× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সরকারের দায়িত্বশীলদের স্বচ্ছতার অভাব সুশাসনের অন্তরায়

মোফাজ্জল করিম

প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৩ ১৪:০০ পিএম

অলঙ্করন : প্রবা

অলঙ্করন : প্রবা

লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময় নানা ছলছুতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের হিড়িক বেড়েছে। অথচ সরকারের তরফে ব্যয় সংকোচনের তাগিদ দেওয়া হলেও কার্যত কোনো পরিবর্তন মিলছে না। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর একটি প্রতিবেদন বলছে, অবসরে যাওয়ার খুব বেশিদিন নেই এমন সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য আর মনোনীত করা হবে না। অতীতে এমন ঘটনা ঘটলেও সামনে এমন ঘটনা না ঘটার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। নানা ছলছুতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা অতীতেও ছিল; কিন্তু সাম্প্রতিককালে তা বাংলাদেশে বেড়েছে।

সরকারি চাকরিতে বেতন-ভাতা নির্ধারিত থাকে। যদি কেউ সৎভাবে সরকারি দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তার অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ নেই। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের বিষয়টি আলাদা। কিন্তু যারা সৎভাবে উপার্জন করেন এবং নির্ধারিত বেতনের বাইরে অর্থ নেন না, তারা অনেক সময় বিদেশ ভ্রমণের ফাঁকফোকর খোঁজেন। কেননা, এতে তাদের হাতে সৎভাবেই বাড়তি কিছু টাকা আসে। এর সঙ্গে বিদেশ ঘোরার সুযোগটিও বাদ দেওয়ার নয়। যারা নির্ধারিত বেতনেই সরকারি দায়িত্ব পালন করেন, তারা বিদেশ সফরকে ‘উপরি আয়ের’ সুযোগ হিসেবে দেখেন। অবশ্য উপরি আয় শব্দটিকে প্রচলিত অর্থে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই, বোঝানোর স্বার্থেই এমন শব্দ ব্যবহার করা।

করোনার পর বৈশ্বিক মন্দায় সরকারের তরফে ব্যয় সংকোচনের ঘোষণা এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রায় টানাটানির ফলে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। যথেষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা তহবিলে না থাকায় আইএমএফের কাছ থেকে ঋণও নিতে হয়েছে আমাদের। সংকট এড়াতে সরকারি ব্যয় সংকোচনে সরকারের কড়া ভাষায় দিকনির্দেশনা থাকলেও অর্থ অপচয়ের চেষ্টা থামেনি। কয়েক মাস আগেও সরকারি কর্মকর্তারা নানা ছলছুতায় বিদেশ ভ্রমণের তদবির চালিয়েছিলেন। তখন সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা প্রতিবেদন হয়। খিচুড়ি রান্না শেখা, পুকুর খননের জন্য প্রশিক্ষণ, লিফট কেনার জন্য বিদেশ যাওয়ার মতো বিষয়ের প্রস্তাব সংবাদমাধ্যমে উঠে আসায় ব্যাপক সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এর সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে পাটবীজ উৎপাদন শিখতে ভারতে যাওয়ার একটি প্রস্তাব।

এ রকম প্রকল্পের খবর সরকারকে যেমন বিব্রত করে, তেমনি জনমনেও প্রশ্নের জন্ম দেয়। সাধারণের মনে করা স্বাভাবিক, তাহলে কি এসব প্রকল্পে সরকারের সায় রয়েছে? বিষয়টি মনে আসা অস্বাভাবিক না। কারণ সরকারের সম্মতি না থাকলে তো আর কেউ দেশের বাইরে যেতে পারবে না।

সচরাচর বিদেশ সফর হয় কোনো একটি প্রকল্পের আওতায়। এসব প্রকল্পে অতিরিক্ত বরাদ্দ হিসেবে তথাকথিত বিদেশ সফর বা প্রশিক্ষণ যুক্ত করা হয়। আমার প্রশ্ন, এমন প্রকল্প কারা প্রণয়ন এবং অনুমোদন করেন? যেকোনো প্রকল্প-প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ আরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যায় এবং তারা তদারকি করেই অনুমোদন দেন। তা ছাড়া এর আগে কোথাও কোথাও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়ায় উদাসীনতার কারণে পর্যবেক্ষণ বা খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে গাফিলতি রয়ে যায়। ফলে হাস্যকর বিষয় সামনে রেখে বিদেশ ভ্রমণের ছক কষার খবর জানা যায়। বিদেশ ভ্রমণ বিষয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সতর্কতাই নয়, কড়াকড়িও আরোপ করতে হবে। সেই সঙ্গে নিকট অতীতে যার বা যাদের মাথায় এমন সব উদ্ভট পরিকল্পনা এসেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এগুলো খতিয়ে দেখে অপতৎপরতাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা না হলে এমন ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।

পাট আমাদের জাতীয় সম্পদ এবং পাট নিয়ে বিস্তর গবেষণাও হয়েছে। এমনকি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছেন আমাদের দেশেরই কৃষিবিজ্ঞানী। এ প্রেক্ষাপটে পাট গবেষণা কর্মকর্তাদের পাটবীজ উৎপাদন শিখতে বিদেশ সফরের যৌক্তিকতা কতটুকু? পুরো পৃথিবীতে এমন কোনো নজির নেই, যেখানে পাট মন্ত্রণালয় বলে আলাদা একটি সরকারি দপ্তর রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাট উৎপাদন হলেও পুরো পৃথিবীতে আমরাই ব্যাপকভাবে পাট উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করি। পাটের সূতিকাগারের মানুষদের কেনই-বা পাটবীজ উৎপাদনে অভিজ্ঞতা লাভের জন্য ভারতে যেতে হবে? ভারত তো আর আমাদের মতো ব্যাপকভাবে পাট উৎপাদন করে না। এখানেও এই পাটবীজ উৎপাদন প্রক্রিয়া শেখার জন্য ভ্রমণ অনুমোদন কর্তৃপক্ষের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। একনেকের কাছে সচরাচর এমন প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়, যেগুলো বড় আয়তনের। ছোট আয়তনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ই দায়িত্ব নেয়। কিন্তু বড় প্রকল্প অনুমোদন হয় একনেকেই। এমন প্রস্তাব যেখান থেকেই পাস হোক, সেই প্রকল্প প্রস্তাব আসার পর যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখে এবং যাচাই-বাছাই করে, তাহলে কিন্তু এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয় না।

প্রতিটি মন্ত্রণালয় যদি সাম্প্রতিক বছরে কারা কত টাকা ব্যয় করে কোন প্রকল্পে বিদেশ সফরে গিয়েছে তা খতিয়ে দেখে তাহলেও বিষয়টি স্পষ্ট হবে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ সফরে যুগ্ম সচিব, এমনকি উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা সফর করলেই হয়। কিন্তু দেখা যাবে সচিব মহোদয় নিজেই সফরে চলে যান। এভাবে তার অভিজ্ঞতা লাভ হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সচিব মহোদয়কে কয়েক মাস পরে অন্য একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন তার সে অভিজ্ঞতা দেশের কোনো উপকারে আসে না। দেখা যায়, তিনি হয়তো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ছিলেন, শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে সফর করেছেন, কিন্তু ক’দিন পরেই তার মন্ত্রণালয় বদল হয়। আবার দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক মাস পরেই অনেকে অবসরেও যান। এতে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো ফায়দা হয় না।

বিদেশ সফরে মূলত তাদেরই পাঠানো উচিত যারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্বপালন করবেন কিংবা সহসাই তাকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হবে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই বিদেশ সফরে প্রাধান্য দিতে হবে। এজন্যই ভালো সমীক্ষা প্রয়োজন। সমীক্ষার মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের হয়ে আসবে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সরকার পদক্ষেপ নিতে পারবেন। তবে সুশাসন নিশ্চিত করতে অবশ্যই সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে জবাবদিহির ব্যাপারে।

সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের সময় ‘চেইন অব কমান্ড’-এর বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন সচিব পুরো মন্ত্রণালয়ের কর্তা। তাকেও কিন্তু চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করতে হয়। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলে সচিবের ওপরে নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। আবার মন্ত্রীও সরকারের অন্তর্ভুক্ত। নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ সজাগ থাকলে সরকারি কর্মকর্তারা সুলুকসন্ধানী হয়ে উঠতে পারতেন না। কিন্তু যথাযথ নজরদারি না থাকায় কতিপয় অসাধু ঠিকই ফাঁকফোকর বের করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এর কারণগুলো বোঝা জরুরি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী যখন সচিব কিংবা মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং তার মনে এমন ভাবনার উদয় হয় যে, জনপ্রশাসনে কর্মরতদের বিষয় নিয়ে খুব বেশি কড়াকড়ি আরোপ করবেন না; বরং তিনিও ফাঁকফোকরের সুযোগ নেবেন তখন এমন অপতৎপরতা বাড়ে। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারি আমলা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এমনটি মোটেও কাম্য নয় এবং হতে দেওয়া উচিত নয়। আমি চাকরিজীবনে সব সময় একজন চৌকস মন্ত্রীর প্রত্যাশা করেছি। আমার কাছে চৌকস মন্ত্রী তিনিই, যিনি তার দায়িত্বে সততার পরিচয় দেন এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের খুটিনাটি বিষয়ে তার আগ্রহ রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য জনপ্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও। যদি সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা না-ও থাকে, পরিশ্রমের মাধ্যমে তা আয়ত্তের চেষ্টা করতে হবে। আমরাও এভাবেই নিজ নিজ দায়িত্বপালন করেছি এবং মাঠপর্যায়ে কাজ শিখেছি।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলি, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখ আমি বিমান মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে যোগদান করি। তার আগে পর্যন্ত আমি ছিলাম মাঠ প্রশাসনে। ফলে মন্ত্রণালয়ে চাকরি তো দূরের কথা, বিমানেও চড়েছি ক্বচিৎ। তাই মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নতুন করে কাজ শিখতে হয়েছে। একইভাবে ১৯৮৩ সালে যখন আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করি, তখন পরিশ্রমী ছাত্রের মতো আমদানি-রপ্তানির বিষয়গুলো জানতে হয়েছে। নিজের কথা বলছি মূলত মন্ত্রী ও সচিবদের বার্তা দেওয়ার জন্য। তারা যদি সৎ থাকেন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে পরিশ্রম ও দক্ষতার পরিচয় দেন, তাহলে ওই মন্ত্রণালয়ে অযৌক্তিক কোনো প্রকল্প প্রস্তাব পাস হতে পারে না।

সরকারি কর্মকর্তাদের সচেতনতার বিকল্প নেই। অনেকে সুশাসনের অভাবকে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করেন। কিন্তু সুশাসন একটি বিস্তৃত শব্দ। সুশাসনের সঙ্গে ন্যায় ও আইনের শাসনের ধারণা জড়িত। জনসাধারণ যদি ন্যায়বিচার পায় এবং প্রচলিত আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তবেই তা হবে সুশাসন। কিন্তু একে যদি খেয়ালখুশিমতো ব্যবহার করি তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরতদের সচেতনতা ও সততার জায়গা নিশ্চিত করা জরুরি। যেখানে দুর্নীতি থাকবে সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আইনের শাসন, ইনসাফই সুশাসন। সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বিবেক পরিষ্কার রেখে কাজ করতে হবে। অন্যায় সুবিধা নেওয়া বা আইনি ব্যত্যয় না ঘটিয়ে সততার সঙ্গে, নিজের বিবেকের স্বচ্ছতার প্রতি ঠিক থাকলেই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। 


  • সাবেক সচিব ও কবি
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা