তোফায়েল আহমেদ
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০১:৩৯ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
মহান ভাষা
আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি মাস
শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস
আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ
গুরুত্ববহ। ১৯৫২-এর
মহান ভাষা আন্দোলনে বাংলার
সংগ্রামী ছাত্রসমাজ রাজপথে বুকের
রক্ত ঢেলে মাতৃভাষা বাংলাকে
অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত
করে। আর ’৬৯-এর জানুয়ারি ও
ফেব্রুয়ারি মাসে সংগ্রামী ছাত্র-জনতা দেশব্যাপী তুমুল
গণ-আন্দোলন সংঘটিত করে
দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ‘ভোটাধিকার’ অর্জন এবং
সকল রাজবন্দিসহ প্রিয়নেতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানকে কারামুক্ত
করে। সত্যিকার অর্থেই ’৫২-এর রক্তধারা
’৬৯-এর রক্তস্রোতে
মিশে ’৭১-এ এক সাগর
রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন ও
সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের উন্মেষ
ঘটায়। বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এ এক ঐতিহাসিক
পরম্পরা।
’৬৯-এর ৯ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন
এবং এদিনেই গণআন্দোলন ১
দফায় রূপান্তরিত হয়। এদিন
পল্টনে আমার জীবনের প্রথম
জনসভা। পল্টন ময়দানে সর্বদলীয়
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ‘শপথ দিবস’ পালিত হয়। সর্বদলীয় ছাত্র
সংগ্রাম পরিষদের আমরা ১০
জন ছাত্রনেতা লাখ লাখ
মানুষের সামনে ‘জীবনের
বিনিময়ে ১১ দফা দাবি
আদায়ের শপথ গ্রহণ’ করি। জনসভা
তো নয়- যেন বিশাল
জনসমুদ্র! সর্বদলীয় ছাত্র
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক এবং
সভার সভাপতি হিসেবে পিনপতন
নীরবতার মধ্যে একটানা ৪৫
মিনিট বক্তৃতা করি। সেদিনের
বক্তৃতা শেষে সমবেত জনতার
তুমুল গর্জনের সাথে বজ্রকণ্ঠে স্লোগান তুলিÑ ‘শপথ নিলাম
শপথ নিলাম মুজিব তোমায়
মুক্ত করবো; শপথ
নিলাম শপথ নিলাম মাগো
তোমায় মুক্ত করবো।’
’৬৯-এর গণ-আন্দোলন
সমগ্র জাতিকে উজ্জীবিত করে
৯ ফেব্রুয়ারি এক মোহনায়
শামিল করেছিল। সেদিন পল্টনের
জনসভা শেষে সংগ্রামী ছাত্র-জনতার বিক্ষুব্ধ মিছিল
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে
বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং
রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিতে
থাকে। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায়
আমরা তৎক্ষণাৎ সেখানে যাই
এবং বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে শান্ত করে ইকবাল
হলে (বর্তমান শহীদ
সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ফিরিয়ে আনি। স্বৈরশাসকের
শত উসকানি সত্ত্বেও আমরা
নৈরাজ্যের পথে যাইনি। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আন্দোলন করেছি।
আজ সেই সোনালি
অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে
মনে হয় কী করে
এটা সম্ভব হলো?
তখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর
বিচার চলছে। ‘রাষ্ট্র
বনাম শেখ মুজিবুর রহমান
ও অন্যান্য’ অর্থাৎ আগরতলা
মামলা বলে যে মামলাকে
অভিহিত করা হয়েছিল- সেই মামলার বিচার চলছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন
ফাঁসির মঞ্চে। আমরা জাগ্রত
ছাত্রসমাজ শুধু ঐক্যবদ্ধ হইনি, গোটা জাতিকে আমরা
ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলাম।
আমরা যখন পল্টনে মিটিং
করি, তখন সচিবালয়ের
সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস বন্ধ
করে এই পল্টনের জনসভায়
ছুটে আসত। সেদিনের জনসভাগুলো
শুধু পল্টন ময়দানেই সীমাবদ্ধ
থাকত না, আশপাশের
এলাকাসহ সমগ্র মতিঝিল, শাপলা চত্বর থাকত কানায়
কানায় পরিপূর্ণ। সেই দিনগুলোতে
আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য
দিয়ে আমরা সর্বব্যাপী গণ-অভ্যুত্থান
সৃষ্টি করেছিলাম; শপথ দিবসের
সেই জনসমুদ্রে লাখ লাখ
লোকের উপস্থিতিতে মরণপণ শপথ
নিয়েছিলাম; ১৪ ফেব্রুয়ারি
পল্টন ময়দানে রাজনৈতিক দলসমূহের
জোট ‘ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন
কমিটি’ তথা
‘ডাক’-এর মানুষ
নুরুল আমিনকে প্রত্যাখ্যান করে
মঞ্চে আমাদের তুলে নিলে
যে বক্তৃতা আমরা করেছিলাম,
যে ম্যান্ডেট আমরা নিয়েছিলাম,
সেই ম্যান্ডেট আমরা অক্ষরে
অক্ষরে বাস্তবায়ন করেছি।
সেদিন ১৫
ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে রাত্রিবেলা
সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা
করে আবার কারফিউ জারি
করা হয়, ১৮
ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকেÑ যিনি নিজের
বুক পেতে দিয়ে বলেছিলেন,
‘আমার ছাত্রদের গুলি করার
আগে আমার বুকে গুলি
চালাতে হবে’, তখনই
তাঁর বুকে প্রথমে গুলি
পরে বেয়নেট চালিয়ে তাঁকে নির্মমভাবে
হত্যা করা হয়েছিল। যার
প্রতিবাদে সমগ্র দেশ গণজাগরণ-গণবিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে
এবং অমর একুশে ফেব্রুয়ারির
ঐতিহাসিক দিনে পল্টন ময়দানে
লাখ লাখ লোকের সামনে
যখন প্রিয় নেতা শেখ
মুজিবকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে
নিঃশর্ত মুক্তিদানের আলটিমেটাম দিয়েছিলাম,
যার পরিপ্রেক্ষিতে ২২ ফেব্রুয়ারি
প্রিয় নেতাকে মুক্তি দিতে
স্বৈরশাসক বাধ্য হয়েছিল এবং
২৩ ফেব্রুয়ারি আমরা সর্বদলীয়
ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে
তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে আজকের
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসংবর্ধনা প্রদান
করি। আমি সৌভাগ্যবান মানুষ
যে, সেই সভায়
সভাপতিত্ব করার দুর্লভ সৌভাগ্যের
অধিকারী।
৯ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন আর ১১
দফার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
সেদিন আন্দোলন ১ দফায় চলে যায়। প্রিয়
নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে
মুক্ত করেই আমরা ঘরে
ফিরেছি। স্মৃতির পাতায় ভেসে
ওঠে আরও শপথ দিবসের
কথা। যেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ’৭০-এর
নির্বাচনের পর ’৭১-এর ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে। নবনির্বাচিত
জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ
সদস্যদের সাথে সেদিন আমারও
শপথগ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর
নেতৃত্বে আমরা শপথ নিয়েছিলাম।
বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, ‘৬ দফা আজ আমার
না, ৬ দফা আজ আওয়ামী লীগের
না; এই নির্বাচনের
মধ্য দিয়ে ৬ দফা জনগণের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত
হয়েছে। কেউ যদি ৬
দফার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে
তবে তাকে জ্যান্ত কবর
দেওয়া হবে এবং আমি
যদি করি আমাকেও।’ আবার আমরা শপথ নিয়েছিলাম
’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের দেরাদুনে।
মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক
হিসেবে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের
পাহাড়ের ওপর ৭ হাজার ফুট
উচ্চতায় ট্রেনিং শেষে রণাঙ্গনে
পাঠাবার প্রাক্কালে শপথ গ্রহণ
করাতাম এই বলে যে, ‘প্রিয় নেতা, তুমি কোথায় আছো,
কেমন আছো জানি না! যতদিন আমরা প্রিয়
মাতৃভূমি তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশকে
হানাদারমুক্ত করতে না পারবো, ততদিন আমরা মায়ের
কোলে ফিরে যাবো না।’
প্রতি বছর
এই দিনগুলো জাতীয় জীবনে
ফিরে আসে। আনন্দের বিষয়
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান তাঁর প্রতিটি
মিটিংয়ে আমি তাঁর সফরসঙ্গী
হিসেবে যেতাম-যখন
বক্তৃতা করতেন, সেই ’৫২-এর
মহান ভাষা আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের
কথাগুলো বলতেন। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বক্তৃতায়ও বঙ্গবন্ধু ’৬৯-এর
গণ-অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। আমার লাইব্রেরি রুমে বসে যখন ’৬৯ ও ’৭১-এর সেই সোনালি দিনগুলোর ছবি ও পত্রিকার পাতাজুড়ে প্রতিবেদনগুলো দেখি, তখন আনন্দে বুক ভরে যায় এই ভেবে যে, একদিন
আমরা গৌরবোজ্জ্বল এই দিনগুলো সৃষ্টি করেছিলাম।
লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