ড. আদিল মুহম্মদ খান
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৩ ১৪:২৪ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
গত দুই মাসে ঢাকায়
একাধিক বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ৪ মার্চ ঢাকার বঙ্গবাজারের মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের
ঘটনায় রাজধানীতে অগ্নিনিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি আরও প্রকটভাবে স্পষ্ট হলো। বঙ্গবাজারে
আগুন প্রথমে একটি ভবনে লাগে, এরপর দ্রুতই অন্যান্য ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে প্রায় অঙ্গাঙ্গিভাবে
জড়িয়ে আছে আরও কয়েকটি মার্কেট। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর সদস্যরা
৭ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরই আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা
করছি। শুধু বাণিজ্যিক এলাকাই নয়, নগরীর বসতবাড়িও অগ্নিঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। বঙ্গবাজারে
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটিকে আকস্মিক বলা যাবে না। বলতে হবে, এটাই ভবিতব্য। কারণ ২০১৭ সাল
থেকে ফায়ার সার্ভিস এলাকাটিকে অগ্নিঝুঁকিপ্রবণ বলে চিহ্নিত করে। এরপর বারবার সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীলদের নোটিস পাঠানো হয়। বঙ্গবাজারের যে মার্কেটে এবার আগুন লাগে, সেটিকে ২০১৯
সালের ২ এপ্রিল ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। তারা এ-সংক্রান্ত
ব্যানারও টানিয়ে দেয়। সতর্কতা এবং করণীয় নির্দিষ্ট করে অসংখ্যবার নোটিসও করেছে। কিন্তু
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ঝুঁকিমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি! নোটিস পাওয়ার পরও অতিঝুঁকি কমানোর
বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি!
নগরায়ণ প্রক্রিয়ায়
আমাদের যথেষ্ট উন্নতি হচ্ছেÑ এ সত্য অনস্বীকার্য। তবে বিদ্যমান বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে
এই দৃশ্যও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, জীবনের নিরাপত্তাকে আমরা কোনোভাবেই প্রাধান্য দিচ্ছি
না। সরকারি সংস্থা থেকে সতর্কবার্তা জারির পরও অনেকেই তা আমলে নেন না। এ অবহেলায় শুধু
তাদের নিজের জীবন ও সম্পদই ঝুঁকিতে থাকে তা-ই নয়, আশপাশের মানুষের জীবনও ঝুঁকির দিকে
ঠেলে দেওয়া হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সামাজিকভাবেই আমরা মানুষের মূল্যবান জীবনকে গুরুত্ব
দিতে পারছি না। বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ডেও আমরা দেখলাম, আগুন শুধু ঝুঁকিপূর্ণ নির্ধারিত
ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের অন্য ভবনেও।
সাম্প্রতিক সময়ে
বেশ কয়েকটি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটায় আবারও সামনে এসেছে অপরিকল্পিত নগরায়ণের বিষয়টি। বঙ্গবাজারে
আগুনের সূত্রপাতের সময় সংবাদমাধ্যম বলছে, সকাল ৬টা ১০ মিনিটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে
আপ্রাণ চেষ্টা করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তাদের প্রায় ৫০টি ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত
হন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং বিজিবি সদস্যরা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রায় ৭ ঘণ্টা
পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এই যে আগুন লাগা এবং তা নিয়ন্ত্রণে আনা, এর মাঝে পেরিয়েছে
সময়ের হিসাবে দীর্ঘক্ষণ। আগুন নেভানোর কাজের সময় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের বেশকিছু প্রতিবন্ধকতার
মুখোমুখি হতে হয়েছে। একদিকে ছিল বাতাসের তোড়, অন্যদিকে অপর্যাপ্ত পানি। আগুন নেভানোর
জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়। তা ছাড়া উৎসুক মানুষের ভিড়ও
কাজের গতি শ্লথ করে দেয়। দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের রয়েছে
শতভাগ আন্তরিকতা। তবে তাদের আন্তরিকতায় ঘাটতি না থাকলেও রয়েছে সক্ষমতায় ঘাটতি। আর এ
ঘাটতিই কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। যেহেতু রাজধানীর অনেক জায়গাতেই অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ
হয়েই গেছে, সেহেতু আমাদের উচিত ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা অনেক গুণ বাড়িয়ে তা পূরণের
চেষ্টা করা। মনে রাখতে হবে, সক্ষমতা না থাকলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঝুঁকি নিয়েই
অগ্নিনির্বাপণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়িত্ব পালনকালে
ফায়ার সার্ভিসের অনেক কর্মী হতাহত হয়েছেন। অগ্নিনির্বাপণের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা যেন
নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন কিংবা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেজন্য
যথাসম্ভব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের হাতে পর্যাপ্ত
এবং আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলে এমন মর্মন্তুদ দৃশ্য হয়তো দেখতে হতো না। অধিকাংশ
দেশেই নগরের কিছু অপরিকল্পিত অংশ থাকে। সেসব অংশে আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের
কাছে বিশেষ কিছু যন্ত্র থাকে, যা দিয়ে সরু পথেও অগ্নিনির্বাপণে কাজ করা যায়। আমরা এসব
অত্যাধুনিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা এখনও করতে পারিনি। এটি আমাদের সক্ষমতার ঘাটতিই বলতে
হবে।
সারা বিশ্বেই
নগরায়ণ হচ্ছে। নগরায়ণের ফলে বাণিজ্যেরও ব্যাপক প্রসার ঘটছে। উন্নত বিশ্বেও শিল্প-বাণিজ্য
গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা দেওয়া হয় না। তবে সেখানে বরাবরই নিরাপদ নগরায়ণের কথা
বলা ও তা নিশ্চিত করা হয়। জীবনকে গুরুত্ব দিয়েই তারা অবকাঠামো নির্মাণ করেন। কিন্তু
আমাদের ব্যবসা ও প্রবৃদ্ধিকে জীবনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করার প্রবণতা রয়েছে।
