আব্দুল বায়েস
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৫:৫০ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
এক.
বাংলাদেশের উন্নয়নকে বলা হয় উন্নয়ন ধাঁধা বা ডেভেলপমেন্ট
প্যারাডক্স। এটা করোনা কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে এবং পরের কথা। চারদিকে
এত প্রতিকূল পরিবেশ নিয়ে এখনও অর্থনীতি অটুট সেই-বা কম কীসে! অতএব বাংলাদেশ ঠিক এই
মুহূর্তেও এক উন্নয়ন ধাঁধাÑ বিলিভ ইট অর নট। প্রসঙ্গত
মনে পড়ে গেল মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জারের কথা। তিনি স্বাধীনতার শুরুতে এবং তার
বয়স যখন পঞ্চাশ, বাংলাদেশে এসে দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ তকমা এঁটে দিয়েছিলেন। এখন প্রায়
একশোতে পা রেখে কিসিঞ্জার দেখলেন সেই দেশটি উন্নয়নের রোল মডেল। উন্নয়ন গবেষক জাস্ট ফাল্যান্ড ও জে পারকিনসনের কাছেও আমাদের উন্নয়ন এক প্রকার
ধাঁধা হিসেবে থাকবে। কেননা, পঁচাত্তর সালে প্রকাশিত এক বইতে ওই দুজন প্রক্ষেপণ করে
বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ হচ্ছে উন্নয়নের টেস্ট কেস। অর্থাৎ সন্দেহের অবকাশ নেই যে, এখানে উন্নয়ন সফল হলে অন্য
কোথাও তা ব্যর্থ হবে না। অবশ্য তাঁরা ২০০৭ সালে বাংলাদেশে এসে তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণীর
ভুল স্বীকার করে এটাও বলে গেছেন যে, টেকসই উন্নয়ন বাংলাদেশের হাতের নাগালে, যদিও
নিশ্চিত নয়।
উন্নয়নসংক্রান্ত গোলক ধাঁধায় আমরাও কিছুটা পড়িনি তা বোধহয়
হলফ করে বলা যাবে না। কেউ আশাই করতে পারিনি
যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার চারের নিচ থেকে আট শতাংশ ছুঁইছুঁই করবে; খাদ্য উৎপাদন তিনগুণ বাড়িয়ে দেশটি ‘সরব দুর্ভিক্ষ’ ঠেকাতে সক্ষম হবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ও ওর্যাল স্যালাইন বিপ্লব শিশুমৃত্যুর
হার ব্যাপক নামিয়ে আনবে; জনসংখ্যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার অর্ধেকেরও বেশি নেমে আসবে
এবং মোট প্রজনন হার ৬ থেকে ২-তে দাঁড়াবে; স্কুলে মেয়েদের অন্তর্ভুক্তির হার প্রায়
একশত ভাগ এবং ছেলেদের চেয়ে বেশি; আয়-দারিদ্র্যের প্রকোপ ৬০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে
পৌঁছাবে; ঘরে ঘরে মোবাইল সেট ইত্যাদি ইত্যাদি ইতিবাচক উন্নতি হবে। তা ছাড়া নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের মতে, বাংলাদেশের অন্যতম
অর্জন হচ্ছে কিছু কিছু আর্থসামাজিক নির্দেশকে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে
যাচ্ছে, যদিও-বা মাথাপিছু আয়ের নিরিখে দেশটি ভারতের পেছনে রয়েছে। এক সময় ভারতের গড়পড়তা প্রত্যাশিত জীবন বাংলাদেশের চেয়ে
বেশি ছিল। আর এখন বাংলাদেশের মানুষ ভারতবাসীর চেয়ে পাঁচ বছর বেশি বাঁচে। সুখবরের এখানেই শেষ নয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের কলামিস্ট
সদানন্দ ধুম ২০১০ সালের পহেলা অক্টোবর লিখেছিলেন, ‘…নিয়ারলি ফোরটি ইয়ার্স এগো, অনলি দ্য মোস্ট রেকলেস অপটিমিস্ট উড হ্যাভ বেট অন ফ্লাড
প্রোন, ওয়ার রেভেজড বাংলাদেশ ওভার রেলেটিভলি স্ট্যাবল প্রসপারাস পাকিস্তান। বাট উইদ
আ হাইয়ার গ্রোথ রেট, লোয়ার বার্থ রেট এন্ড আ মোর ইন্টারন্যাশনালি কম্পিটিটিভ ইকোনমি,
ইয়েস্টারডেজ বাস্কেট কেস মে হ্যাভ দ্য লাস্ট ল্যাফ’। (প্রায় ৪০ বছর পূর্বে,
স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধিশালী পাকিস্তানের বিপরীতে, একমাত্র সবচেয়ে বেপরোয়া বাজিকর বন্যাপ্রবণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ওপর
বাজি ধরত। কিন্তু উচ্চতর প্রবৃদ্ধি, পড়ন্ত জন্মহার এবং অধিকতর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক
অর্থনীতি নিয়ে গতকালের তলাবিহীন ঝুড়ি হয়তো শেষ হাসিটা হাসবে)।
দুই.
সব আশাব্যঞ্জক গল্পের একটা অন্ধকার দিক থাকে। বাংলাদেশের
উন্নয়নযাত্রা তেমনি এক আলো-আঁধারির খেলা হিসেবে বিবেচনা
করা বোধ করি ভুল হবে না। একদিকে উন্নয়নের ফলে দারিদ্র্য হ্রাস
পেয়েছে, অথচ অন্যদিকে ধনী-গরিব বৈষম্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে আশা ছিল কুজনেটস-এর চুইয়ে পড়া প্রভাব তত্ত্ব (ট্রিকল ডাউন ইফেক্ট
থিউরি) কাজ দেবে, কিন্তু সে আশায় যেন গুড়ে বালি। ট্রিকল ডাউন ইফেক্ট বলতে চায়Ñ প্রবৃদ্ধির
প্রারম্ভিক স্তরে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, কিন্তু পরে চুইয়ে পড়া সুফলে বৈষম্য হ্রাস পায়। সেটা খুব একটা কাজ করছে বলে মনে হয় না কিংবা ভবিষ্যতে করবে
এমন ইঙ্গিত আপাতত নেই বলে মনে হয়। আর
যদি ঘটেও থাকে তা যে খুবই দুর্বল সে কথা বলা বাহুল্য। এদিকে আবার অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধি ঘটছে ঠিকই, কিন্তু তা কাম্য স্তরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে
না; ব্যক্তি বিনিয়োগ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়।
গেল চার দশকের বেশি সময় ধরে ‘অবিশ্বাস্য’ তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধাঁধার আড়াল-আবডালে অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে কালো এক
অর্থনীতির (আন্ডার গ্রাউন্ড ইকোনমি)। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে ‘অর্থনৈতিক শয়তানের’ অভাবনীয় আবির্ভাব ঘটেছে। অন্ধকারে থাকা এই অর্থনীতি সরকারকে রাজস্ব থেকে
বঞ্চিত রাখছে, রাজনীতিকে কলুষিত করছে, বিকৃত ভোগবাদী সমাজ সৃষ্টিতে জ্বালানি
যোগাচ্ছে, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য এখন দু হাতে টাকা
কামাই করা। মোটা দাগে, এটা একটা টেকসই উন্নয়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ
করছে।
ক্ষেত্রবিশেষে এর ভেতরে অথবা পাশাপাশি অবস্থান নিয়েছে সর্বব্যাপী
চরম দুর্নীতি। যদিও এ দেশে দুর্নীতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ,
তারপরও বিগত দশকগুলোতে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে পুঁজিবাদ প্রসারণে উত্থান ঘটেছে একশ্রেণির
দাপুটে, ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজের। বলা যায়, সমাজের অভিভাবক এখন তারাই। দুর্নীতি
প্রতিবছর জিডিপির ২ শতাংশের মতো গিলে খায়। তা ছাড়া, প্রতিবছর দেশ থেকে অবৈধ পথে
পাচার হয় গড়ে ৭শ-৮শ কোটি ডলার; ২০০৬ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত নাকি ৬ হাজার কোটি ডলার
পাচার হয়েছে বলা হচ্ছে। বর্তমানের
পরিমাণ যে আরও বহুগুণ তা বলাই বাহুল্য ।
সারা অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা। এমনকি রক্ষণশীল হিসেবেও ঋণখেলাপির পরিমাণ দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা। এদের
একটা অংশ বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকরে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। শেয়ারবাজারে কারসাজি করে উত্থান
ঘটেছে একশ্রেণির ধনীরা। দিনে-দুপুরে ব্যাংক ডাকাতির কথা আপাতত না হয় থাক। তবে বলতেই হবে যে, ঋণখেলাপি, অর্থপাচারকারী কিংবা ব্যাংক ডাকাতদের
বেশিরভাগ দেশে অথবা বিদেশে দাপটে ও সুখে আছে। অবৈধ অর্থ আর সম্পদের জোরে তারা কিনে নিয়েছে রাজনৈতিক নেতা, আরও অনেক মাধ্যম
কিংবা ব্যক্তিকেও।
অথচ নিয়তির নির্মম পরিহাস এই যে, তাদের কেউ এই দশ-বিশ বছর
আগেও হিমশিম খেত সংসার চালাতে; কেউ ছিল পিয়ন, কেউ দিনমজুর। আনুক্রমিক সরকারগুলোর
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এরা হয়ে উঠেছেন মহা ক্ষমতাধর। সমাজটাকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে
তারা আজ আলোকিত, আলোচিত এমনকি মাঠে ময়দানে অভিভাবক হিসেবে অভিভূত করে অভিভাষণে। অর্থনীতির
গ্রেসামস ল’ অনুযায়ী, মন্দ টাকা ভালো টাকাকে বাজার ছাড়া
করে, তেমনি আজ এই সমাজে মন্দ লোক ভালো লোককে কোণঠাসা করে রাখছে। রাজনীতি কলুষিত
হয়েছে কালো টাকায়; এদের অস্ত্রের ভাষা কেড়ে নিয়েছে আমজনতার ভাষার অস্ত্র। মানুষ
বুঝে গেছে অর্থই সকল সুখের মূলÑ মূল্যবোধ আঁকরে থাকা দুর্বলের ধর্ম। উন্নয়নের রোল
মডেলের গায়ে এসব কলঙ্কের দাগ মানায়?
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের জন্য দেশের মানুষ কিছুটা হলেও
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে বটে, তবে এই অভিযানের ফলে সংশয়মুক্ত হতে পারছে না কেউই।
এর কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। দুর্নীতির ও কালো অর্থনীতির শেকড় অনেক গভীর প্রোথিত।
আমরা, আম-জনতা, কায়মনোবাক্যে দুর্নীতি ও কালো অর্থনীতির
বিরুদ্ধে অব্যাহত অভিযান কামনা করি। তার প্রধান
কারণ আমরা একটা ‘সাদা সমাজ’ চাই
যেখানে মেধাবী আর ভালো মানুষেরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে; অর্থ, সম্পদ ও প্রতিপত্তি
যেখানে প্রভু না হয়ে চাকর থাকবে। আমরা আলোকিত
বর্তমান অবস্থার পাশে থাকা
অমানিশার দ্রুত অবসান চাই। তা না হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। আত্মাশ্রয়ীর পথে যাত্রা
একটা জাতির আত্মদ্রোহিতা বন্ধ হোক।
‘রূপসী বাংলা’র কবি বলে খ্যাত জীবনানন্দ দাশের কবিতার কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করে শেষ করছি। তিনি লিখেছেনÑ ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,/যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;/যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেইÑ করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।/যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি/ এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিক্ষা অথবা সাধনা/ শকুন ও শেয়ালের খাদ্য তাদের হৃদয়।’