কাজকে সহজ করে দিয়েছে। রোগবালাই, মহামারি আগের মতো মানুষকে কাবু করতে পারছে না। অবসর গ্রহণের পর কর্মজীবী মানুষেরা এখন ‘অনেক দিন বেশি’ বেঁচে থাকেন। ফ্রান্সে প্রায় তিন দশকের মাথায় পুরুষের গড় আয়ু ৮০ থেকে হয়েছে ৮৫ বছর, নারীদের ৭৪ থেকে ৭৯ বছর হয়েছে। পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখার জন্য ৫ বছরের বাড়তি জীবন মোটেই কম নয়। আর সে কারণেই সবাইকে কিছুদিন বেশি কাজ করতে হবে। আর তা না হলে পেনশনের অর্থ জোগান দেওয়া সম্ভব হবে না। ফরাসি সরকার যুক্তি দিচ্ছে, কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের অনুপাত দিন দিন কমছে। যেখানে ২০০৪ সালে পেনশন ভাতা দাবিদার ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ, সেখানে ২০২০ সালে ১ কোটি ৭০ লাখ দাবিদারের দাবি মেটাতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জিডিপির ১৪ শতাংশ খরচ করতে হয় পেনশন ভাতার জন্য। আগামীতে পেনশন ভাতা প্রদানে অর্থ ঘাটতির দুর্বিপাক এড়াতে আগে থেকেই এমন সংস্কার একান্তই প্রয়োজন। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেই ২০০৩ থেকে ডান, বাম, সব সরকার এমন সংস্কারের কথা বলে এসেছে। কিন্তু তারা এমন চরম স্পর্শকাতর এবং অজনপ্রিয় বিষয়টি নিয়ে তেমন নাড়াচাড়া করার ঔদ্ধত্য দেখায়নি। অনেকটা ঝকঝকে এবং বহুমূল্য গালিচার নিচে ময়লা লুকিয়ে রেখে নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখার প্রয়াস।
মাস দেড়েক আগে সংসদে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বর্ন অবসরকালীন বয়স ৬২ থেকে ৬৪ বছর বৃদ্ধির নতুন বিল প্রস্তাব করেন। সে বিলটি সংসদে অনুমোদন করাতে হলে সরকারি অর্থাৎ ইমানুয়েল মাখোঁর দলের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, তা তার দলের নেই। বিরোধীরা এই সুযোগটি কাজে লাগাতে মোটেই কার্পণ্য করেনি। ছয় সপ্তাহ ধরে মোট ১৭৫ কার্যঘণ্টা খরচ করে উত্তপ্ত বাদানুবাদে সংসদে ঝড় তুলেছেন এবং বিলটির পক্ষের জনপ্রতিনিধিদের কোণঠাসা করতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে কর্মজীবী সংগঠনগুলো রাজপথ দখলে নিয়ে অবসরগ্রহণের বয়স ৬২ বছরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং বিক্ষোভ প্রকাশে তাদের যা কিছু করণীয়, তা করতে দ্বিধা করছে না। ফলে যেমনটি আশঙ্কা করা হয়েছিল, ঘটলও তাই। গত ১৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর দল তাদের হাতে থাকা একমাত্র এবং মোক্ষম অস্ত্র, ৪৯-৩ ধারা প্রয়োগে সাংবিধানিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে এবং সংসদে বিলটি অনুমোদন করিয়ে নেয়। আর এতেই বারুদের স্তূপে আগুন লাগে।
সংসদে বিরোধীরা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের আয়োজন করে। এই প্রস্তাবের পক্ষে মাত্র ৯টি ভোট কম হওয়ায় ক্ষমতাসীন সরকার কোনোমতে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয় অর্থাৎ এ যাত্রা রক্ষা পায়। ধারা ৪৯-৩ প্রয়োগে বিলটি পাস করানোর ব্যাপারটি ৭৮ শতাংশ ফরাসি নাগরিকের অপছন্দ। প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ‘হলুদ কুর্তা’খ্যাত প্রান্তিক জনগণের দীর্ঘমেয়াদি এবং অনেকটা সহিংস আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ওই আন্দোলন সামাল দিতে না দিতেই অতিমারি হানা দেয়। দক্ষতার সঙ্গে সে সময়কার ভয়াবহ পরিস্থিতির সামাল দেন। জনগণ তা মনে রেখেছে। তবে চরম বাম আর ডান ধারার নাগরিকরা তার পক্ষ নেয়নি।
২০২২ সালে মধ্যপন্থিদের ভোটে আবারও তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেননি। এবার এই দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই ইউরোপের দোরগোড়ায় তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। ইউক্রেনের উদ্বাস্তুদের চাপসহ দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। এ সময়ে অবসরগ্রহণের বয়স বৃদ্ধির এমন উদ্যোগ মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক অস্থিরতা, অসন্তোষের কারণ হয়েছে। আর তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আগামী দিনগুলো ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর জন্য কঠিন হবে। রাজনীতির কঠিন মঞ্চে তিনি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবেন, নাকি ৪৫ বছর বয়েসেই তিনি অবসরগ্রহণে বাধ্য হবেন—এ প্রশ্নের উত্তর আপাতত অস্পষ্ট।