যেমনটা আলোচনার শুরুতেই বলেছি, ২০১৭ সালে বঙ্গবাজার পোশাকবিপণি বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ
চিহ্নিত করে ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠানো নোটিসের কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি! ওখানে পরবর্তীতে
ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের পর ২০১৯ সালে ফায়ার সার্ভিস বারবার নোটিস পাঠালে তা-ও আমলে নেওয়া
হয়নি! নোটিস অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি হয়তো বহুলাংশে এড়ানো
যেত।
ফায়ার সার্ভিসের
পক্ষ থেকে বারবার নোটিস পাঠানোর বিষয়টি ব্যবসায়ী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে গুরুত্ব
দেননি, তা শুধু এক্ষেত্রেই নয়, এমন চিত্র অধিকাংশ অগ্নিদুর্ঘটনার বেলাই দেখা যায়। স্মরণে
আছে, হাশেম ফুড ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগার অনেকদিন আগে থেকেই ফায়ার সার্ভিস সতর্কবার্তা
জানাচ্ছিল। তা ছাড়া সীতাকুণ্ডের অক্সিজেন প্ল্যান্টে সরকারি সংস্থার সদস্যরা পরিদর্শন
করতে গিয়ে কারখানাটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতির কিছু বিষয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
তবে এও মনে রাখা দরকার, সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব শুধু অবহিত করার
মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাদের জানমালের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে বিভিন্ন সংস্থার
মাধ্যমে। ৪ এপ্রিল বঙ্গবাজারে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়, এর দায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল
কেউই এড়াতে পারেন না।
সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি
দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে ধরনের অবকাঠামোতে ঝুঁকি রয়েছে,
সেসব জায়গায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রাখা যাবে না। বিশেষত বিপণি প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত
সাধারণ মানুষের সমাগম থাকে। যেসব ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় লোকসমাগম হয়, এমন প্রতিষ্ঠান থাকলে
তা দ্রুত খালি করার ন্যূনতম দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়,
অগ্নিঝুঁকি নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনেকেই অসহযোগিতা করেন। এক্ষেত্রে পুরান ঢাকার
রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথাই ধরা যাক। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার
কারণে সরকার এ পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে স্থানীয় মানুষের জীবন রয়ে
গেছে ঝুঁকির মধ্যে। কিন্তু তাই বলে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা তো এভাবে ফেলে রাখা যায় না। সরকারের
উচিত অনতিবিলম্বে অতিঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো খালি করা। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে ওই জায়গায়
ঝুঁকি কমানোর নানা পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে এবং ঝুঁকিহ্রাসের ব্যবস্থা সহজ হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব
অনেক বিস্তৃত। একই সঙ্গে এও সত্য, সাধারণ মানুষের দায়ও কম নয়। ঝুঁকিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে
যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হয় কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা দায়িত্ব পালনে অবহেলা
করেন, তাহলে এমন দুর্ঘটনা আরও ঘটবে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত। তাই সরকার বা দায়িত্বশীল
কর্তৃপক্ষকে শুধু সতর্কীকরণ করে নোটিস পাঠালেই হবে না। এই নোটিস যেন কার্যকর করা হয়
তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক সমাজকে বাড়াতে হবে সহযোগিতার হাত। শুধু তা-ই নয়, যেকোনো
ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে বিদ্যমান আইন অনুসারে। আইন মেনে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে
এবং মানুষের জীবনকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে
অগ্নিনিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্যই জরুরি
এমনটি নয়। আশপাশের কোনো ভবন বা ব্যক্তি যেন ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি না হয়, তা নিশ্চিত
করার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। এসব বহুবারই আলোচনা করেছি।
আগুন নেভানোর জন্য প্রতিটি ভবনের ভেতরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা জরুরি। ভেতরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলে প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কিন্তু এমন ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপক দল পৌঁছানোর আগেই আগুন দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনগুলোয় অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না থাকায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের পক্ষেও কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশের আইনে ভবনের ভেতর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী রাখার কথা বলা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণের প্রাথমিক সরঞ্জামগুলো যেন প্রতিটি ভবনেই রাখা হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাহলে আক্রান্ত কিংবা উপস্থিতরা অসহায়ের মতো পাশে থেকে দেখবেন না। ফায়ার সার্ভিসকে অভ্যন্তরীণভাবে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতেই হবে। অগ্নিদুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ সামনে রেখে অসহায় হয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। বরং এক জায়গার ঘাটতি মেটাতে অন্য জায়গার সক্ষমতা বাড়িয়ে সমন্বয় করতে হবে। যদি তা করা না যায়, তাহলে অগ্নিকুণ্ডলীর পাকে আটকে থাকবে নগরজীবন। একই সঙ্গে প্রতিটি দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুসারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।