ড. দিলারা জাহিদ
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০১:৪৫ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
৫
ফেব্রুয়ারি ভোর সোয়া
৪টার দিকে তুরস্কের
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গাজিয়ানতেপে
শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত
হানে।
রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের
মাত্রা ছিল ৭
দশমিক ৮ আর
গভীরতা ছিল ১৭
দশমিক ৯ কিলোমিটার। তুরস্ক-সিরিয়ায়
ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর
এমন দুর্যোগে বাংলাদেশের
প্রস্তুতি নিয়ে শঙ্কার
বিষয়টি ফের আলোচনায়। ভৌগোলিক
অবস্থান অনুযায়ী বাংলাদেশ
ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। দেশে রিখটার
স্কেলে ৬ থেকে
৭ মাত্রার ভূমিকম্প
হওয়ার উপযোগী ভূতাত্ত্বিক
ফল্টসংবলিত ১৪টি স্থান
রয়েছে।
এসব ফল্ট থেকে
যেকোনো সময় মাঝারি
থেকে বড় ধরনের
ভূমিকম্পের শঙ্কা এড়িয়ে
যাওয়ার অবকাশ ক্ষীণ। এমনকি
বিগত কয়েক বছর
ধরে বেশকিছু ছোট
মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত
হয়েছে দেশে। ২০২২ সালেই
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে
উৎপত্তি হওয়া এক
ভূমিকম্প রাজধানী ঢাকা
ও চট্টগ্রাম জেলাসহ
বেশ কয়েকটি জেলায়
টের পাওয়া গিয়েছিল। সম্প্রতি
বিধ্বস্ত তুরস্ক-রাশিয়ায়
যে ভয়াবহ চিত্র
দেখা গেছে, তা
থেকে সঙ্গতই জনমনে
উদ্বেগ বেড়েছে। সংবাদমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট
বিশেষজ্ঞরা প্রস্তুতি নেওয়ার
তাগিদ দিয়ে চলেছেন। অন্যদিকে
নানা মহলে প্রশ্ন
দেখা দিয়েছে, এমন
ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতি
আমাদের আছে কি-না। সোজা
উত্তর হলো, আমাদের
এখনও তেমন প্রস্তুতি
কিংবা সক্ষমতা নেই।
যেকোনো
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার
ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি
নেই এমন কথা
বলার কারণ স্পষ্ট
করা জরুরি। আমাদের দেশে
দুর্যোগ সম্পর্কে এখনও
অনেকের ধারণা স্পষ্ট
নয়।
সচরাচর মনুষ্যসৃষ্ট কারণে
যে বিপর্যয় ঘটে
তাকে দুর্যোগ বলা
হয়।
কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মের
আবর্তে যেসব বিপর্যয়
ঘটে, সেগুলোকে হ্যাজার্ড
কিংবা আপদ বলা
হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা
যেতে পারে, দেশে
বিভিন্ন অঞ্চলে বছরের
একটি নির্দিষ্ট সময়ে
বন্যা হয়, বৈশাখে
ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। এ
বিষয়গুলোকে মূলত আপদ
বলা যায়। কারণ এসব
সংঘটিত হওয়ার পেছনে
মানুষের ভূমিকা থাকে
না এবং অধিকাংশ
ক্ষেত্রে মানুষ আপদ
মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখে। কিন্তু
দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার
কোনো আভাস পাওয়া
যায় না। কবে নাগাদ
হতে পারে, তার
একটি অনুমান করা
যায় মাত্র। যদি যথাযথ
প্রস্তুতি না থাকে,
তাহলে দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির
আশঙ্কাও ততই বাড়বে। যেহেতু
আমাদের দেশে বড়
মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে
দৃশ্যমান প্রস্তুতি, এমনকি
পরিকল্পনা নেই—সেহেতু
উদ্বেগ বাড়াটাই স্বাভাবিক।
দুর্যোগ
মোকাবিলার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
ও পরিকল্পনা নিয়ে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ
ইতোমধ্যে গবেষণা শুরু
করেছে।
গবেষণার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট
পরিকল্পনা প্রণয়ন ও
দুর্যোগ মোকাবিলার অভিনব
পদ্ধতির মাধ্যমে অনেক
দেশই তাদের রেসপন্ডিং
ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে থাকে। যেহেতু
দুর্যোগ প্রতিরোধের আপাতত
কোনো উপায় নেই,
তাই রেসপন্ডিং ক্যাপাসিটি
বাড়ানোর বিষয়েই সর্বাধিক
গুরুত্ব দিতে হয়। যেমন
জাপানে সবচেয়ে বেশি
ভূমিকম্প হয়। প্রতিদিনই দ্বীপরাষ্ট্রটির নানা অঞ্চলে
বিভিন্ন মাত্রার ভূকম্পন
অনুভূত হয়। বিভিন্ন জরিপ
প্রতিবেদন দেখলে জানা
যাবে, জাপানে তুরস্ক-সিরিয়ার
মতো ভয়াবহ ভূমিকম্প
প্রতিবছরই হয়। তবে জাপানে
অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও
প্রাণহানির ঘটনা তুরস্ক-সিরিয়ার
মতো নয়। কারণ তারা
দুর্যোগ মোকাবিলা করার
পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রেখেছে। ভূমিকম্পের
ধরন এবং তাদের
ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যে
ঝুঁকির বিষয়গুলো চিহ্নিত
করে তারা সুষ্ঠু
পরিকল্পনা নিয়েছে। এ জন্যই
দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য
পর্যাপ্ত প্রস্তুতির বিকল্প
নেই।
যখন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি
থাকবে না, তখন
কাঠামোগত ও প্রাকৃতিক
ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতেই
হবে।
যেমনটা আমরা তুরস্ক-সিরিয়ার
ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। এই
লেখাটি যখন লিখছি
তখন সংবাদমাধ্যমের খবর
অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা
১০ হাজার ছুঁই
ছুঁই এবং ধারণা
করা হচ্ছে, এ
সংখ্যা ২০ হাজার
পেরোতে পারে। এখন পর্যন্ত
মৃতের মধ্যে শিশুর
সংখ্যাই বেশি। তুরস্কের গাজিয়ানতেপ
সিরিয়া সীমান্ত থেকে
মাত্র ৪০ কিলোমিটার
দূরে।
এই ভূমিকম্পের বিপর্যয়
সিরিয়ার ওপরও ব্যাপক
প্রভাব ফেলেছে। সিরিয়ার অবস্থা
আমাদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি
জানা।
একদিকে দেশটিতে বিদ্যমান
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং
উগ্রবাদীদের অপতৎপরতা চলমান;
অপরদিকে ভয়াবহ ভূমিকম্পে
বিধ্বস্ত।
দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে
কোনো প্রস্তুতি না
থাকার ফলে এটি
শতাব্দীর ভয়াবহ বিপর্যয়ের
নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের
এ আশঙ্কা অমূলক
নয়, আমাদের দেশেও
এমন ভয়াবহ বিপর্যয়
যেকোনো সময় ঘটতে
পারে।
আমাদের
ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের আশঙ্কা
আরও বেশি। তুরস্কে ৭
দশমিক ৮ মাত্রার
যে ভূমিকম্প হয়েছে। তার
থেকে কম মাত্রার
ভূমিকম্প মোকাবিলায় দৃশ্যমান
কোনো প্রস্তুতিই আমাদের
কাছে নেই। যেকোনো দুর্যোগের
ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য
দুটো বিষয়ে পরিকল্পনা
নেওয়া জরুরি। প্রথমত দুর্যোগ মোকাবিলার উপযোগী
অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। অপরটি
হচ্ছে, দুর্যোগকবলিত অবস্থায় আমাদের
করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের
আগে থেকেই
প্রস্তুতি নিতে
হবে, দুর্যোগসৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হলে
উদ্ধারকার্য কীভাবে
সম্পন্ন করা
হবে, দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার
সময়ে মানুষ
সুশৃঙ্খলভাবে বের
হয়ে আসবে
ইত্যাদি।
এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত
করেই পরিকল্পনা দাঁড়
করাতে হবে। তবে যেকোনো
দেশে দুর্যোগ মোকাবিলার
ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন
ও পরিকল্পনা প্রণয়ন
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামোগত উন্নয়নের
বিষয়টি একা একটি
দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয়ের পক্ষে
সম্ভব নয়। সরকারের প্রত্যেকটি
মন্ত্রণালয়কে যূথবদ্ধভাবে কাজ
করতে হবে। কারণ আমাদের
দেশে ঘরবাড়ি বানানোর
একটি বিল্ডিং কোড
রয়েছে।
দেশের অবকাঠামো বিল্ডিং
কোড অনুসারে নির্মাণ
করা হয়নি—এ
অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষত
পুরান চার-পাঁচতলা
বিশিষ্ট ভবনগুলোর অধিকাংশ
নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং
কোড অনুসরণ করা
হয়নি।
দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য
প্রতিনিয়ত যুগোপযোগী করা
এবং বিল্ডিং কোড
যথাযথভাবে অনুসরণ করে
অবকাঠামো নির্মাণ করার
বিষয়ে গুরুত্ব দিতে
হবে।
এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি
প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ
দরকার।
এক্ষেত্রে দুর্যোগ ও
ত্রাণ মন্ত্রণালয় সমন্বয়কের
ভূমিকা পালন করবে।
এ
কথা নির্দ্বিধায় বলা
যায়, দেশে নগরায়ণ
ও নগর পরিকল্পনায় মাটির
প্রকৃতি, ভূমিতলের উচ্চতা,
ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যকে যথাযথ
গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে
না।
অধিকাংশ সময় জলাশয়-জলাভূমি
ইটবালি দিয়ে ভরাট
করে আবাসন ও
অবকাঠামো নির্মাণ করা
হচ্ছে।
এ রকম জায়গা ভরাট
করে অবকাঠামো নির্মাণ
যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এর
সবচেয়ে বড় নজির
রানা প্লাজা। ঢাকাসহ দেশের
অন্যান্য নগর-অঞ্চলে
এমন অনেক ঘরবাড়িই
জলাশয়-জলাভূমি ভরাট
করে নির্মিত হয়েছে। এসব
অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে
বিল্ডিং কোড কতটা
অনুসরণ করা হচ্ছে—তা অনিশ্চিত। তবে
আমাদের দেশের অবকাঠামো
ভূমিকম্প সহনশীল নয়—এ
সত্য এড়ানো যাবে
না।
দুর্যোগ এবং হ্যাজার্ড
এক নয় এবং
দুর্যোগ কবে নাগাদ
হতে পারে তার
আন্দাজ পাওয়া কঠিন। ভবিষ্যতে
যদি বড়-মাঝারি
মাত্রার ভূমিকম্প হয়,
তাহলে এ রকম
প্রত্যেকটি অবকাঠামো ধসে
পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যখনই
বিশ্বের কোথাও ভয়াবহ
কোনো দুর্যোগ আঘাত
হানে তখনই সংবাদমাধ্যমে
আমরা প্রেক্ষাপট নিয়ে
আলোচনা করি। শঙ্কা প্রকাশ
করি।
ক’দিন
পর আবার ভুলে
যাই।
দেশে নগরায়ণ ও
পরিকল্পনা নিয়ে পর্যাপ্ত
গবেষণা হলেও দুর্যোগ
মোকাবিলা নিয়ে যথেষ্ট
গবেষণা কার্যক্রম নেই। এমনকি
দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা
প্রণয়নে কারও দায়বদ্ধতাও
নেই।
অথচ এ নিয়ে
কাজ করার বহু
সুযোগ আমাদের রয়েছে। ভৌগোলিক
অবস্থান অনুসারে আমরা
দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। সে
কথা বিবেচনা করেই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ
কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজাস্টার
ম্যানেজমেন্ট ও ভালনারেবিলিটি
স্টাডিজ বিভাগ খোলা
হয়েছে।
এক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন
করেন, এ নিয়ে
সংশ্লিষ্ট বিভাগ থাকার
পরও কেন পর্যাপ্ত
গবেষণা নেই? কারণ
গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়নের
ক্ষেত্রে যদি সংশ্লিষ্ট
মন্ত্রণালয়ের দায়বদ্ধতা কিংবা
সদিচ্ছা না থাকে,
তাহলে কোনো গবেষণাই
কাজে আসবে না।
আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জরিপ ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে পরামর্শ ও পরিকল্পনা তৈরি করে থাকি। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বশীলদের এগিয়ে আসতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে সচরাচর যারা দায়িত্ব পান, তারা দীর্ঘদিন কাজ করতে পারেন না। ফলে অনেক কাজই এগোনো সম্ভব হয় না। আমরা বরাবরই বলে আসছি, দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টি কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন যূথবদ্ধ প্রচেষ্টা। দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। উন্নত বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানকে এসব নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সংযুক্ত করে থাকে। এ ছাড়া দুর্যোগে আমাদের রেসপন্ডিং ক্যাপাসিটি বাড়ানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতন করতে হবে। দুর্যোগের ক্ষেত্রে আমরা শঙ্কার কথা বারবার বলতে চাই না। আমরা চাই, দুর্যোগ পরিস্থিতিতে যতটা সম্ভব ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে। এ ব্যাপারে যথাযথ কাজ করতে পারলে দুর্যোগ মোকাবিলা অনেকটাই সহজ হবে।
লেখক : পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়