যতীন সরকার
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:৫০ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
অসাম্প্রদায়িকতার
কথা অনেকবার বলা হলেও নানা
ঘটনায় সাম্প্রদায়িকতার অপচ্ছায়া
দেখা যায়। বিষয়টিকে
আমি খুব অস্বাভাবিক
মনে করি না। অসাম্প্রদায়িকতার
প্রসঙ্গ যখন আসে, তখন তার বিপরীত পাশে
কিছুটা সাম্প্রদায়িকতা থাকবেই। সাম্প্রদায়িকতা
আছে বলেই অসাম্প্রদায়িকতা
শব্দটির আশ্রয় নিতে
হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা তাদের
মধ্যেই আছে,
যারা এর মাধ্যমে
অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন। সত্য
কথা বলতে,
আমাদের দেশে মানুষের
মধ্যে ওই অর্থে
সাম্প্রদায়িকতা নেই। শুধু
এ কথা বলাটা
যথেষ্ট নয় বলেই
মনে করি। আমি বরং বলব, দেশের মানুষের
মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা
আছে। আমি গ্রামে
বড় হয়েছি। সে অর্থে প্রাকৃতজনের
সঙ্গে আমার নিবিড়
সম্পর্ক। এই প্রাকৃতজনদের
খুব কাছ থেকে
দেখেছি বলেই বলতে
পারি, সাম্প্রদায়িকতা প্রকৃত
অর্থেই কোনো অপপ্রভাব
মানুষের ওপর বিস্তার
করতে পারেনি। সংখ্যালঘুদের
তাড়াতে পারলে তাদের
ফেলে যাওয়া সম্পদ
ভোগদখল করা যাবে, এ রকম অন্যায় সুবিধা
আদায়ের চিন্তা করেন
যারা, প্রকৃত অর্থে
তারাই সাম্প্রদায়িকতা চর্চা
করেন। তবে এদের
সংখ্যা অনেক কম এবং এদের
বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আমি শৈশব থেকেই
দেখে আসছি।
বিশেষত
আমাদের লৌকিক সাহিত্যের
ইতিহাস ঘাঁটলে বিষয়টি
যেমন স্পষ্টতই বোঝা
যাবে, তেমনি এখন পর্যন্ত যেসব
লৌকিক গান বা সাহিত্য রচিত
হচ্ছেÑ সেখানেও সাম্প্রদায়িকতার
বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের
প্রত্যয় ঘোষণা করা হচ্ছে। শুধু
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধবাদিতাই নয়, এখানে মুক্তচেতনার
বিকাশও ঘটছে। উদাহরণ
হিসেবে আমাদের নেত্রকোনারই
বিখ্যাত কবি জালালউদ্দিন
খাঁর নাম উল্লেখ
করা যেতে পারে। তিনি
এমন কথাও বলেছেনÑ মানুষ থুইয়া
খোদা ভজ এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে।/মানুষ ভজ কোরান খুঁজ
পাতায় পাতায় সাক্ষী
আছে। এ ধরনের
ধারণা আমি জনগণের
মধ্যে প্রত্যক্ষ করি। যেমনটা
বলেছি, মুষ্টিমেয় কিছু
স্বার্থান্বেষী অর্থনৈতিক সুযোগ
লাভের জন্য সাম্প্রদায়িকতা
লালন করেন।
স্বাধীনতার
পর পাঁচটি দশক পার হয়ে গেছে। এখনও
প্রশ্ন রয়ে গেছে, আমরা কি কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের
রূপদান করতে পেরেছি, যা কাঙ্ক্ষিত
তা সব সময় পূরণ হয় না। পূরণ
হয় না বলেই
এ আকাঙ্ক্ষা প্রতিনিয়ত
বহমান থাকে। আকাঙ্ক্ষা
বহমান থাকে বলেই
তা পূরণের চেষ্টা
আমরা প্রতিনিয়ত করে যাই। এ চেষ্টায় আমরা
সব সময় সফল হই এমন নয়। স্বাধীনতা
অর্জনের সময় আমরা
যা চেয়েছিলাম তার অনেক কিছুই
আজ হারিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুকে
সপরিবারে হত্যার পর পাকিস্তানের ভূত ফের আমাদের
ঘাড়ে চড়ে বসেছিল। এই ভূত এখনও
আমাদের নানাভাবে বিপর্যস্ত
করে। কিন্তু এই ভূত তাড়ানোর
চেষ্টা যে চলমান
নয়, সে কথা বলা যাবে
না। অবশ্য এ কথা মানতে
হবে, প্রবীণদের উচিত
ছিল তরুণদের সচেতন-উদ্বুদ্ধ করার। এ দায়িত্ব আমরা
সঠিকভাবে পালন করতে
পারিনি। আমি নিজে
নৈরাশ্যবাদী কেউ নই, তবুও এ ভাবনা আমায়
মাঝেমধ্যে অত্যন্ত তাড়িত
করে।
আমাদের
যথেষ্ট উন্নয়ন-অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু
এর সমান্তরালে বৈষম্যও
বেড়েছে। এই বৈষম্য
নিরসনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার
অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু
এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার
পূরণ করার জন্য
সংগঠিত করতে হবে তরুণ প্রজন্মকে। এ দায়িত্ব প্রবীণদের
ভেতর যারা কিছুটা
প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনা ধারণ
করেন তাদের নিতে
হবে। তবে দুঃখজনক
হলেও সত্য,
সংগঠিত করার দায়িত্ব
যাদেরÑ তারা এ দায়িত্ব পুরোপুরি
পালন করতে পারেননি। ফলে আমাদের অনেক
কিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা
মূলত সাংস্কৃতিক জাগরণ
এবং আন্দোলনের মাধ্যমে
ভাষা আন্দোলনের পর থেকে নানা
সংগ্রামের মধ্য দিয়ে
রক্তমূল্যে স্বাধীনতা অর্জন
করেছি। স্বাধীনতার পর এই সাংস্কৃতিক
আন্দোলন কিংবা জাগরণ
স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমরাই
এ সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে
সামনে এগিয়ে নেওয়ার
দায়িত্ব গ্রহণ করিনি। ফলে বৈষম্যও বেড়েছে। এই ব্যর্থতায় দুঃখ
প্রকাশ করা ছাড়া
কিছুই করার নেই। কিন্তু
আমি বিশ্বাস করি, তরুণসমাজের মধ্যে
এক ধরনের সাংস্কৃতিক
চেতনা ও জাগরণ
আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে। এই জাগরণ একদিন
উত্তাল হয়ে উঠবে। আমি এও বিশ্বাস
করি, আমাদের ভবিষ্যৎ
অবশ্যই ভালো হবে।
আমাদের
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ওপর দিক দিয়ে
হয়েছে, ভেতরে পাকিস্তানের
ভাবধারা কিন্তু নতুনভাবে
এসেছে। আজকে যে ধর্মীয় মৌলবাদ
তা এমনভাবে প্রভাব
বিস্তার করেছে,
তাতে আমাদের স্বাধীনতার
যে ৪টি মূলনীতি
ছিলÑ তা পরিহাসে
পর্যবসিত হয়েছে। ৪ মূলনীতির সঙ্গে
এখন আমাদের সম্পর্ক
কী আছে?
ধনী আরও ধনী হচ্ছে,
গরিব আরও গরিব
হচ্ছে। এসব কথা আর কত বলা যায়? এ নিয়ে
তো বেদনাবোধ করলেও
বিষয়টাকে আমি ঐতিহাসিকভাবে
তথা বস্তুতান্ত্রিকভাবে বিশ্লেষণ
করি। সেই বিশ্লেষণের
ধারায় বলিÑ
এ ধরনের ঘটনা
ঘটা অস্বাভাবিক কিছু
না। এটা ঘটতে
বাধ্য হয় নানা
কারণে। কাজেই আমি কখনও নৈরাশ্য
নিয়ে ভাবি না। আমি আশাবাদী,
নিষ্ক্রিয় আশাবাদী নই। আমি সক্রিয় আশাবাদী
এবং বিশ্বাস করিÑ মানুষই এই অব্যবস্থাটা দূর করবে এবং মানুষের হাতেই
সত্যিকার অর্থে আমরা
যা চেয়েছিলাম,
স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে
সেটি পেয়ে যাব। সাধারণ
মানুষের প্রতি বিশ্বাস
আছে। আমরা যদি পেছনের দিকে
তাকাই, তাহলে দেখতে
পাব বাংলাদেশ তৈরি
করেছে কারা?
সাধারণ মানুষ। বাকিরা
পালিয়েছে। সেই সাধারণ
মানুষের মধ্যে একটা
জাগরণ এখনও ঘটেনি। ফলে নানা জায়গায়
যেসব প্রতিবাদী সংগঠন
গড়ে উঠছে,
প্রতিবাদ হচ্ছেÑ
সেগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
অবস্থানে আছে। বিচ্ছিন্ন
অবস্থানে আছে। এগুলো
একদিন একত্রিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এক্ষেত্রে
আমাদের প্রগতিশীল সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ
করতে পারলে বিদ্যমান
সমস্যা হয়তো আমরা
ঠিক করতে পারব। কিন্তু
প্রগতিশীলতার মধ্যেও বিভিন্ন
ধারা আছে। বিভিন্ন
ধারা থাকার কারণেই
প্রগতিশীলরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছেন না। এক্ষেত্রে
সংলাপের মাধ্যমে প্রগতিশীল
শক্তিগুলো একে অপরের
ভাবনা সামনাসামনি জানতে
পারে। এই সংলাপের
মাধ্যমেই নতুন বিধিবদ্ধ
ধারা ও ভাবনা
গড়ে তোলা জরুরি। এক্ষেত্রে
আমি একটাই সমাধান
দেখতে পাই। যে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের
মধ্য দিয়ে আমরা
ভাষা আন্দোলন থেকে
শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ
করেছি, সে সাংস্কৃতিক
আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করতে
হবে। আমরা যে এই আন্দোলনের
মঞ্চ থেকে দূরে
সরে এসেছি,
সে বিষয়ে আমাদের
বোধ-বুদ্ধিকে আরও শাণিত করা জরুরি। পরিশেষে, এর মধ্য
দিয়ে এক ধরনের
সাংস্কৃতিক ও গণজাগরণ
নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্নীতির
বিরুদ্ধে সরকারের
‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র অঙ্গীকার
রয়েছে। তার পরও দুর্নীতির রাশ টানা কঠিন
হয়ে যাচ্ছে। এখানে
হতাশা ব্যক্ত করলে
কীভাবে সমস্যার সমধানে
উদ্যোগ নেওয়া হবে তা জানি
না। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত
সমাজব্যবস্থায় ক্ষমতা যে শ্রেণির হাতে
থাকে, সেই শ্রেণি
দুর্নীতিকে যে প্রশ্রয়
দেয়। এমনকি তারাও
দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত
থাকে। আবার এই শ্রেণির মধ্যে
আন্তঃশ্রেণি সম্পর্কে ভেদাভেদ
থাকে। এ জন্যই
এক দল আরেক
দলকে ক্ষমতাচ্যুত করার
স্বার্থে দুর্নীতিকে আশ্রয়
দেয়। কাজেই শ্রেণিবিভক্ত
সমাজে দুর্নীতি না থাকার বিষয়টি
প্রত্যাশা করা যায় না। আমি বারবার সাংস্কৃতিক
আন্দোলনের কথা বলি। এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের
মাধ্যমে শ্রেণিবিভক্ত সমাজের
অবসান ঘটাতে হবে। এই প্রয়াস আমাদের
নিতেই হবে।
দেশে
যেকোনো নির্বাচনেই রাজনৈতিক
পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বিশেষত
জাতীয় নির্বাচন এলেই
সংঘাত-সহিংসতা বাড়তে
শুরু করে। অনেকে
মনে করেন,
পরমতসহিষ্ণুতা না থাকায়
এমনটা ঘটছে। আমি অবশ্য এর দ্বিমত করব। বরং বলব পরমতসহিষ্ণুতা
কিছু কিছু ক্ষেত্রে
অপপ্রভাব বিস্তার করেছে। পরমতসহিষ্ণুতা
না থাকার বিষয়টি
অস্বাভাবিক কিছু না। ইতিহাসের
দিকে মুখ ফেরালেই
স্পষ্টত প্রতীয়মান হবে, পরমতসহিষ্ণুতার বিষয়টি
কখনই ছিল না। এ বিষয়টি না থাকার কারণে
ঐতিহাসিকভাবে আমরা বিপর্যস্ত
হয়েছি এবং এখনও
হচ্ছি। কাজেই এসব ঘটনা সব সময় ঘটে এবং এখনও
ঘটছে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশের জন্য করণীয় কি আছে, এমন প্রশ্ন যদি করা হয় তাহলে বলা যায়, এতক্ষণ যে আলোচনা করেছি তার আলোকেই বলা যায়, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও জাগরণই মূলত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে। এ জন্য তরুণসমাজকে উদ্বুগ্ধ করে তুলতে হবে।