ঞ্যোহ্লা মং
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৩ ১৩:৩০ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
কেরাণীহাট থেকে বান্দরবান পর্যন্ত রাস্তাটি অনেক সুন্দর ও প্রশস্ত । বান্দরবান জেলা শহরও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। শহরজুড়ে অনেক হোটেল এমনকি উপজেলা পর্যায়েও ভালো মানের রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। বান্দরবানে পর্যটকের চাপ দিন দিন বাড়বে তা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। বেসরকারি পর্যায়ে প্রত্যন্ত এলাকায়ও নতুন নতুন রিসোর্ট তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। অন্যদিকে সরকারিভাবে পাহাড়ে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলোকে নানাভাবে সাজানোর নামে যত্রতত্র নির্মাণ বেড়েই চলেছে। পর্যটন স্পটগুলোয় চোখে লাগার মতো অনেক নামফলক উন্মোচনের চিহ্ন পাওয়া যাবে। পরিত্যক্ত স্থাপনা থাকার পরও সেগুলো কাজে না লাগিয়ে নতুন নতুন স্থাপনা হচ্ছে। স্থাপনাগুলো খুব প্রয়োজনীয় এবং পর্যটক বা অতিথিবান্ধব হয়েছে তা বলা যাবে না। সরকারিভাবে নির্মিত রিসোর্ট/কটেজগুলো লিজ দেওয়ার ফলে পরিবেশবৈরী অব্যবস্থাপনার চিত্র দৃশ্যমান। নীলাচল একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হলেও বর্তমানে চারদিকে প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি। প্লাস্টিক বর্জ্যগুলো একসময় পাহাড়ের নিচের দিকে বসবাসকারীদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। শুধু তাই নয় এই পরিস্থিতি পাহাড়ে পর্যটকদের জন্য ক্রমে বৈরী পরিবেশ প্রকট করে তুলবে। এর বিরূপ ফল হবে বহুমুখী। অর্থনীতির জন্যও তা হবে বড় ক্ষতির কারণ।
ইতোমধ্যে খাগড়াছড়ির
আলুটিলা পাহাড়ের নিচে বসবাসকারীদের পানীয় জলের উৎসগুলো নষ্ট হয়েছে। পর্যটকের পাশাপাশি
খাগড়াছড়ি সদর ও মাটিরাঙা উপজেলার বর্জ্য অপসারণের নামে পাহাড়ের প্রাকৃতিক খাদগুলোয়
ফেলার চেষ্টা চলছে। বর্ষাকালে এ বর্জ্য নিচের ছড়াগুলো দূষিত করছে। প্লাস্টিক আর পলিথিনে
এলাকা ছেয়ে যাচ্ছে। পর্যটন এলাকায় বসবাসকারীদের পরিকল্পনার বাইরে রেখে আমরা উন্নয়ন
নিয়ে কথা বলি, স্থাপনা তৈরি করি। ফলে তারা আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে উচ্ছেদ
হচ্ছেন কি না ভেবে দেখা দরকার। লিজ নেওয়া কটেজের সামনে-পেছনে ব্যবহৃত প্লাস্টিক বস্তুর
স্তুপ যেকোনো পরিবেশকর্মীকে আহত করবে। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ যথাযথ সংরক্ষণের লক্ষ্যে
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত নীলাচলের জন্য একটি
মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিজেদের মতো করে সাজাতে চাইবেন। আকর্ষণীয়
স্থানগুলোয় নিজেদের স্মৃতি ধরে রাখতে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় নানান স্থাপনা হতে থাকলে,
পাহাড় আর পাহাড় না থেকে ভারসাম্য হারিয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করবে। মেঘলা পর্যটনকেন্দ্রের
পাহাড়টি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। পর্যটকদের জন্য জায়গাটিতে সতর্কতা জারি করা
হয়েছে। মেঘলা কেন্দ্রটিও স্থাপনা আর নামফলক দিয়ে ভরে উঠেছে। সেখানে একটি মিনি চিড়িয়াখানা
থাকলেও যত্নের প্রমাণ মেলে না। তা ছাড়া প্রাণীর নিরাপত্তা ও বসবাসের স্থান করে তোলার
পরিবর্তে উচ্চৈঃস্বরে মাইক, সাউন্ডবক্স বাজানোর ফলে প্রাণীদের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক সৃষ্টি
হচ্ছে।
শহরের বর্জ্য
ফেলে উন্নয়নফলকের চারপাশে জমা করার দৃশ্য দেখেছি বেশ কিছু জায়গায়। অনেক ক্ষেত্রে স্থাপনার
গুরুত্বের তুলনায় নামফলকের নান্দনিকতা আনতে অধিক জায়গা, বাড়তি ব্যয় বহনের দৃশ্যও চোখে
পড়ে। এ ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনকেন্দ্রগুলো ভবিষ্যতে নামফলকে
ভরে গিয়ে ‘নামফলক প্রদর্শনী’ কেন্দ্রে পরিণত হবে। ঢাকার চিড়িয়াখানায় কিংবা বোটানিক্যাল
গার্ডেনে গেলে কি এত ফলক আমরা দেখতে পাই? পাহাড়ে খালি প্রান্তর। ক্ষমতাশালী, প্রভাবশালীরা
নানাভাবে নিজেদের সেরা সময়ের সাক্ষী হিসেবে কিছু স্মৃতিচিহ্ন রেখে যেতে চাইছেন। এটি
মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু এখন যে মানের ফলক তৈরি করা হয়, তা ব্যক্তির জীবদ্দশায়
মুচে যেতে, নষ্ট হয়ে যেতে দেখা যায়। আগেকার দিনের রাজা-বাদশাহ কিংবা তারও আগে গুহাবাসীরা
এমন কিছু প্রযুক্তি, কৌশল অবলম্বন করেছেন যা আমরা আজও দেখতে পাই। সম্রাট অশোকের স্তম্ভগুলো
আজও বর্তমান। এখন আর সেই বাস্তবতা হয়তো নেই, যিনি দায়িত্বে আসেন তার মতোই সাজাতে থাকেন।
পাহাড়ে বিভিন্ন জনপদ পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। পর্যটকদের বিশেষ
আকর্ষণের জায়গা পার্বত্য চট্টগ্রাম। বান্দরবান এরমধ্যে অন্যতম। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়িও
সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড়ে যারা ভালো
কাজ করে গেছেন, তাদের সবাইকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। পাশাপাশি যারা তাদের অবস্থানকালীন
স্মৃতিগুলো বই আকারে প্রকাশ করে গেছেন, তারা এখনও বেঁচে রয়েছেন। তাদের বই হয়ে উঠেছে
এক একটি মূল্যবান তথ্যের উৎস। পাহাড়ের পর্যটনকেন্দ্রগুলো শুধু স্থাপনা আর নামফলক দিয়ে
না সাজিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীবান্ধব পর্যটন পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে সবাই উপকৃত হবে। পর্যটনকেন্দ্র
ঘিরে সৃষ্ট বর্জ্যর সঠিক ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবক পরিবেশকর্মী নিয়োগ করা
যেতে পারে। স্বেচ্ছাসেবকরা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্ল্যাকার্ড নিয়ে কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াবেন
বা হ্যান্ডমাইক দিয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করবেন। স্থানীয় শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ
দিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবক তালিকা করার চিন্তা করা যেতে পারে।
সদ্যসাবেক খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক পর্যটনকেন্দ্রের আয়ের কিছু অংশ স্থানীয় পাহাড়ীদের দিয়ে একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এমন পদক্ষেপ সব কেন্দ্রের জন্য একটি অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ থাকতে হবে। উচ্চৈঃস্বরে মাইক, সাউন্ডবক্স বাজানো, স্পটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে গানবাজনার আয়োজন থেকে বিরত থাকা জরুরি। যেখানে সেখানে নামফলক দিয়ে সাজিয়ে তোলা, বর্জ্যের স্তূপ করে পরিবেশ নোংরা-দূষণ করার অনুষ্ঠান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যটকরা পাহাড়ে গিয়ে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন কিন্তু অনেকেই পরিবেশের সুরক্ষায় দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন না। অবশ্যই পরিবেশবান্ধব আচরণের পরিচয় দিতে হবে। তাদের সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে হবে তাদেরই।সচেতনতা জনসমাজের বিকাশ-সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অনেক দেশ শুরু পর্যটন খাতের মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। আমাদেরও এমন সুযোগ কম নয়। কিন্তু আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই ঘাটতি আছে সদিচ্ছা কিংবা যথাযথ ব্যবস্থাপনার। বান্দরবানসহ পাহাড়ের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সুরক্ষার দায় সচেতন সবার।