× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দুর্নীতির সূচকে অবনতির গ্লানি আর কত

আবু আহমেদ

প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৫:২৪ পিএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় গতবারের চেয়ে একধাপ অবনমন ঘটেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের অবস্থান দ্বিতীয়Ñ এ তথ্য উঠে এসেছে বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০২২ শীর্ষক প্রতিবেদনে। তারা বলেছে, একশ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ২৫, যা গতবারের চেয়ে এক পয়েন্ট কম। সম স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের পাশে রয়েছে ইরান ও আফ্রিকার দেশ গিনি। বাংলাদেশের স্থান নির্ধারণ হয়েছে, ১৮০টি দেশের মধ্যে ১২তম, যা গতবার ছিল ১৩তম। তাদের প্রতিবেদনেই জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট দেশ ভুটানে দুর্নীতির মাত্রা এবারের সিপিআই অনুযায়ী সবচেয়ে কম। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বেশির ভাগ দেশের স্কোর প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, সিপিআই নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশ, তথা অন্য কোনো দেশকেই দুর্নীতিগ্রস্ত ‘দেশ বলা যাবে না’। বরং সূচকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে দুর্নীতির মাত্রা ‘অধিক’ বা ‘কম’ বলা যাবে। এটি সুসিদ্ধান্ত। কারণ, একটি দেশের পুরো জাতি দুর্নীতি করে না, কেউ কেউ করে এবং একই সঙ্গে এও সত্যÑ যারা দুর্নীতি করে বা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের ক্ষমতার শিকড় অনেক গভীরে গ্রথিত কিংবা তাদের সঙ্গে ক্ষমতাবানদের সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের এখানে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, কোনো অভিযোগ উঠলেই কিংবা কোনো গবেষণা প্রতিবেদনে নেতিবাচক কিছু উঠে এলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু যেকোনো অভিযোগ কিংবা দাপ্তরিক ত্রুটি-বিচ্যুতি অথবা সমাজের অনিয়ম-দুর্নীতি সম্পর্কিত উত্থাপিত যেকোনো অভিযোগের যদি বিশ্লেষণ অথবা তদন্তক্রমে প্রতিকার নিশ্চিত করা হয়, তাহলে কল্যাণের পথটি প্রশস্ত হয়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এই পথটি অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

বাংলাদেশে অবৈধ আয়ের অনেক উৎস আছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছিল এই প্রত্যাশা পোষণ করে যে বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু তখন সংবাদমাধ্যমে এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছিলাম। বলেছিলাম, যদি মানসিকতার পরিবর্তন না হয়, একই সঙ্গে যে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির কঠোর প্রতিকার যদি নিশ্চিত না হয়Ñ তাহলে দুর্নীতি নির্মূলের আশা দুরাশার নামান্তর। বাস্তবে হয়েছেও তাই। সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই দুর্নীতি নির্মূল করতে চায়, তাহলে এর উৎসে নজর দিতে হবে এবং নির্মোহ অবস্থান নিয়ে প্রতিকারে দূঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। একই সঙ্গে যারাই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে তারা যতই ক্ষমতাধর হোন না কেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং এটাই হলো জরুরি প্রতিবিধান।

বাংলাদেশের যেসব খাতে দুর্নীতি হয়, সেগুলো অচিহ্নিত নয়। এর মধ্যে আর্থিক খাত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি ইত্যাদি অধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে ইতোমধ্যে বহুবার আলোচনায় এসেছে। নাম উল্লেখ করতে হলে আরও অনেকই করা যাবে। আমাদের স্মরণে আছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান তার দায়িত্বপালনকালে বলেছিলেন, ‘দুর্নীতির সূচকে আমাদের আরও বেশি হয়তো এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সবার সম্মিলিত প্রয়াস পেলেই এটা সম্ভব। তবে এটি পাওয়া খুবই দুষ্কর। দুর্নীতি আছে এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। অস্বীকার করলে আমরা এগোতে পারব না।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশে অনেক দুর্নীতি। দুর্নীতির সূচকে এগিয়ে গেলে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কিছু নেই। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি হচ্ছে, প্রতিরোধ করতে পারছি না।’ একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন উচ্চারণ সমালোচনার নয়, বরং কেন তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন নাÑ এর উৎস সন্ধান করে সরকার যদি ব্যবস্থা নেয় তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটিই হচ্ছে না।

সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিনিয়ত নানা স্তরে দুর্নীতির যে চিত্র উঠে আসছে, সেই অনুপাতে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারের হার কত? এ প্রশ্নের উত্তর প্রীতিকর নয়। অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ ইত্যাদি বিষয় সামাজিক ব্যাধি হিসেবে জিইয়ে আছে। অর্থ পাচার করেন কারা? যাদের বিপুল অবৈধ আয়ের সুযোগ রয়েছে কিংবা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যারা টাকা কামাই করে পার পেয়ে যাচ্ছেন, তারাই বিদেশে অর্থ পাচার করেন এবং নিঃসন্দেহে তাদের খুঁটির জোর অনেক শক্ত। আমাদের সমাজে একটি প্রবাদ বাক্য বহুল প্রচলিত। তা হলোÑ ‘টাকা লাগে দেবে গৌরী সেন’। এই প্রবাদটির প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে স্তরে স্তরে জনসেবার ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি কতটা ব্যাপক হারে ঘটছে তা শুধু ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। আমাদের সমাজে দুর্নীতির সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক বেশ পোক্ত। দুর্নীতির একটি বড় অংশ হয়ে থাকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা রাজনৈতিক কারণে। এমন অনেক দৃষ্টান্তই আমাদের সামনে রয়েছে। রাজনীতিকরা এ ব্যাপারে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন বটে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাস্তবে এর প্রতিফলন তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। আমরা দেখেছি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি নির্মূলে যে অঙ্গীকার করা হয়, ক্ষমতায় গিয়ে অনেকেই তা ভুলে যান। দুর্নীতির বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে বেশি নাজেহাল হন সাধারণ মানুষ। আমরা প্রায়শই দুর্নীতির কথা বলে থাকি, কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলে দেখা যায়, উন্নয়ন-অগ্রগতি তো বটেইÑ সাধারণ মানুষের জন্য দুর্নীতি কতটা সর্বনাশের কারণ।

দুর্নীতি এবং অবহেলা এই দুই-ই যে অপরাধ, এ ব্যাপারে নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। সরকারি কেনাকাটা থেকে শুরু করে সরকারের গৃহীত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির স্তরে স্তরে দুর্নীতির ছায়া বিস্তৃত। দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক ও বিচার প্রক্রিয়ার সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকার এবং বিভিন্ন মহলে ইতোমধ্যে বহুবার কথাও হয়েছে বটে; কিন্তু এ লক্ষ্যে উদ্যোগ-আয়োজন কিংবা কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ কোনোটাই পর্যাপ্ত নয়। দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিকভাবেই হচ্ছে না, সামাজিকভাবেও নানারকম বিরূপ প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। শুধু সরকারপ্রধানের সদিচ্ছা কিংবা কঠোর নির্দেশেই দুর্নীতি যে বন্ধ হবে না এও সহজেই ধারণা করা যায়। কারণ, সরকারপ্রধানের নির্দেশ যারা বাস্তবায়ন করবেন, তারা যদি নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ না হন এবং তাদের মধ্যে যদি অনিয়মের বীজ লুকিয়ে থাকে, তাহলে প্রতিবিধান নিশ্চিত হবে কীভাবে? দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সরকারের তরফেÑ এমনটি বলা হলেও দুর্নীতির রাশ টানা যাচ্ছে না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কী? আগেও বহুবার বলেছি, আবারও বলিÑ দশ-বিশজন দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই অনিয়ম-দুর্নীতির আঁতুড়ঘর ভেঙে পড়বে না। মোট কথা হলো, পদ্ধতিগতভাবে যে দুর্নীতি হচ্ছে, সেখানে হাত দিতে হবে। আমাদের স্মরণে আছে, নিকট অতীতে উচ্চ আদালতে বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের তালিকাসহ একটি মামলায় যেসব অজানা তথ্য বেরিয়ে এসেছিল এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত দুর্নীতি দমন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংককে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আমরা জানি না, সেই নির্দেশনাগুলোর প্রতিপালন কতটা হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ ঘোষণা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে তাকে স্বাগত জানাই। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বড় রকমের দুর্নীতির রহস্য উদঘাটনের পরও বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত প্রক্রিয়ায় গলদের খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্নীতির গ্লানি কি আমাদের বহন করে যেতেই হবে?

যদি সরকার এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল সংস্থার নীতিনির্ধারকরা চিহ্নিত ব্যাধিগুলোর প্রতিকারে কঠোর অবস্থান নেন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা পোষণ করেনÑ তাহলে দুর্নীতির মতো ব্যাধির উপশম কঠিন কিছু নয়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সফল করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতাও জরুরি। ব্যবস্থা ভালো না হলে অবস্থার উন্নতি আশা করা যায় না। কারা দুর্নীতি করে, কীভাবে করে, দুর্নীতির ফাঁকফোকর কোথায়Ñ এসব কোনো কিছুই যেহেতু অচিহ্নিত নয়, সেহেতু এর প্রতিকারে সাফল্য মিলছে না কেন? আমরা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে যদি নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে সবাই করণীয় কাজগুলো করিÑ তাহলে প্রত্যাশার সফলতাও কঠিন কিছু নয়। সাধারণ মানুষের দুর্নীতি করার অবকাশ নেই। দুর্নীতিবাজরা নিশ্চিয়ই ক্ষমতাবান এবং তারা যে কোনো ঘটনার বাঁক পরিবর্তনের সক্ষমতা রাখেন। তাদের বিরুদ্ধে অনমনীয় অবস্থান নিতেই হবে। স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি বারবার নানা মহল থেকে উত্থাপিত হচ্ছে। সন্দেহ নেই জনস্বার্থের অনুকূলে এই দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দাবিগুলোর বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বাগ্রে জরুরি সুশাসন। আর সুশাসন যদি নিশ্চিত হয়, তাহলে দুর্নীতির পথ এমনিতেই সংকোচিত হতে বাধ্য। দুর্নীতির নিশ্চিয়ই একটি ভিত্তি রয়েছে, তা না হলে এর বিরূপ প্রভাব এত বেশি ক্ষতির কারণ হবে কেন? দুর্নীতি নির্মূলে এ পর্যন্ত কথা হয়েছে অনেক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজ কতটা কি হয়েছেÑ এখন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা