শান্তা মারিয়া
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০১:০৪ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
পয়লা ফাল্গুন আর ভ্যালেন্টাইনস ডে আজকাল মিলেমিশে একাকার। আমার তারুণ্যে অবশ্য ভ্যালেন্টাইনসের এত রমরমা ছিল না। মাত্র শুরু হয়েছিল। তখন ফাল্গুনটাই প্রধান ছিল। বসন্তের প্রথম দিনটিতে হলুদ শাড়ি পরে,
গাঁদা ফুলে শোভিত হয়ে বেড়াতে যাওয়ার রীতি ছিল এখনকার মতোই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস,
চারুকলা,
বইমেলা সর্বত্র আমরা ঘুরতাম বন্ধুবান্ধব দলবেঁধে। এখনকার মতোই। বসন্তের রঙ তো চিরদিন একই রকম। আর ভালোবাসার কথা বলার জন্য,
প্রিয় মানুষের কাছে ভালোবাসার আকুতি প্রকাশের জন্যও পয়লা ফাল্গুন ছিল বেশ মানানসই।
তখন পয়লা ফাল্গুন হতো ১৩ ফেব্রুয়ারি। ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে ১৪ ফেব্রুয়ারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ১৯৮৩ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন এরশাদ সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল,
ছাত্র ও রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি আর গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে ক্যাম্পাস থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল বের হয় সচিবালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার জন্য। এ মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জাফর,
জয়নাল,
মোজাম্মেল,
আইয়ুব,
কাঞ্চন,
দীপালিসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। নব্বইয়ের দশকে ১৪ ফেব্রুয়ারি তাই স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসে শহীদদের স্মরণে পালন করা হতো। এখন তো ভালোবাসা দিবসের চাপে সেসব ইতিহাস অনেকে ভুলেই গেছে। আমার কাছে ফাল্গুন চিরদিনই বিপ্লবের প্রতীক। কারণ ৮ ফাল্গুন বা ২১ ফেব্রুয়ারিতেই প্রজ্বালিত হয়েছিল বিপ্লবের আগুন। আর সেটা হয়েছিল মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই।
এসব কথা থাক। আজকাল প্রেমের গল্পগুলো ক্রমে প্রতারণার গল্প হয়ে উঠছে। আর এ প্রতারণাগুলো ঘটেছে প্রেমের ছদ্মবেশে। আবার ভালোবেসে,
প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যাও ঘটছে। প্রতারিত না হয়েও হয়তো অভিমানে অনেকে আত্মহত্যা করছে। কোনোটাই কাম্য নয়। কে কার ইনবক্সে কী লিখেছে, সেসবের স্ক্রিনশট ভাইরাল হচ্ছে দ্রুত। ভালোবাসার ভিত্তিভূমি হচ্ছে আস্থা। কিন্তু সেই আস্থার ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। সাইবার প্রেমে প্রতারণা অনেক অনেক বেশি। কারণ হলো, মুখোমুখি যখন দেখা হয়, কথা হয় কোনো মানুষের সঙ্গে, তখন পরস্পরের কথাবার্তা, ভাবভঙ্গিতে আসল-নকলের ফারাক কিছুটা হলেও করা যায়। সাইবার যুগের আগে ছিল টেলিফোনে প্রেমের যুগ,
তার আগে পত্রমিতালির যুগ। টেলিফোনে কণ্ঠ শুনে তবু ভালোমন্দ কিছু বোঝা যেত। তবে চোখের দৃষ্টি বোঝা যেত না বলে প্রতারণাও চলত দেদার।
আর চিঠিতে চলত বিস্তর ঠকবাজি। একজনের চিঠি অন্যে লিখে দেওয়া হতো আকসার। দিন যাচ্ছে,
প্রতারণার খেলা আরও জমছে। এখনকার সবচেয়ে জমাট খেলা হলো অন্তরঙ্গ সময়ের দৃশ্য গোপনে ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া। ব্ল্যাকমেল,
প্রেমিকাকে ডেকে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, প্রেমিককে লুটপাট এসব এখন ডালভাত। সত্যিকারের প্রেম এখন বিলুপ্তপ্রায়। প্রকৃত প্রেম শব্দটি বলতে চাচ্ছি না। কারণ প্রেম হলো প্রেম। তার আর প্রকৃত-অপ্রকৃত কী? বরং হতে পারে প্রেম ও অপ্রেম। আজকাল অপ্রেমই বাজার দখল করে আছে। প্রেমের মুখোশ পরে অপ্রেম রাজত্ব করছে। কিন্তু তাই বলে প্রেম কি নেই? অবশ্যই আছে। এখনও একের জন্য অন্যের স্বার্থত্যাগ রয়েছে। এখনও বিশ্বস্ত থেকে প্রেমকে বুকে ধারণ করছেন অনেকে।
এখনও প্রিয়জনকে কাছে না পাওয়ায় অন্তরে দুঃখের নদী লালন করে চলেছেন প্রেমীরা। তবে এটা ঠিক যে, প্রেম যত নিভৃত ততই তা খাঁটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রকাশ্যে যে প্রেমের প্রদর্শনী যত বেশি, তার মেকি হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। আমার কাছে প্রেমের প্রকাশ্য প্রদর্শনীকে খুব রুচিকর মনে হয় না। প্রেমের মতো মহৎ অনুভূতির জন্য নিভৃতি,
আবরু,
লজ্জাশীলতার প্রয়োজন অন্তত কিছুটা হলেও
আছে। আর প্রেমকে সময়ের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়া জরুরি। বানের জলের মতো যে প্রেম আসে তা দুই দিন পর চলে যায়। রেখে যায় কিছু ক্লেদাক্ত স্মৃতি। আর সময়ের কষ্টিপাথরে যে প্রেম ও প্রেমী উত্তীর্ণ, তা চিরকালীন। তা আজীবন এমনকি মৃত্যুতেও অমলিন। তা ‘ন হন্যতে’ শরীর বিগত হলেও এই প্রেম মরে না বা তাকে হনন করা যায় না।
১৪ ফেব্রুয়ারি পয়লা ফাল্গুন। পয়লা ফাল্গুনে বসন্ত উদযাপনের রীতিও ঐতিহ্যবাহী। ছোটবেলায় আমার নানিকে দেখেছি পয়লা ফাল্গুনের আগে শাড়িতে ফুল দিয়ে রং ছাপ করতে। তখন বাজারে ফাল্গুনের এত রকম শাড়ি বা পোশাকের বাহার ছিল না। তবে হলুদ শাড়ি বা বাসন্তী রঙের শাড়ি,
গাঁদা ফুলের মালা পরার রীতি সীমিত পর্যায়ে হলেও ছিল। ইংরেজ শাসনামলে শহুরে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি পাশ্চাত্যের অনুকরণের ধারায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। শান্তিনিকেতনে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নতুন করে আমাদের দেশজ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রয়াস থেকে বসন্ত উৎসব উদযাপনের রীতি প্রবর্তন করেন।
পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর একের পর এক আঘাত হানতে থাকে পাকিস্তানি শাসকরা। অন্যদিকে প্রতিবাদস্বরূপ বাঙালি আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে আগ্রহী হয়। ষাটের দশকেই পয়লা ফাল্গুনে হলুদ শাড়ি পরা নতুনভাবে শুরু হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্ত উৎসব উদযাপন শুরু হয় ঢাকার চারুকলায়। জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন কমিটি তখন থেকেই নিয়মিত বকুলতলায় বসন্তবরণের জন্য উৎসবের আয়োজন করছে। তবে বসন্তবরণের এসব উৎসব নগরকেন্দ্রিক। গ্রামে কিন্তু বসন্তবরণের জন্য লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী সেই দোল, রাস উৎসব টিকে আছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে।ফাল্গুন-চৈত্রে গ্রামে গঞ্জে বিভিন্ন উপলক্ষে মেলা বসারও রেওয়াজ আছে।
ফাল্গুনের বাতাসে এখন ভালোবাসার রঙ। এ ভালোবাসাটা ব্যক্তিবিশেষের প্রতি না হয়ে অথবা ব্যক্তিবিশেষের প্রতি হওয়ার পাশাপাশি যদি দেশ, জাতি ও সংস্কৃতির প্রতি ছড়িয়ে যায়, যদি ভালোবাসি নিজের মাতৃভাষাকে, ভালোবাসি এ দেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে, যদি ভালোবাসি মাতৃভূমি বাংলাদেশকে তা হলেই ভালোবাসাটা সার্থক হয়।