পরিপার্শ্ব
সুমন উদ্দিন
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৩ ১৪:১১ পিএম
অলঙ্করন : প্রবা
বানিয়াচং, হবিগঞ্জ
জেলার সমৃদ্ধ একটি উপজেলা। নানা কারণে বানিয়াচংয়ের খ্যাতি। বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম শিকাগো।
শহরে রূপান্তর হওয়ায় বর্তমানে বৃহত্তম গ্রামের শিরোপা বানিয়াচংয়ের। প্রাচীন অনেক স্থাপনার
নিদর্শন রয়েছে এখানে, যা দর্শনীয় স্থনের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এ তালিকায় বানিয়াচংয়ের
সাগরদীঘি বা কমলারানীর দীঘি অন্যতম। দীঘিটির দূরত্ব হবিগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ১২
কিলোমিটার। যাতায়াতে সময় লাগে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট। ৬৬ একরের এ দীঘি দেখতে দেশের নানা
জায়গা থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন। আয়তনের দিক থেকে দীঘিটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাধার
হিসেবেও স্বীকৃত।
জানা যায়, দ্বাদশ
শতাব্দীতে রাজা পদ্মনাভ প্রজাদের পানি সমস্যা নিরসনের জন্য গ্রামের মধ্যভাগে এ দীঘিটি
খনন করেন। এ দীঘি খননের পর তাতে পানি পাওয়া যায়নি। রাজা দুশ্চিন্তায় পড়েন। প্রজাদের
পানীয় জলের কষ্ট লাঘবের জন্য দীঘি খনন করে জল না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তিনি অসহায়বোধ
করেন। এ সময় এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্নে তাকে আদেশ করা হয় স্ত্রী কলাবতীকে
বিসর্জনের জন্য। প্রচলিত আছেÑ প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট লাঘবের জন্য রাজা পদ্মনাভ স্বপ্নাদিষ্ট
হয়ে স্ত্রী কমলাবতী আত্মবিসর্জন দেন। প্রচলিত এই কাহিনীকে ধারণ করেই স্থানীয় পর্যায়ে
গড়ে উঠেছে অনেক কাহিনী। প্রচলিত উপাখ্যানকে ধারণ করেই এ দীঘিকে কমলারানীর দীঘি বলা
হয়ে থাকে। এ দীঘির কাহিনীর নিয়ে নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে। কমলাবতী দীঘির পাড়ে বসে পল্লীকবি
জসীমউদদীন ‘রানী কমলাবতীর দীঘি’ নামে একটি কবিতা রচনা করেছিলেন। সে কবিতাটি তার ‘সূচয়নী’
কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ দীঘিটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বলে খ্যাতি রয়েছে।
১৯৮৬ সালে দীঘিটি পুনঃখনন করান তৎকালীন মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রী সিরাজুল হোসেন খান।
বর্তমানে ৬৬ একর জায়গা নিয়ে দীঘিটি বিস্তৃত। এর মধ্যে জলসীমা রয়েছে ৪০ একর। দীঘির চারপাড়ে
গড়ে উঠেছে চারটি গ্রাম। দীঘির পূর্ব পাড়ে পূর্বপাড় গ্রাম। পশ্চিম পাড়ে সবুজ মাঠ ও এলআর
সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং ‘লাউড় রাজ্যে’। রয়েছে সে সময়ের বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ,
পুরাকীর্তি পাথরের দাড়া-গুটি। উত্তর পাড়ে উত্তরপাড় গ্রাম ও মাদারিঢোলা এবং দক্ষিণে
দক্ষিণপাড় গ্রাম। স্থানীয়দের অভিমতÑ দীঘিটির চার পাড়ে দিনাজপুরের রামসাগরের আদলে পার্ক
তৈরি করা হলে দীঘিটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। বানিয়াচংয়ে দৃশ্যমান হবে পর্যটনশিল্পও।
১৯৯৭ সালের ১৯
সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় এলআর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায়
বানিয়াচংয়ের এই সাগরদীঘিকে পর্যটন কেন্দ্র করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে
কমলারানীর দীঘিকে পর্যটন কেন্দ্র করার দাবি ছিল বানিয়াচংবাসীর। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর
ঘোষণার দীর্ঘ ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি ঘোষণা বাস্তবে রূপ পায়নি। দীঘিটি নিয়ে সরকারে
সঙ্গে সাগরদীঘির চারপাড়ের অধিবাসীদের মামলা থাকার কারণে সরকার পর্যটন স্থান হিসেবে
কাজ শুরু করতে পারেনি। দীঘিটি নিয়ে মামলার সুরাহার পর, দীঘিটিকে দর্শনীয় স্থানে রূপ
দিতে আর কোনো বাধা থাকবে না।