× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণে আতঙ্ক নয়, দরকার সচেতনতা

ডা. মুশতাক হোসেন

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৪:১১ পিএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

দেশের ৩২ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের খবর ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত হয়েছে। ইতোমধ্যে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৬ জনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই ৩২টি জেলায় বিভিন্ন সময় ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। জানা যায়, ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে এ ভাইরাসে ৩২২ জন আক্রান্ত হন এবং ২২৯ জন মৃত্যুবরণ করেন। অর্থাৎ দেশে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের হার বেশি না হলেও এ রোগে মৃত্যুর হার বেশি। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ মারা যায়। গত দুই দশকে দেশে ৩২টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গেছে। আমরা আইইডিসিআরের পর্যবেক্ষক দল যখন মহামারি বা সংক্রমক রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ করতে যাই, তখন লক্ষ করেছি এই ৩২টি জেলায় বিভিন্ন সময়ে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। এ জন্য এই অঞ্চলকে আমরা নিপাহ ভাইরাসপ্রবণ এলাকা বলে চিহ্নিত করে থাকি। এর বাইরেও নিপাহর প্রকোপ দেখা দিতে পারে, কিন্তু আমরা প্রাথমিকভাবে এই ৩২টি জেলার দিকেই নজর রাখি।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের খবরে জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ডেডিকেটেড শয্যা প্রস্তুতের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। করোনা দুর্যোগের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও স্বাস্থ্য খাত এখনও ব্যস্ত সময় পার করছে। অনেকেরই প্রশ্ন আছে, স্বাস্থ্য খাত কি এই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে? আমি অবশ্য দুশ্চিন্তার কারণ দেখছি না। নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ ঘিরে এখন যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা থেকে অনেকে ধারণা করছেন এটি একটি নতুন মহামারি। তবে বাস্তবে এমনটি নয়। যেমনটা বলেছি, গত ২০ বছর ধরে দেশে বিভিন্ন সময়ে নিপাহ ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। বিশেষত জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যবর্তী সময়ে দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে বেশি। দেশের চিকিৎসকরা এই পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত। প্রতিবছর এ বিষয়ে তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়।

ভুলে গেলে চলবে না, নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ওষুধ কিংবা টিকা আজও আবিষ্কৃত হয়নি। তাই একজন চিকিৎসকের পক্ষে রোগীকে জীবনরক্ষাকারী পরিচর্যা কিংবা ক্রিটিক্যাল কেয়ার দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। যেমন, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। মূলত মস্তিষ্কের প্রদাহ থেকে এমন হয়। তখন রোগীকে দ্রুত আইসিইউ-তে নিয়ে যেতে হয় এবং হাই-ফ্লো অক্সিজেনের মাধ্যমে রোগীর জীবন শঙ্কামুক্ত করা যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মূলত এই ক্রিটিক্যাল কেয়ার নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যই। আশার কথা হলো, করোনা দুর্যোগে ক্রিটিক্যাল কেয়ার নিশ্চিত করার অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্য খাতের বেড়েছে। নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার অনেক প্রস্তুতিই করোনাকালীন দুর্যোগে সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিপাহ ভাইরাসের জন্য যদি আলাদা ওয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়, তাহলে স্বাস্থ্য খাতে কিছুটা চাপ পড়তে পারে। কোভিড পরিস্থিতি যেহেতু এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এবং সংক্রমণও কম, সেহেতু কোভিড ওয়ার্ডের একটি অংশ নিপাহ ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কেন নিপাহ ভাইরাস এত দ্রুত ছড়াচ্ছে? আমরা জানি, শীত এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ শুরু হয়। খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা গাছের একটি অংশ চেঁছে রাখেন। তারপর একটি হাঁড়ি কিংবা কলস বেঁধে দেন, যেখানে রস জমা হয়। ইদানীং বাদুড় খেজুরের রসে মুখ দিচ্ছে। এ সময় খেজুরের রসের সঙ্গে বাদুড়ের লালা মিশে যায়। আবার অনেক সময় বাদুর খেজুরের রসের হাড়িতে মলমূত্র ত্যাগ করে। এভাবে কাচা খেজুরের রস থেকে নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে। আবার বাদুর কিংবা শূকরের আধখাওয়া ফল খেলেও এ রোগ ছড়াতে পারে। ফলে নিপাহ সংক্রমণের হার বাড়ছে। কিন্তু নিপাহ সংক্রমণ আছে এমন দেশ, যেমন মালয়েশিয়ার দিকে যদি তাকাই, তাহলে দেখব সেখানে বাদুড় কিন্তু রসে মুখ দিচ্ছে না। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বাদুড় রসে মুখ দেয় না।

