× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ ‘অসম্মতির মানচিত্র’

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:৫৯ পিএম

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:১৭ পিএম

শিল্পী ঢালী আল মামুন।

শিল্পী ঢালী আল মামুন।

দুইশ বছরের টানা ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ কেবল আমাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবেই ন্যুব্জ করেনি, কেবল আমাদের দাঁড়ানোর ভঙ্গিমাকেই পাল্টে দেয়নি, বদলে দিয়ে গেছে আমাদের দেখবার আর অনুভব করার দৃষ্টিটাকেও। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা আর বাঁকবদলের সময় আর বিষয়গুলোকেও আমাদের অনেকে তাই দেখে থাকি ঔপনিবেশিক সেই শাসক-শোষক আর ইতিহাস রচয়িতাদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, মূল্যবোধ দিয়ে, মানদণ্ড দিয়ে।

কিন্তু বেশ কয়েক দশক ধরে সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের ইতিহাস রচনার সেই পদ্ধতি, মানদণ্ড ও কথকতার দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে শুরু করেছেন অনেক মুক্তচিন্তাবিদ। আর তাদের সেই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সাড়া দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের শিকার ঔপনিবেশিক দেশগুলোর মানুষজনও ইতিহাসকে পাঠ করে চলেছেন নতুনভাবে। এভাবে ইতিহাসের পাঠে দেখা দিয়েছে নতুন কথকতা। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লেখা ইতিহাসের অসংগতিগুলোকে তুলে ধরার ফলে রচিত হচ্ছে ইতিহাসের নতুন এক আখ্যান, নতুন ধারাভাষ্য। 

প্রদর্শনীতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের সঙ্গে শিল্পী ঢালী আল মামুন। 

শিল্পী ঢালী আল মামুনও তাই করেছেন। ঔপনিবেশিক ধারার ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা যে ইতিহাস উৎপাদন করেছেন, করে চলেছেন, সেই ইতিহাসের বিবিধ স্তরের দিকে প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। এই বাংলার মানুষের মনোজগতে ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে বহুস্তরস্পর্শী শোষণ-বঞ্চনা ও আতঙ্কের বোধ তৈরি হয়েছে। অপ্রকাশের ভার নিয়ে মূক, বধির ও ভাষাহীন হয়ে পড়েছে এই জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্র ও সমাজ-কাঠামো থেকে শুরু করে ব্যক্তি মানুষের স্মৃতিপটে তা সৃষ্টি করেছে নিরাময়হীন গভীর ক্ষত। মামুন তার সাম্প্রতিক প্রদর্শনী ‘অসম্মতির মানচিত্রে’ সেই গভীর ক্ষতকে তুলে এনেছেন বহু মাধ্যমের বৈচিত্র্যময় কাজের মধ্য দিয়ে, শিল্পের ভাষাতে। বোঝাই যায়, দীর্ঘ এক প্রস্তুতির ফসল তার এই প্রদর্শনী-ইতিহাস সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে না এগোলে যার অভিপ্রকাশ সম্ভব হতো না। 

ইতিহাসকে কী চোখে দেখেন মামুন? ইতিহাসের চলন তার মতে বহুরৈখিক এবং অসংলগ্নও বটে। আবার মানুষের প্রথা ও মূল্যবোধ এবং বিবেচনার মানদণ্ড তাকে বৈভিন্নময়ও করে তোলে। কিন্তু এই বহুরৈখিকতা, অসংলগ্নতা এবং বৈভিন্নময়তাকে মামুন উপস্থাপন করেছেন নিরাবেগী ক্রন্দনের সুরে। ড্রইং, পেইন্টিং, শব্দ, ভিডিও, ঘুরতে থাকা তালপাতার সেপাই, ভাস্কর্য, আঁকাআঁকি, বিভিন্ন অনুষঙ্গ ও ভেষজ উপকরণকে সমন্বিত করে তিনি তার নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করেছেন, অতীতকে নতুন করে প্রতীকী অভিজ্ঞতার নির্যাসে উপস্থাপন করেছেন। শাসক সাম্রাজ্যবাদীরা এ জনপদ ও এর যাত্রাপথকে চিহ্নিত করেছে, গ্রন্থিত করেছে এবং বাণিজ্যবিস্তারের নামে মূলত শোষণের মানচিত্র তৈরি করেছে। মামুন সেই মানচিত্রের দিকে আমাদের ফিরে তাকাতে বাধ্য করেছেন স্বাধীন ও নতুন সংবেদনশীল চোখে।

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনে উপচে পড়া ভীড়। 

প্রদর্শনীকক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের চোখে পড়বে পুরোনো কাঠের সেতু। যার ওপর দিকে সামনের দিকে সার বেঁধে এগিয়ে চলেছে চারপেয়ে লেজ উঁচানো সাদা, লাল ও কালো ইংরেজ। এইসব রং আমাদের মনে এনে দেয় সাম্রাজ্যবাদীদের সম্পর্কে প্রতীকী সব বোধ- ধূর্ত তারা, হিংস্র তারা, অমানিশা তারা। ইংরেজদের রেলপথে ব্যবহৃত এই কাঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কার্ল মার্কসের এক গভীর নিরীক্ষণ, রেলপথ বিস্তারের মধ্য দিয়েই ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী ভারতবর্ষকে বেঁধেছে তাদের শোষণের জালে, ভেঙে ফেলতে চলেছে এর গ্রামগুলোর জাড্যতা আর বিচ্ছিন্নতা। আমরা দেখতে পাই, তিনরঙা ইংরেজেরই চোখ অবিভক্ত বাংলা বিহার উড়িষ্যাময় এক মানচিত্রের দিকে। আমাদের চোখ স্থির হয়ে যায় নিয়ন্ত্রণশক্তির প্রতীক সারিবদ্ধ তালপাতার সিপাহিদলের দিকে-যারা অবিরাম ডান-বাম, ডান-বাম করে চলেছে।

‘অসম্মতির মানচিত্র’ তাই ইতিহাসের সঙ্গে পথচলা এক প্রদর্শনী। এটি ইতিহাস উপস্থাপনের নতুন এক চিত্রভাষা। এখানে প্রদর্শিত বেশ কিছু চিত্র অবশ্য এর আগে আমরা ‘শতাব্দীর আখ্যান’ নামের এক ধারাবাহিক সিরিজে দেখতে পেয়েছি; কিন্তু তা যে আরও বড় এক কর্মযজ্ঞের অংশবিশেষ, সেটি উপলব্ধি করা যায় এ প্রদর্শনীতে এসে। 

এর আগেও মামুন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কনসেপচুয়াল শিল্প প্রদর্শনী করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় এই প্রদর্শনী এক কথায়, অনন্য সংযোজন। ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ ও পুনর্পাঠের এই চিত্রভাষা সৃজনের জন্যে ঢালী আল মামুন স্মরণীয় হয়ে রইবেন।

‘অসম্মতির মানচিত্র’ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে গত ২৭ জানুয়ারি থেকে। ২৭ নং ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনী কক্ষে এটি প্রদর্শিত হবে ২৬ মার্চ অবধি। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা