মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:১৮ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
আগামীর রাজনীতি, নির্বাচন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির নিরসনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে সংলাপে বসতে হবে। রাষ্ট্রের প্রধান রাষ্ট্রপতি। তিনি সংলাপ আহ্বান করতেই পারেন। সংকট মোকাবিলায় করণীয় কি জানতে চেয়ে সব রাজনৈতিক দলকে সংলাপের টেবিলে আনতে পারেন। অবশ্য রাষ্ট্রপতির আহ্বানে অতীতেও বহু সংলাপ হয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই সংলাপে বসতে চায় না। তাদের অবস্থান থেকে প্রতিবার বলা হয়, এমন সংলাপের প্রতি তাদের আস্থা নেই। এই আস্থার সংকট দূর করে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিতে হবে। অর্থাৎ সংলাপ আহ্বান করলেই হবে না, সংলাপে প্রতিটি দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এর শীর্ষ
প্রতিবেদন থেকে সংলাপের
প্রতি অনাস্থার বিষয়টিই
ফের স্পষ্টত প্রতীয়মান
হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধান দুই বিরোধী দল সংলাপের পথে হাঁটবে কি না তা নিয়ে জনমনে
প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমনকি
সংবাদমাধ্যমে দায়িত্বশীল নেতাদের
বক্তব্যে সংলাপের ইঙ্গিত
নিবিড়ভাবে খোঁজার চেষ্টাও
চলছে। কিন্তু সংকট-সংলাপ-সমাধান এই ত্রিভুজের মিলে
যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই
ক্ষীণ বলে জানিয়েছেন
দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের
নেতারা। যেমনটা বলেছি, আস্থার সংকট
থাকায় দায়িত্বশীল নেতারাও
সংলাপের কথা বলছেন
না। আমাদের রাজনৈতিক
সংস্কৃতিই এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে রাজনৈতিক দলগুলোর
মধ্যে কোনো আস্থা
নেই। কেউ কাউকে
বিশ্বাস করতে না পারাকে সংকট
সমাধান না হওয়ার
মূল কারণ হিসেবে
ধরে নিতে হবে। আরেকটি
বিষয় হলো,
রাজনৈতিক দলের সংলাপ
আয়োজন করার ক্ষেত্রে
ক্ষমতাসীন দলকেই সদিচ্ছার
পরিচয় বেশি দিতে
হবে। আমি বলছি
না, সংলাপ আয়োজনের
পুরো দায়িত্ব ক্ষমতাসীন
দলের। কিন্তু দেশে
এখনও সুসংহত গণতান্ত্রিক
প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। প্রাতিষ্ঠানিক
গণতান্ত্রিক রাজনীতি বলতে
যা বোঝায়,
তা প্রকৃতপক্ষে আমাদের
এখানে গড়ে তোলা
সম্ভব হয়নি। যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান
গড়ে তোলা সম্ভব
হতো, তা হলে আমাদের এই সংকটের মুখে
পড়তে হতো না এমনকি সংলাপের
ক্ষীণ সম্ভাবনার খবরও
আমাদের দেখতে হতো না।
সংলাপের
প্রসঙ্গ এলেই অধিকাংশ
রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল
নেতারা বলছেন,
দলীয় সরকারের অধীনে
এমন সংলাপের কোনো
ফল মিলবে না। কিন্তু
অতীতে আমাদের দেশেই
দলীয় সরকারের অধীনে
প্রশ্নমুক্ত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের
দৃষ্টান্তও রয়েছে। বিদ্যমান
পরিস্থিতি দেখে অনেকেই
মনে করছেন,
দলীয় সরকারের অধীনে
নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব
নয়। তবে,
সম্ভব নয় এ কথা বলা যাবে না। গণতান্ত্রিক
ব্যবস্থায় সম্ভবের জন্যই
গণতান্ত্রিক নানা প্রতিষ্ঠান
গড়ে তোলা হয়। শুধু
তাই নয়,
সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন
আয়োজনের জন্যই এসব প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণ
জরুরি। আমাদের পার্শ্ববর্তী
দেশেই পৃথিবীর সবচেয়ে
বড় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান
গড়ে উঠেছে। স্মরণে
আছে, ভারতের প্রাক্তন
প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবগৌড়া
ক্ষমতায় থাকাকালে তার অধীনেই নির্বাচন
হয়েছিল এবং দেবগৌড়া
তত্ত্বাবধানকারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি
তার বন্ধুকে নির্বাচন
কমিশনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নির্বাচন
কমিশনের দায়িত্ব পাওয়ার
পরই তিনি গণতান্ত্রিক
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে
থাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণে
থাকতে পারে এমন ব্যক্তিদের সরিয়ে
ফেলেন। অর্থাৎ প্রশাসনে
দায়িত্বরত সচিব বা সরকারি কর্মকর্তাদের
স্থানান্তরের মাধ্যমে ক্ষমতা
একীভূত করে রাখার
বিষয়টি থামিয়ে দেন। এমন কাজটি ভারতের
মতো রাষ্ট্রেই সম্ভব
হয়েছে। কারণ তারা
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছে। অথচ আমাদের দেশে
এমনটি সম্ভব হয় নি। ব্রিটিশ
উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা
লাভের পর ভারত
৭৫ বছর পূর্ণ
করেছে। এই অল্প
সময়েও দেশটি গণতান্ত্রিক
প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার
ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মনোযোগ
দিতে পেরেছে বলেই
তা সম্ভব হয়েছে। আবার
এও ভুলে গেলে
চলবে না,
রাজনৈতিক সরকারের অধীনেই
পশ্চিমা রাষ্ট্রে নির্বাচন
অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু
আমাদের দেশে এমন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান
নেই, সেহেতু রাজনৈতিক
দলগুলো আস্থা রাখতে
পারছে না সরকারের
ওপর। এ জন্য
প্রতিবারই তারা বলছেন, আগে তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের অধীনে নির্বাচনের
দাবি মেনে নিতে
হবে, তারপর আমরা
সংলাপের পথে হাঁটব।
রাজনৈতিক
অস্থিতিশীল পরিবেশ শুধু
রাজনীতির মাঠে আর সীমাবদ্ধ নেই। জনমনেও
বাড়তি উদ্বেগ হিসেবে
তা ছড়িয়ে পড়ছে। হ্যাঁ, জনগণ নিয়েই
রাজনীতি। কিন্তু অস্থিতিশীলতার
ভার তো মানুষের
ওপর চাপিয়ে দেওয়া
যায় না।
আগামীতে
সুন্দর নির্বাচনী পরিবেশের
জন্য সংলাপের আয়োজন
জন-আকাঙ্ক্ষা হয়ে উঠেছে। কিন্তু
রাজনৈতিক অঙ্গনে বৈষম্য
প্রবল আকার ধারণ
করায় সংলাপে সংকটের
সমাধানের পথ আপাতত
বন্ধ। সঙ্গত কারণে
জনমনে এমন প্রশ্নও
দেখা দিয়েছে,
তবে কি গণতান্ত্রিক
রাজনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনার
পথও রুদ্ধ এবং ভবিষ্যতেও তা সুদূরপরাহত। তবে এমন ভাবনায়
উদ্বেগের কোনো কারণ
নেই। ইতিহাসের দিকে
মুখ ফেরালেও দেখব, যেকোনো রাজনৈতিক
পরিস্থিতিতেও গণতন্ত্রের বিকাশ
ঘটেছে। ফলে এমন আশা করাই
যায়, ভবিষ্যতেও গণতন্ত্রের
বিকাশ ঘটবে। কিন্তু
আমি বরাবরই বলে আসছি,
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যে কথা ছিল তা আটকে
যাবে। দেশে যারা
ক্ষমতায় রয়েছেন,
তারাও কিন্তু কোনো
না কোনো সময় আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে
তত্ত্বাবধায়ক সরকার এনেছেন। তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের মাধ্যমে তারা
ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন। আমাদের
দেশে সাধারণ মানুষের
মনেও এমন একটি
ধারণা হয়ে গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
মাধ্যমে সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন
আয়োজন করা সম্ভব। এমন ধারণার বাইরে
রাজনৈতিক দলগুলোও যেতে
পারেনি। তারাও মনে করে তত্ত্বাবধায়ক
সরকার আনতে পারলে
একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন
ও ভালো ফল অর্জন করা যাবে। কিন্তু
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব
না হলে নিরপেক্ষ
প্রশাসন পাওয়া কঠিনই
বটে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান
গড়ে তোলা যায়নি
বলেই সংলাপ এখন আমাদের একমাত্র
পথ, যার মাধ্যমে
কিছুটা হলেও আস্থা
গড়ে তোলা যাবে।
গণতান্ত্রিক
প্রতিষ্ঠান বলতে আমরা
কোনগুলোকে বুঝি?
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান
বলতে রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, সংসদীয় প্রতিষ্ঠান
কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে
বোঝায়। নির্বাচন কমিশনও
এক ধরনের সাংবিধানিক
প্রতিষ্ঠান। তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে
তারা যখন শক্তিশালী
হবে, তখন একটি
সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন
করতে পারবে। যেমনটা
ভারতের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে। ক্ষমতাসীন
সরকারের অধীনেও তারা
অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনী
পরিবেশ নিশ্চিত করে থাকে। আমাদের
ক্ষেত্রে অবশ্য এখনই
এমন কিছু প্রত্যাশা
করা যাচ্ছে না। কিন্তু
ক্ষমতাসীন ও বিরোধী
প্রত্যেকটি দলকে বুঝতে
হবে, আমাদের দেশটি
বড়। আয়তনে বড় না হলেও
জনসংখ্যার মাপে বিশাল। জনগণের
প্রত্যাশা যেন প্রতিফলিত
হয়, সে অনুসারে
নিজেদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ
করতে হবে।
আমি আগেও প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ একটি
লেখায় বলেছি এবং এখনও বলছি, দেশে স্থানীয়
প্রশাসন থেকে শুরু
করে প্রতিটি রাজনৈতিক
অঙ্গকে বিকশিত করার
চেষ্টা করতে হবে। বিশেষত
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেই শুধু
হবে না,
এসব প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার
বিকেন্দ্রীভূতকরণ নিশ্চিত করতে
হবে। আপাতত দ্বাদশ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের
আগে সংলাপের পথ উন্মুক্ত করার
বিষয়ে ভাবতে হবে। কিন্তু
দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান
গড়ে তোলার সদিচ্ছাও
রাখা জরুরি। যদি এমনটা করা সম্ভব হয়, তা হলে সংলাপে বসায়
অনীহা কিংবা রাজনৈতিক
দলে আস্থার সংকটের
কারণে রাজনৈতিক পরিবেশ
অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে
না। বরং গণতান্ত্রিক
রাজনীতির পথ সুগম
হবে।
আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকরা নানাভাবে হস্তক্ষেপ করছেন। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত তাদের হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিচ্ছে। ঘুরেফিরে এটিও কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অভাবকে নির্দেশ করে। রাজনৈতিক দলগুলো সমস্যা সমাধানের অন্য কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না বলে বিদেশিদের কাছে নিরপেক্ষ মতামতের মাধ্যমে এক ধরনের চাপ তৈরির চেষ্টা চালান। এখন পর্যন্ত যতগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, তা শক্তিশালী করা যায়নি। স্বাধীনতার পর পাঁচ দশক কেটে গেলেও কেন তা সম্ভব হয়নি, সেটা সত্যিই ভাবনার বিষয়। বিশেষত বিদেশিদের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টি অতীতে ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে শুরু হয়েছে এবং ওই সংস্কৃতি এখনও চলমান। এজন্য এই মুহূর্তে সংলাপই সমাধানের একমাত্র পথ আমাদের সামনে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপে যাওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত অনীহাই প্রকাশ করছে। এক্ষেত্রে দলগুলোর ভেতর ‘তালগাছ আমার’ কিংবা পরমতসহিষ্ণুতার অভাব অনেকটা দায়ী। যদি সরকার ও বিরোধী দল দুপক্ষই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখে, তা হলে সংলাপ ফলপ্রসূ হবে।