× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাকিস্তানের আগ্রহ, বাংলাদেশের শর্ত ও আঞ্চলিক জোটের ভূমিকা

ড. আমেনা মহসিন

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:২১ এএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার ৭৫তম প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের সঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিনা রব্বানির সংক্ষিপ্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন হিনা রব্বানি অন্যদিকে আব্দুল মোমেন বলেছেন, একাত্তরে গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে তবে হিনা রব্বানি বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন তিনি আব্দুল মোমেনকে নিজ রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও পারস্পরিক সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গটি তুলেছেন বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নানা মহলে আলোচনা চলছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মূলত শ্রীলঙ্কার প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কা কঠিন অর্থনৈতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়েছিল সেই বিপর্যয় কাটিয়ে তারা ফের নিজস্ব অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ তাদের নানাভাবে সাহায্য করেছে শুধু তাই নয়, ওই অনুষ্ঠানে যোগদানের মাধ্যমে কূটনৈতিক ভাষায় দেশটির সঙ্গে একাত্মতার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে সন্দেহ নেই, বিষয়টি আমাদের সঙ্গে অন্যান্য দেশের আন্তঃসম্পর্ক দৃঢ়ীকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে সচরাচর এমন অনুষ্ঠানে অন্যান্য দেশ থেকে আগত অতিথিদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হতেই পারে ভুলে গেলে চলবে না, কূটনীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে

একাত্তরে গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবেÑ এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি দাবি শুধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরই নয়, জনগণেরও জনগণের দাবিই একসময় রাষ্ট্রের দাবি হয়ে ওঠে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা যারা ঘটিয়েছে, তাদের সেজন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত অধিকাংশ সময়ই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয় না সচরাচর গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া চালানো নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে সম্ভব হয় না অথচ এগুলো ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ যদি এমন অপরাধ স্বীকারের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়, তাহলে বিশ্বের অন্য যেকোনো প্রান্তে আবারও এমন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এজন্যই পাকিস্তানকে গণহত্যার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় কেউ এড়াতে পারে না আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো তাদের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে একাত্তরে তারা যে গণহত্যা করেছে, এমন জঘন্য কর্মকাণ্ড একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবেই গণ্য অপরাধের জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবেÑ দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইলে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তবে হিনা রব্বানি নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন বিধায় ধারণা করা যায়, তারা এখনই একাত্তরে গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইবেন না

সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তান আন্তঃসম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠেছে এবং অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান-বাংলাদেশ-ভারত তিনটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন বিদ্যমান বিষয়টি পাকিস্তানের দিক থেকে বিবেচনা করতে গেলে কিছুটা জটিল হয়ে ওঠে তিনটি দেশের মধ্যে সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা গেলেও এর বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন মনে রাখতে হবে, ভারত পাকিস্তান দুটোই নিউক্লিয়ার ক্ষমতাধর রাষ্ট্র দুটো দেশই ঘোষণা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেছে দুই দেশের মধ্যে স্বভাবতই সম্পর্কের ঘাত-প্রতিঘাত দেখা যায় সেই প্রেক্ষাপট আলাদা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ধরনের টানাপড়েন দেখা যায় এর সঙ্গে তা মেলাতে গেলে ভুল হবে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বেশ কিছু বিষয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে তার মধ্যে কাশ্মীর অবশ্যই একটি বড় বিষয় কাশ্মীর ইস্যুর ক্ষেত্রে পাকিস্তান বরাবরই দাবি করে আসছে বিষয়টি অমীমাংসিত অন্যদিকে ভারত দাবি করছে, বিষয়টি মীমাংসিত আবার ভারত প্রায়ই দাবি করে পাকিস্তান জঙ্গিবাদের একটি উর্বর ক্ষেত্র, যা মূলত কাশ্মীর প্রসঙ্গের সঙ্গেই যুক্ত কিন্তু আমাদের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন কখনও স্পষ্ট কিংবা অস্পষ্টরূপে ধরা পড়ে, তার প্রধান কারণ একাত্তর একাত্তর প্রসঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের আস্থার বড় সংকট রয়েছে সংকট দূর করার জন্য পাকিস্তানকেই সচেষ্ট হতে হবে তারা যদি একাত্তরে আমাদের ওপর চালানো বর্বরোচিত হামলার জন্য ক্ষমা চায়, তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়নের জন্য এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারি

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সম্পর্ক জোরদারকরণে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে আমরা জানি, সার্ক গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসাসহ বহুমুখী সম্পর্কের উন্নয়ন অথচ কয়েক বছর ধরেই সার্কের কোনো সম্মেলন হচ্ছে না চলমান বৈশ্বিক সংকটে প্রতিটি দেশই তাদের ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে পাশের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছে বিশেষত পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ এড়ানোর জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের মধ্যে মুদ্রায় লেনদেনের পাশাপাশি পণ্যদ্রব্যের বিনিময়ও বাড়িয়েছে সবকিছু বিবেচনায় সার্ক পুনঃসক্রিয় করা অত্যন্ত জরুরি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিতে বিচার করলে, একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের বিরোধ থাকে বটে তার পরও ওই একই দেশের সঙ্গে কোনো কোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা গুরুত্ব দিয়েই চলে উদাহরণ হিসেবে ভারত-চীন সম্পর্কের কথা বলা যেতে পারে ভারতের সঙ্গে চীনের অনেক বিষয়েই বিরোধ রয়েছে এত কিছুর পরও দুটো দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং দেখা যাচ্ছে তাদের সম্পর্ক ক্রমেই জোরদার হচ্ছে চলমান বৈশ্বিক সংকট যেভাবে প্রায় প্রতিটি দেশের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন অবস্থা থেকে সার্ক পুনঃসক্রিয় করাটা অত্যন্ত জরুরি সার্কের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়নের যেস্পিরিটছিল, এর জাগরণ এই সংকটাপন্ন মুহূর্তে খুব দরকার কারণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ থাকলেও এই সংস্থা মধ্যস্থতার মাধ্যমে অনেকাংশে সম্পর্কোন্নয়ন করতে সক্ষম হবে

অবশ্য চলমান বৈশ্বিক সংকটে শুধু সার্ক নয়, অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থাকেও পুনঃসক্রিয় করা জরুরি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেক উপ-আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে আবার এখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টিও ভাবতে হবে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক আরও গভীর করা যায় সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করা গেলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যূথবদ্ধভাবে নানা সমস্যার সমাধান করতে পারবে আপাতত আমাদের বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি অত্যন্ত জরুরি বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত নিয়ে আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে বিষয়ে দক্ষিণের দেশগুলো বহুমুখী প্রক্রিয়া চালু করতে পারে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের অবকাঠামো নির্মাণ করার পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ে যূথবদ্ধ পদ্ধতি উদ্ভাবনও করতে পারে তা ছাড়া অঞ্চলে বিদ্যুৎ জ্বালানি কীভাবে ব্যবহার সাশ্রয় করা যায় বিষয়ে গবেষণারও সুযোগ রয়েছে তবে গবেষণা প্রতিটি দেশ সমন্বিতভাবে করলে তা বেশি জোরালো হবে

চলমান বৈশ্বিক সংকটে আরেকটি বিষয় নিয়ে অঞ্চলের দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে অতীতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল আমরা শুনেছিলাম প্রতিটি দেশের মধ্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য স্মার্ট সিকিউরিটি ব্যাংকতৈরি করা হবে রকম উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য গঠনমূলক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি এমনকি চলমান বৈশ্বিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না এসব বিষয়ে একে অন্যের সঙ্গে আন্তঃসহযোগিতা বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপনে আমাদের টানাপড়েন নেই যেমন ভুটান কিংবা নেপালের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু তার পরও ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে নানা বিষয়ে আমাদের কিছু টানাপড়েন তৈরি হয় তবে টানাপড়েন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করা সম্ভব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশকেই সচেষ্ট হতে হবে আমাদের স্বার্থেই কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়ে আরও জোর দেওয়া জরুরি


লেখক : অধ্যাপকআন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা