প্রেক্ষাপট
মাসুদ কামাল হিন্দোল
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:৩৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
যানবাহনে চলাচলের
সময় একটু অসাবধানেই রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা, ইজিবাইক, ভ্যানগাড়ির চাকায়
জড়িয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। শাড়ি বা ওড়না পেঁচিয়ে পঙ্গুজীবন যাপন করছেন, এমন নারীর
সংখ্যাও কম নয়। অনেকে নারী মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে শারীরিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। মিডিয়ায়
নানান ধরনের মৃত্যুর সংবাদ আসে। কিন্তু শাড়ি ও ওড়না পেঁচিয়ে যে মৃত্যু হতে পারে তা
ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। বিশেষ করে ওড়না পেঁচিয়ে মৃত্যুর সংবাদ রাজধানী ঢাকা শহরের চেয়ে
ঢাকার বাইরের জেলা-উপজেলা শহরেই বেশি হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি মৃত্যুর শিরোনাম
তুলে ধরছি : ‘অটোরিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে নারীর মৃত্যু’, ‘ইজিবাইকের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে
গৃহবধুর মৃত্যু’, ‘বরিশালে ভ্যানের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে শিক্ষিকার মৃত্যু’, ‘রিকশার
চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে কিশোরীর মৃত্যু’।
তুচ্ছ কারণে জীবন
হচ্ছে। যাতায়াত ও জীবন তারা উদাসীন। কতজন নারী ওড়না পেঁচিয়ে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন,
তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও নেই। ভুক্তভোগী বা তাদের স্বজনরা না চাইলে অনেক ক্ষেত্রে
মামলাও হয় না। ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয়। এ ধরনের মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? অসচেতন
নারী নাকি ত্রুটিপূর্ণ রিকশা? এতগুলো মৃত্যুর ঘটনার পরও নারী কেন সচেতন হচ্ছে না? মৃত্যু
নিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা কেউ করছেন না। এ ধরনের মৃত্যু নিয়ে মিডিয়ায়ও খুব
একটা আলোচনা হয় না। আগেও এ নারীরা ওড়না পরেছেন।
রিকশায় যাতায়াত করেছেন। তখন তেমন কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাহলে এখন কেন ঘটছে? নেপথ্যের
কারণ অনুসন্ধানে কি আমরা কেউ সেরকম চেষ্টা করেছি?
আমাদের উপমহাদেশের
নারীদের মধ্যে ওড়না পরার চল রয়েছে। মুসলিম-হিন্দু উভয় সম্প্রদায়সহ অন্য ধর্মাবলম্বী
অনেকেই ওড়না পরেন। ওড়নার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। ওড়না দোপাট্টা নামেও
পরিচিত। অঞ্চলভেদে ওড়না পরার আলাদা ধরনও রয়েছে। একসময় শুধু শালীনতা রক্ষার জন্য ওড়না
ব্যবহার হলেও আধুনিক ফ্যাশনেও ওড়না জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আগে সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে ওড়না
পরলেও এখন নারী ফতুয়া-পাঞ্জাবি, শার্ট-টি-শার্টের সঙ্গেও ওড়না পরছেন। ওড়নার ব্যবহার
বেড়েছে। ওড়না ছাড়া যেন বিয়ের কনের সাজে পরিপূর্ণতা আসে না। এ উপমহাদেশে ওড়নার একটি
বিশেষ বাজারও গড়ে উঠেছে। কিন্তু ব্যবহারকারী অনেকেই এ ব্যাপারে অসচেতন। যাতায়াতে সতর্ক
হতেই হবে জীবনের জন্য।
এক দশক আগেও রিকশায়
ওড়না প্যাঁচালে নারীর মৃত্যু হতো না। হয়তো ওড়না, জামা-কাপড় ছিঁড়ে যেত, কখনও তারা আহত
হতেন। ‘দুরন্ত গতির’ ব্যাটারিচালিত বা মোটর রিকশাই এই মরণফাঁদ সৃষ্টি করছে। এ মডেলের
রিকশা এখন ঢাকা শহরেও অবাধে চলছে। দেখার যেন কেউ নেই। অনেক ঘটনা মিডিয়ার অন্তরালেই
থেকে যাচ্ছে। অনাহূত মৃত্যুকে স্বাভাবিক মনে করা হয়। অপমৃত্যুর মামলাও হয় না অনেক ক্ষেত্রেই।
এ ধরনের মৃত্যুতে অনেকের মধ্যে কোনো অনুশোচনাও নেই। পোশাক নির্বাচনের ব্যাপারে বিশেষ
করে লম্বা বোরকা, কামিজ, বড় ওড়না পরার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে।
অপ্রত্যাশিত মৃত্যু যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব হবে বহুমখী। ওড়না পেঁচিয়ে মৃত্যুকে নিছক ‘দুর্ঘটনা’ আখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের মৃত্যু রোধ করতে হলে বাহন ব্যবহারকারীকেই অধিক সর্তক হতে হবে। সচেতনতার পাশাপাশি জনমত গড়ে তুলতে হবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে। সর্বোপরি নারীর পোশাক যেন তার জন্য মৃত্যু ফাঁদ তৈরি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বন্ধ করতে হবে ঝুকিপূর্ণ ব্যাটারিচালিত দুরন্ত গতির রিকশা।