বিপ্লব কুমার পাল
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৩ ১৩:১৬ পিএম
অলঙ্করন : প্রবা
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে
আওয়ামী লীগের ইশতেহারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন,
বর্তমান মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল, এর বেশিরভাগই
বাস্তবায়ন হয়েছে বা শেষের দিকে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। নির্বাচনী
ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-নীতি গ্রহণ, জাতীয় সংসদকে কার্যকর করা এবং
সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূলের অঙ্গীকার করেছিল আওয়ামী লীগ। আরও ছিল, মেগা
প্রকল্পগুলোর দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করার পাশাপাশি
সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার
নিশ্চয়তা, দক্ষ ও সেবামুখী জনপ্রশাসন, জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ব্লু-ইকোনমি-সমুদ্রসম্পদ
উন্নয়ন, নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা দিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। এর বেশিরভাগই বাস্তবায়িত
হয়েছে। এরপরও করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সংকটের ছায়া
মাড়িয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে।
ক্ষুদ্র জাতিসত্তা,
ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অনুন্নত সম্প্রদায়ের জন্য আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
কতটা বাস্তবায়ন করেছেÑ এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ২০১৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শাসকদলটি। এরই মধ্যে
বেশিরভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। যেমনÑ তিন পার্বত্য জেলার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন
রাখা; সংখ্যালঘ্য জাতিসত্তা জমি, জলাধার ও বন এলাকায় অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
গ্রহণ; সংখ্যালঘু জাতিসত্তা, দলিত ও চা-বাগান শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরির
ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা; সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও অন্য সম্প্রদায়ের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি
ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ করা। যদিও এমন প্রতিশ্রুতি ২০১৪ ও ২০০৮ সালেও ব্যক্ত
করেছিল আওয়ামী লীগ। তবে ২০১৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য কয়েকটি
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এরমধ্যে অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল জাতীয়
সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করে সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা। প্রতিশ্রুতি ছিল
অর্পিত সম্পত্তি সংশোধনী আইন দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকৃত স্বত্বাধিকারীদের
অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন এবং সমতলের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক
গোষ্ঠীর জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন। এসব দাবি অনেকদিন ধরেই জানিয়ে আসছেন বাংলাদেশের
ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা।
বর্তমান সরকারের
শেষ সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য করা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশ
হয়ে পড়ছেন অনেকে। এসব দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জুন মাস পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সম্প্রতি রাজধানীর শাহবাগে এক সমাবেশে
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫১ বছর পর ধর্মীয় ও জাতিগত
সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায় হতাশ হয়ে পড়েছে। তাদের জায়গা–জমি দখল, বিগ্রহ ভাঙচুর, দেবোত্তর
সম্পত্তি দখল হয়ে যাচ্ছে। অথচ সরকারি দল গত নির্বাচনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে
চার বছরেও কোনো উদ্যোগ নেয়নি’। জুনের মাঝামাঝি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে জুলাই মাসের মাঝামাঝির
পর সারা দেশে আমরণ অনশন ও বিভাগীয় সমাবেশ করবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের
জন্য আলাদা কমিশন ভারত ও পাকিস্তানেও আছে। ভারতে ১৯৯২ সালে ন্যাশনাল কমিশন ফর মাইনরিটিস
(এনসিএম) গঠন করা হয়। এই কমিশন সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে। সংবিধানে
প্রদত্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকার কর্তৃক সংখ্যালঘুদের
স্বার্থ রক্ষার জন্য কার্যকর সুপারিশ করে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যেকোনো বৈষম্যের কারণে
তৈরি হওয়া সমস্যা নিয়ে গবেষণা করে এই কমিশন। এ ছাড়া সংখ্যালঘুদের আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষাগত
উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে অধ্যয়ন, গবেষণা ও বিশ্লেষণ পরিচালনা করে। এ ছাড়া ভারতে রয়েছে
সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও। পাকিস্তানেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংরক্ষণের জন্য আলাদা
কমিশন আছে। যদিও পাকিস্তান সরকার তা নিজ উদ্যোগে করেনি। ২০১৪ সালে পেশোয়ার গির্জায়
বোমা হামলার মামলার পর পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট সংখ্যালঘুদের জন্য একটি জাতীয় কাউন্সিল
গঠন করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অনেক টালবাহানার পর ২০২০ সালে গঠন করা হয় পাকিস্তান
ন্যাশনাল কমিশন ফর মাইনরিটিজ। তিন বছর মেয়াদের এই কমিশনে চেয়ারম্যানসহ ছয়জন সরকারি
এবং ১২ জন বেসরকারি সদস্য রয়েছেন। তবে এই কমিশনের খুব বেশি ক্ষমতা নেই, কারণ এটি ধর্মবিষয়ক
মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এ ছাড়া সংখ্যালঘু কমিশনে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণি থেকে দুজনকে সদস্য
করায় সমালোচনাও হয়েছে।
দেশে অপরাধমূলক
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এজাহার হয়, চার্জশিট হয়, আসামি গ্রেপ্তারও হয়। তবে অভিযুক্তদের
দৃষ্টান্তমূলক সাজার নজির অনেক ক্ষেত্রেই প্রীতিকর নয়। এজন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার
জন্য বিশেষ আইনের দাবিও উঠেছিল। সরকারি দল তা মেনেও নিয়েছে। এ ছাড়া বৈষম্য বিলোপ আইনের
জন্য উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগে সংসদে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন মাত্র
দুজন। এখন সংসদে সদস্য ২৩ জন। বিগত সরকারের সময়ে শুধু নামের কারণে অনেক যোগ্য ব্যক্তিকেও
চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়নি, নিয়োগ হলেও পদোন্নতি হয়নি—এমন অভিযোগ আছে। জনসংখ্যার আনুপাতিক
হারে অংশীদারত্ব ও প্রতিনিধিত্ব ১৪ বছরে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। আগের চেয়ে
প্রশাসনে সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য কেউ ছিলেন না,
এখন হচ্ছেন। বর্তমান সরকারের সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রধান বিচারপতিও হয়েছেন।
আমাদের দেশে কীভাবে গঠন করা হবে সংখ্যালঘু কমিশন কিংবা তার ক্ষমতাই বা কী হবে—এ নিয়ে কথা উঠেছে। পাকিস্তানের মতো নখদন্তহীন সংখ্যালঘু কমিশন নাকি ভারতের মতো। সংখ্যালঘু কমিশনের ক্ষমতা-কর্মপরিধি ইত্যাদি বিষয়ে একটি রূপরেখা তুলে ধরা দরকার। এই কাজটি করতে পারে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ যেকোনো সংগঠন। পাশাপাশি তৈরি করতে হবে জনমতও। যারা সাম্য চান, সম্প্রীতি চান, তাদের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। সরকারের অঙ্গীকারগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং সেগুলো বাস্তবায়িত না হলে জনগণের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, এ বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়াই হিতৈষীদের কর্তব্য।