ড. হোসেন জিল্লুর রহমান
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০১:১৬ এএম
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:৩৮ পিএম
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির বিষয়টিকে দুটি ছকে দেখা প্রয়োজন। প্রথম ছকটি মূলত সামগ্রিক অর্থে অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত মোটা দাগে যে অর্জনগুলো হয়েছে তা সামনে আনে। যেমন অতীতের তুলনায় বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার হার কমেছে এবং অর্থনৈতিক খাত টেকসইয়ের দিকে এগিয়েছে, নতুন নতুন খাত তৈরি হয়েছে এবং প্রতিটি খাতেই নারীর কমবেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত হচ্ছে। বিগত কয়েক দশকে কৃষি অর্থনীতিরও ব্যাপক রূপান্তর ঘটায় আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছি। এই দীর্ঘমেয়াদি ছকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন সূচকে আমাদের অর্থনীতি একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ের ছকে দেখার চেষ্টা করি, তাহলে মত বদলাতে হবে। কারণ পূর্ববর্তী দশকের আলোচনা টেনে বর্তমানকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। এ জায়গাটিতে বরাবরই আমরা গুলিয়ে ফেলি সবকিছু। বৈষম্য মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। এ বৈষম্যের ধরনটি বোঝা প্রয়োজন। আমাদের একদিকে রয়েছে কিছু উঁচুমানের দ্বীপ এবং অন্য পাশে রয়েছে নিম্নদিকের মহাসমুদ্র। যারা এ উঁচুমানের দ্বীপে অবস্থান করছে, তারা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এগিয়ে যেতে পারছে। কিন্তু যারা মহাসমুদ্রে ভাসমান, তাদের জন্য যাপিত জীবন একটা বোঝা হয়ে আছে। এ মহাসমুদ্রেই বেকারত্ব থেকে শুরু করে নানান সামাজিক সমস্যার উৎপত্তি ঘটছে। মহাসমুদ্রে ভাসমান মানুষ শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শিক্ষা খাতে তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণে সদিচ্ছা কতটা— এসব প্রশ্ন সংগত কারণেই চলে আসে। সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এমন বৈষম্য কেন জিইয়ে আছে, সে দিকটি খতিয়ে দেখা জরুরি ভবিষ্যৎ টেকসইয়ের স্বার্থে।
সম্প্রতি উঁচুমানের দ্বীপের মানুষের আরও ধনী হওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রশ্ন করা যেতে পারে, এমনটি কি ভুল কারণ উন্নত বিশ্বের অনেকেই তো অতি ধনী হচ্ছে। উত্তর হলো, এমনটি ভুল নয়, তবে ধনী হওয়ার প্রক্রিয়াগুলো আমাদের যাচাই করা জরুরি। চলছে বৈশ্বিক সংকট। অথচ সম্প্রতি অভিজাত ও অত্যন্ত দামি গাড়ি বিক্রি বেড়েছে তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ। এমনকি দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের বাড়ি কেনার খবরও সংবাদমাধ্যমে পেয়েছি। অর্থনৈতিক সুশাসনের দৃষ্টিতে প্রশ্ন করতেই হয়, যারা অতি ধনী হচ্ছে তারা কোন পন্থায় ধনী হচ্ছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন স্তরের মানুষের আয় তুলনা করলে ফারাকটা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে। এ প্রবণতা শুধু আমাদের অর্থনীতি নয়, সার্বিকভাবে দেশের জন্যও উদ্বেগের বার্তা বয়ে আনে। কারণ কঠোর পরিশ্রম কিংবা অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তারা ধনী হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয় না। নিজ পরিশ্রমে ধনী হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। মূলত অন্যায় সুবিধা, দুর্নীতি কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় সম্পদ গড়ে তুলে রাতারাতি অতি ধনী হয়ে উঠছে অনেকে। পুরো প্রক্রিয়ার জন্যই তারা নানান ধরনের আইন বা নিয়ম তৈরি করে। ভুলে গেলে চলবে না, নিয়ম ভঙ্গ করা এক বিষয় কিন্তু হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণে আইনকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করা পুরোপুরি আলাদা। সাম্প্রতিক সময়ে অতি ধনী হওয়ার প্রবণতাটি অর্থনীতির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে।
সাধারণ মানুষের আকুতি শোনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বাজারব্যবস্থা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি সেবা খাতে সেবাগ্রহীতার কণ্ঠস্বর বা অংশগ্রহণ একেবারেই অনুপস্থিত। সেবাগ্রহীতার বিড়ম্বনা দেখার যেন কেউ নেই। সেবাগ্রহীতাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দায় যাদের ওপর, তাদের সিদ্ধান্তই এখানে চূড়ান্ত। গণপরিবহনের উদাহরণ টেনে আনলেই বিষয়টি বোঝা যাবে। আমরা দেখছি, গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া এবং নিরাপত্তার অভাব নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ও উদ্বেগ দুই-ই বাড়ছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য নগর পরিবহনব্যবস্থা ও ই-টিকেটিং চালু হয়েছে। তার পরও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। কারণ গণপরিবহনেও বাস মালিক কিংবা সংশ্লিষ্টরাই হর্তাকর্তা। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও নিয়মনীতি ভঙ্গকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেজন্য যুগোপযোগী আইনও বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
এ মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা মূলত মানুষের জন্য সহায়ক নীতিমালার অভাব। দেখে মনে হয়, হাঁপিয়ে ওঠা জীবনযাপনই কয়েকটি শ্রেণির মানুষের নিয়তি। তোমাকে কষ্ট করেই টিকে থাকতে হবে– এমন ভাবনাই সবার মনে। এর বিপরীতে ভালো অবস্থানে আছেন গুটিকয় অতি ধনী, যাদের হাতে সব নিয়ন্ত্রণ। এই হাঁপিয়ে-ওঠা জীবন থাকা সত্ত্বেও আমাদের জিডিপি বাড়তে পারে। কারণ সবাই তো আর বসে নেই। অর্থনীতিতে সবার কিছু না কিছু অবদান রয়েছে। সমস্যা হলো, পরিশ্রমের গুড় খাবে মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদী। অর্থাৎ আমাদের অর্থনীতিকে লং টার্মে দেখলে উন্নয়নের ইতিবাচক দিকটি স্পস্ট হয় আর নিয়ার টার্মে দেখলে নেতিবাচক এবং প্রতিকবন্ধক অনেক বিষয় সামনে চলে আসে।
সম্প্রতি বৈশ্বিক মন্দা, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানান সংকটে জ্বরতপ্ত গোটা পৃথিবী। অবস্থা যা-ই হোক না কেন, সংকট মোকাবিলার জন্য সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক প্রক্রিয়াগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বৈশ্বিক সংকটে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে। সমস্যা হলো, রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া এবং সামাজিক প্রক্রিয়ার সুসংহত পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ জবাবদিহি নেই বিধায় এখানে ‘ক্ষমতা’ই সবকিছু। মানুষ অভিযোগ করতে পারছে না এমনকি প্রতিকার পাওয়ারও কোনো সুযোগ তাদের নেই। দিনের পর দিন প্রতিকার না পাওয়ায় মেধার অবমূল্যায়ন বাড়াও একটি বড় চিন্তার কারণ। সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মেধার মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে উদাসীনতা রয়েছে। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য অনেক উদ্যোগ-প্রকল্প-পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে কিন্তু ফল অর্জনের জায়গা দুর্বল হওয়ায় আমরা বারবার আটকে যাচ্ছি। আমি মনে করি, বাস্তবায়ন সক্ষমতার জন্য তিনটি বিষয় প্রয়োজন। তা হচ্ছে মেধা, জবাবদিহি এবং কারিগরি দক্ষতা। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ার কারণে এডিপিতে বরাবরই প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার তথ্য পাওয়া যায়। যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের জবাবদিহির আওতায় না আনলে কাজটি তো থেমেই থাকবে। আমাদের দেশের মানুষের মেধা কম এ কথা বলা যাবে না। কারণ দেশের বাইরে গিয়ে তারাই মেধার স্বাক্ষর রাখছে। নানান প্রতিবন্ধকতার পরও দেশের অভ্যন্তরে অনেকে মেধার পরিচয় দিচ্ছে। অর্থাৎ দেশের মানুষের কারিগরি দক্ষতা থাকলেও মেধার অবমূল্যায়নের কারণে যোগ্যতা অনুসারে তার অবস্থান নির্ধারিত হচ্ছে না।
আমরা এলডিসি থেকে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে এসেছি এবং শিগগিরই উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার রোডম্যাপ তৈরি করেছেন নীতিনির্ধারকরা। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থনীতির ভিত্তিটা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। এলডিসি থেকে উঠে আসার গল্পের পেছনে সস্তাশ্রমের ভূমিকাই বেশি। সস্তাশ্রমের বিনিময়ে রেমিট্যান্স, তৈরি পোশাক শিল্প খাত সচল করা গেছে। এমনকি সস্তাশ্রমের মাধ্যমে কৃষিরও সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও সস্তাশ্রমের বিষয়টিই যদি অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান মাধ্যম থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে আমাদের কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। এ মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন উৎপাদনমুখী শ্রমনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এখনও কম মজুরি দিয়ে কীভাবে তৈরি পোশাক খাত সচল রাখব তা নিয়েই ভাবিত। এমনকি সম্প্রতি রেমিট্যান্স উপার্জনকারীর সংখ্যা বাড়লেও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে, কারণ শ্রমের মূল্য বেশি নয়। দেশ থেকে সস্তাশ্রম বিনিয়োগ করতে পারবে এমন দক্ষতাসম্পন্ন মানুষকেই মানবসম্পদ হিসেবে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। তাই রেমিট্যান্স বাড়ছে না। এমনটা কেন হচ্ছে? এর সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ যথেষ্ট পরিশ্রমী এবং সুযোগ পেলে তারা লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে সময়ের প্রয়োজনের ফারাক তৈরি হওয়ায় মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার পথেও প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে।
স্বাধীনতার পর এনজিওগুলো নানাভাবে অবদান রেখেছিল। একসময় তারা সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করত এবং সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থনীতিতেও অবদান রেখেছে। বায়ান্নর পর থেকে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বেসরকারি এনজিওর ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। তবে রাষ্ট্র কীভাবে উন্নয়ন করবে কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে নানাভাবে যোগ দিতে পারবে, তা দেখিয়ে দেওয়াটাই এনজিওর সবচেয়ে বড় ভূমিকা। দেশে জনপ্রশাসন এবং জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ দূরত্ব দূর করার পথ এনজিও ভালোভাবেই দেখিয়েছে। রাষ্ট্রও তাই এগিয়ে আসছে এবং এনজিওগুলোকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতার চেষ্টা করছে। সোজা ভাষায়, অংশগ্রহণ উন্নয়ন কীভাবে হয় তার পথিকৃৎ এনজিওগুলো। তবে সময়ের পরিবর্তনে এনজিওগুলো অর্থনৈতিক মডেলে রূপান্তরিত হচ্ছে। এখন আমরা দেখব তারা কি আদৌ সেবা কিংবা সমাজকল্যাণমূলক মনোভাব ধরে রাখতে পারছে বা সজাগ থাকতে পারছে কি না। তবে অর্থনৈতিক নানান সূচকে আমাদের ভালো উন্নয়ন হয়েছে। ফলে রাষ্ট্র সবকিছু নিজেই করতে পারবে এমন একটি ভাবনা ধারণ করছে। তাই বেসরকারি নানান প্রতিষ্ঠানকে নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ করে প্রশ্নবিদ্ধ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ প্রতিবন্ধকতার মুখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাবে সেটাও অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক খাতে অনিয়ম এবং খেলাপি ঋণ আমাদের অর্থনীতির বিষফোড়া। এ পরিস্থিতি উত্তরণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সুশাসন জরুরি। জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন ও বলিষ্ঠ অর্থনীতির জন্য একটি উপায়ই রয়েছে। তা হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসন।