এস এম রানা
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:১৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
রাষ্ট্রের নাগরিকদের
পাঁচটি মৌলিক অধিকারের
একটি চিকিৎসা,
যা নিশ্চিত করার
দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র
এই অধিকার শতভাগ
পালন করতে পারে
না বলেই অংশীদারিত্বের
ভিত্তিতে (পিপিপি)
হলেও নিরন্তর প্রচেষ্টা
চালায়। এরপরও এই মৌলিক অধিকারের
রাষ্ট্র কতটুকু পূরণ
করছে, এই বাস্তবতা
বোঝা যায় হাসপাতাল-ক্লিনিক আর কোনো কোনো
ওষুধ কোম্পানির রমরমা
বাণিজ্যের দিকে উঁকি
দিলেই। চট্টগ্রাম মেডিকেল
কলেজ হাসপাতালকে বলা হয়,
অন্ধের যষ্টি। সরকারি
ব্যবস্থাপনায় রোগীদের এটিই
ভরসাস্থল। বিশেষায়িত চিকিৎসায়
ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রাম
পিছিয়ে। পিছিয়ে থাকা
চট্টগ্রামে চিকিৎসাসেবায় ২০১৭
সালে যুক্ত হয়েছিল
পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়িত
কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস
সেবা। আগে রোগীরা
বেসরকারি ক্লিনিকে বাধ্য
হয়ে বর্ধিত মূল্যে
ডায়ালাইসিস করাতেন।
সরকার পিপিপির
আওতায় বেসরকারি কোম্পানি
স্যানডরের সঙ্গে চুক্তি
করে ৪২০ টাকায়
ডায়ালাইসিস সুবিধা দেওয়া
শুরু করে। তাতে
স্বস্তি পান দরিদ্র
রোগীরা। পরে প্রায়
১০০ শতাংশ ব্যয়
বৃদ্ধির কারণে তারা
বিপাকে পড়েন। রোগী-স্বজনরা আন্দোলনে
নামেন। সেই আন্দোলনের
সুফলও আপাতত মিলেছে। স্বাস্থ্য
মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশনায়
পুরোনো নিয়ম সচল রাখা হয়েছে। আন্দোলনে
সক্রিয় ছিলেন মোহাম্মদ
মোস্তাকিম। তার মা কিডনি রোগাক্রান্ত। বাবাহীন
সংসারে মোস্তাকিমই অন্ধের
যষ্টি। টিউশনির টাকায়
মায়ের চিকিৎসাব্যয় নির্বাহ
করা যুবক মোস্তাকিম
একটি টিউশনি হারিয়েছে
সময়মতো যেতে না পারায়। শতভাগ
ব্যয় বৃদ্ধি মানতে
না পেরে রোগী-স্বজনদের সঙ্গে
সমর্থহীন মোস্তাকিমও মৌলিক
অধিকার আদায়ের দাবিতে
আন্দোলনে নামেন। আমাদের
সামনে দৃষ্টান্ত আছে, পৃথিবীজুড়ে এমন হাজারো মোস্তাকিমের
রক্তের বিনিময়ে এগিয়েছে
মৌলিক অধিকার আদায়ের
আন্দোলনগুলো। ওই আন্দোলনে
গিয়ে মোস্তাকিমকে সহ্য
করতে হয়েছে পুলিশি
নির্যাতন। ১০ জানুয়ারি
আন্দোলনের সময় পাঁচলাইশ
থানার অফিসার ইনচার্জ
মোবাইল ফোনে ভিডিও
ধারণ করছিলেন। একপর্যায়ে
অফিসার ইনচার্জের হাতে
ধাক্কা লাগে। তাতে
মোবাইল ফোনসেট মাটিতে
পড়ে যায়। তাৎক্ষণিক
অফিসার ইনচার্জসহ অন্য
পুলিশ সদস্যরা হুমড়ি
খেয়ে পড়েন মোস্তাকিমের
ওপর। বেধড়ক পিটুনি
দিয়ে থানাহাজতে নেওয়া
হয় তাকে। পুলিশের
কাজে বাধা দেওয়ার
অভিযোগে মামলা হয়।
পুলিশের কাজে বাধা দিয়ে মোস্তাকিম আইন ভঙ্গ করেছেন, তা না হয় সত্যও হিসেবে মেনে নিলাম। কিন্তু আন্দোলনের সময় রোগী-স্বজনদের এবং হেফাজতে বন্দি মোস্তাকিমকে পিটিয়ে কি পুলিশ অমানবিক কাজ কিংবা অপরাধ করেনি? আইন বন্দি নির্যাতন অনুমোদন করে না। পুলিশ রাতের অন্ধকারে হাজতবন্দি মোস্তাকিমকে পুনরায় পিটিয়ে মনের ক্ষোভ মিটিয়েছে— এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে মোস্তাকিমের কারামুক্তির পর। তার শরীরে ক্ষতের চিহ্নই নির্যাতনের মাত্রা বলে দেয়। নির্যাতনের মাত্রা কতটা কঠোর ছিল, সেই চিত্র ফুটে উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মোস্তাকিমের লেখা এক চিঠিতে। মোস্তাকিমকে নির্যাতন করে পুলিশ নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ কতটুকু ভঙ্গ হয়েছে, সেটা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তারাই ভালো বলতে পারবেন।
হেফাজতে বন্দির
ওপর পুলিশি নির্যাতনের
তথ্য বের করতে
খুব বেশিদূর যেতে
হয় না। আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর ওপর আঘাত
এলে পাল্টা আঘাত
কতটা কঠিন,
তা ভুক্তভোগী মাত্রই
জানেন। এ কারণে
প্রায়শ গণমাধ্যমে খবর আসে,
‘অমুক গ্রাম কিংবা
এলাকা পুরুষশূন্য’। কিন্তু
আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও মৌলিক অধিকার
আদায়ের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
এক নয়। পুলিশ
যদি মৌলিক অধিকার
আদায়ের আন্দোলনকে
‘নাশকতা’র তকমা
দেয়; তাহলে
‘পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম
হয়েছে’ মর্মে সরকারবিরোধী
পক্ষের অপপ্রচারকে সাধারণ
মানুষ সত্য বলে ধরে নিতে
পারে। পুলিশের দীর্ঘমেয়াদি
ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। তবে এও সত্য, পুলিশ বিভাগে
অনেক মানবিক,
নীতিনিষ্ঠ কর্তব্যপরায়ণ কর্মকর্তা
এবং সদস্যও আছেন।
অন্য একটি
প্রসঙ্গ টেনে বলা যায়,
অনেক পুলিশ সদস্যই
মৌলিক অধিকারের আন্দোলন
যেমন বোঝেন না, তেমনি শিশুর
প্রতি মানবিকতাও প্রদর্শন
করতে জানেন না। গত মধ্য ডিসেম্বরে
মহানগরীর ইপিজেড এলাকায়
পাঁচ বছরের শিশু
আয়াত নিখোঁজ হয়। সাধারণ
ডায়েরির সূত্র ধরে ১০ দিন খুঁজেও থানাপুলিশ
শিশুর সন্ধান পায়নি। পরে পুলিশ ব্যুরো
অব ইনভেস্টিগেশন
(পিবিআই) আয়াতকে অপহরণ
ও খুনের রহস্য
উন্মোচন করে। আয়াত
নিখোঁজ-ইস্যু যেমন
থানাপুলিশের মানবিকতায় নাড়া
দেয়নি, তেমনি মৌলিক
অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও
পুলিশ মানবিকতা দেখাতে
পারেনি। তাতে পুলিশের
ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। ভাবমূর্তি
ক্ষুণ্নের অন্য কারণ, মৌলিক অধিকার
আদায় আন্দোলনে পুলিশ
বাধা দিল,
পিটুনি দিল,
মামলা দিল,
জেলে পাঠাল। এরপর
মোস্তাকিমের দল ইসলামি
ফ্রন্ট চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব
চত্বরে মানববন্ধনের চেষ্টা
করল। সেই মানববন্ধনও
করতে দিল না পুলিশ। পরে তারা চেরাগী
মোড়ে মানববন্ধন করতে
চাইল। তাও করতে
দিল না!
এমনটি কি গণতান্ত্রিক
অধিকারের পথে বাধা
নয়?
প্রকৃতপক্ষে পুলিশ বাহিনীর কতিপয় সদস্য মৌলিক অধিকার আন্দোলনের স্পর্শকাতরতা অনুভব করতে পারছেন না। তাদের বিরুদ্ধে অনেক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। ইসলামি ফ্রন্টের কর্মীকে ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পাঁচলাইশ থানাপুলিশ যে অপতৎপরতা চালিয়েছিল, সেটা শুধু দৃষ্টিকটুই নয় বরং পুলিশের একপেশে চিন্তারও বহিঃপ্রকাশ। সম্প্রতি পুলিশ বাহিনী নামের আগে ‘মানবিক’ শব্দটি যোগ করেছে। নতুন তকমা এঁটেছে ‘মানবিক পুলিশ।’ কিন্তু মানবিক পুলিশ তকমা সাঁটা বাহিনীর কিছু সদস্যের ভেতরটা কত অমানবিক— সেটাই নাগরিকদের স্পষ্ট দেখিয়ে দিল মৌলিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনাকারী মোস্তাকিম ও ছয় খণ্ডে খণ্ডিত শিশু আয়াত। এ রকম দৃষ্টান্ত আছে অনেক। পুলিশের উচিত, লৌকিক মানবিকতার খোলস ফেলে প্রকৃত পুলিশিংয়ে ফেরা। শুভবোধসম্পন্ন, সচেতন নাগরিক সমাজ এমনটিই প্রত্যাশা করে। পুলিশের ভাবমূর্তি দায়িত্বহীন, অসাধু, স্বেচ্ছাচারী কতিপয় কর্মকর্তা ও সদস্যের কারণে ক্ষুণ্ন হয়েছে—এই অভিযোগ অমূলক নয়। তাই হৃত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে পুলিশকে ভূমিকা নিতে হবে।