আমাদের এখানে নিপাহ সংক্রমণ বাড়ার পরোক্ষ একটি কারণ বনজঙ্গল ধ্বংস করা। একসময় বিস্তর বনজঙ্গল ও ঝোপঝাড় ছিল। সেখানে বুনো ফলমূল খেয়ে বাদুড় ক্ষুধা নিবৃত্ত করত। কিন্তু আমরা বনজঙ্গল উজাড় করে দেওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে খাবারের সন্ধানে আসছেমুখ দিচ্ছে খেজুরের রসে।  অর্থাৎ আমাদের এখানে খেজুরের রস, তালগাছের রস কিংবা উঁচু গাছের ফল খেয়ে বাদুড় ক্ষুধা নিবৃত্ত করছে। এর মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে। খেজুরের কাচা রস খেয়ে মানুষ নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে। তা ছাড়া তালগাছের রস দিয়ে উৎপাদিত তাড়ি বা চোলাই মদ খেয়েও অনেকে সংক্রমিত হওয়ার নজির রয়েছে। এই মুহূর্তে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে প্রত্যেককেই সচেতন হতে হবে। নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আমাদের দুটো পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে এ ভাইরাসের উৎস থেকে দূরে থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই খেজুরের কাচা রস খাওয়া চলবে না। শুধু তাই নয়, অনেক সময় গাছের নিচে আধখাওয়া অনেক ফল পড়ে থাকে। অনেকে এসব ফলও খেয়ে থাকেন। যেহেতু আমাদের নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই ফলটি আদৌ বাদুর খেয়েছে নাকি অন্য কোনো প্রাণীতাই টুটাফাটা কিংবা আধখাওয়া ফল কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না। যদি কোনো এলাকায় এমন টুটাফাটা ফল পাওয়া যায়, তাহলে তা দ্রুত অপসারণ করে ফেলে দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল কিংবা পরিচ্ছন্নকর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ের সতর্কতার ক্ষেত্রে ব্যক্তির সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গ চলে আসে। করোনা দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আমরা আরেকটি সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাচ্ছি। আমাদের মনে আছে, সামাজিক পরিসরে সচেতনতার অভাবে একজন থেকে আরেকজন করোনা সংক্রমিত হয়েছিলেন। এবারও নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসায় অন্যরা সংক্রমিত হচ্ছে। নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধের ক্ষেত্রে উদাসীনতার অবকাশ নেই। করোনা দুর্যোগে যে স্বাস্থ্যবিধির প্রচলন হয়েছিল, যেমন মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, ফল-সবজি ভালোমতো ধুয়ে খাওয়া ইত্যাদি বিষয় মেনে চলতে হবে। শ্বাসতন্ত্রবাহিত সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে যা যা করণীয়, তা অনুসরণ করতে হবে প্রত্যেককে।

সব দিক বিবেচনায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি এই দুইয়ের অনুসরণ জরুরি। নিপাহ ভাইরাস বিষয়ে সতর্কীকরণ ও সচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমেও প্রতিনিয়ত এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হচ্ছে। তারপরও মানুষ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের ক্ষেত্রে সতর্কতার সমন্বয় করতে পারছেন নাযেমনটি করোনা দুর্যোগেও দেখা গিয়েছিল। ভুলে গেলে চলবে না, নিপাহ ভাইরাস কোভিডের চেয়েও প্রাণঘাতি। তাই নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কাচা খেজুরের রস না খাওয়া তো কঠিন কিছু নয়। তবে এখনও অনেক মানুষ এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন নয়। সংবাদমাধ্যমেই খেজুরের রস আমাদের ঐতিহ্য বলে অভিহিত করে নানা লেখা প্রকাশ পায়। কিন্তু সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ বলে সেখানে এও লিখতে হবে, খেজুরের কাচা রস খাওয়া যাবে না। খেজুর কিংবা তালের রস রান্না করে গুড়, পায়েস কিংবা পিঠা হিসেবে প্রস্তুত করে খেলে কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। কারণ ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় এ জীবাণু মরে যায়। মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। মূলত স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অনেকে সঠিক তথ্য জানেন না বলেই অসতর্কতাবশত সংক্রমিত হচ্ছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়েই আলোচনা শেষ করি, ২০১১ সালে হাতিবান্ধায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। তখন গ্রামে গ্রামে আমরা ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করি। ওই সময় অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, ২০০১ সালে ভাইরাসটি বাংলাদেশে শনাক্ত হয়। অথচ তাদের সতর্ক করার জন্য পদক্ষেপ নিতে এত দেরি হলো কেন। আরও আগে সতর্ক করলে তো অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচান যেত। কিন্তু সতর্কীকরণ কিন্তু একদম প্রথম থেকেই করা হচ্ছে। মানুষ বিষয়গুলো আমলে নেয় না। এই ভুলোমনা অবস্থা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। না হলে নিপাহ ভাইরাসও আমাদের জন্য আরেক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

লেখক : রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা