দিবস
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৫:০১ পিএম
আজ ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব জলাভূমি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য : জলাভূমি
রক্ষা করা এক্ষুনি প্রয়োজন। নদীনালা, খাল-বিল, হাওর, ডোবা, জলাশয়, পুকুরে ঘেরা বাংলাদেশের
অনেকাংশ জুড়ে আছে গ্রাম আর এই গ্রামীণ জনপদ প্রকৃতির লীলাভূমি। মেঠোপথে ছড়ানো রয়েছে
শত শত পুকুরের গল্প, রয়েছে জনপদঘেরা নদীর গল্প, হাওরের গল্প, বৃক্ষের গল্প, পাহাড়ের
গল্প, নানা প্রজাতির পাখি-প্রাণীর গল্প, মাছের অভয়ারণ্যের গল্প, সাদা মাটির গল্প।
প্রাকৃতিক পরিবেশÑ হাওর, বিল, নদী, খাল, জলাশয়ের ওপর নির্ভর করে গড়ে
উঠেছে একেকটি গ্রামীণ জনপদ। গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের বিশেষ
করে ভাটি বাংলা দিয়ে প্রবাহিত নদীতে কৃষক মেশিন বসিয়ে সেচের পানি সংগ্রহ করত। কিন্তু
এখন নদীতেই পানি নেই। বোরো আবাদের জন্য মানুষ ভূগর্ভের পানি উত্তোলনের প্রতিযোগিতায়
নেমেছে। সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদন খরচও; ফলে পানিতে আয়রনের পরিমাণ বাড়ছে, বাড়ছে পানিদূষণ
ও রোগ, বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য। মানুষের জীবন, পেশা, সংস্কৃতি,
খাদ্য, পুষ্টি, মাছ ও যোগাযোগের উৎস আমাদের এসব জলাভূমি। ব্যক্তিমালিকানার কিছু পুকুর
ছাড়া প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে সব জলাভূমি। বিল-জলাশয়, মানুষের জীবন, পেশা, শিক্ষা-সংস্কৃতি,
আনন্দ-বিনোদন, কৃষির ফলনে জলাভূমির অবদান বিচ্ছিন্ন করা যায় না। দিন দিন কমতে থাকে
নদী, হাওর, বিল, জলাশয়, খাল; প্রাকৃতিক এসব সম্পদের ওপর থেকে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বাড়তে
থাকে। ফলে মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। মানুষ বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
কমতে থাকে প্রাকৃতিক সম্পদে অভিগম্যতা, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও বিনিময়, বাড়তে থাকে
সম্পর্কহীনতা।
বৃহৎ বাঁধ, সেতু, রেললাইন, সড়কপথ, বৃহৎ অবকাঠামো, কারখানা স্থাপন,
বর্জ্য নিষ্কাশন, বাণিজ্যিক কৃষি খামার, চুক্তিবদ্ধ চাষ, ইকো পার্ক, সামাজিক বনায়ন,
বহুজাতিক খনন, তেল-গ্যাস প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, আধুনিক কৃষি উন্নয়ন
কর্মসূচি, সবুজ বিপ্লব, বিনোদন পার্ক ইত্যাদি উন্নয়ন প্যাকেজ নিদারুণভাবে দেশের প্রাণের
বৈচিত্র্যময় উৎস ও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা বিনষ্ট করেছে এবং করে চলেছে। নদী, খাল-বিল,
হাওর, জলাভূমি বিলুপ্তির ফলে কমছে প্রাকৃতিক মাছের বৈচিত্র্য, মানুষ সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল
হয়ে পড়ছে চাষকৃত মাছের ওপর, প্রাকৃতিক মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলো দিন দিন
ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। পেশা হারিয়ে বেমানান হয়ে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। জল,
জাল, নদী, হাওর, বিল কিছুই আর জেলেদের নিয়ন্ত্রণে নেই। দিন দিন কমে যাচ্ছে প্রাকৃতিক
সম্পদ, দখল হয়ে যাচ্ছে জলমহাল, শুকিয়ে যাচ্ছে নদীনালা, খাল-বিল, মাছের অভয়াশ্রম, প্রজনন
কেন্দ্র, বিলুপ্ত বিপন্ন মাছের প্রজাতি, হারিয়ে যাচ্ছে পেশা, জীবনে নেমে আসছে দারিদ্র্য।
নদী ও সংস্কৃতি একসূত্রে গাঁথা।
প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রাণ, প্রাণসম্পদ, নদীনালা, খাল-বিল, হাওর রক্ষা
করা প্রয়োজন। প্রকৃতি থেকেই মানুষ শিখেছে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক অতি প্রাচীন ও
দুর্গম। সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষের স্পর্শে প্রকৃতি আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে মানুষ সেজেছে
নতুন নতুন রূপে। টিকে থাকার সংগ্রাম উভয়কেই করেছে বৈচিত্র্যময়। মানুষের টিকে থাকার
জন্যই প্রাণী, উদ্ভিদ, জলবায়ু, মাটি। তাই মানুষের উচিত তাদের প্রকৃতিকে সচল রাখা। মূলত
প্রতিটি সমাজব্যবস্থায় প্রতিবেশ, সমাজ-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি সামাজিক বৈচিত্র্যের ওপর
নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। সামাজিক এ বৈচিত্র্যের জন্ম হয়েছে ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য থেকে।
ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্ম হয়েছে উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য থেকে। তাই প্রাকৃতিক
বৈচিত্র্য ছাড়া মানুষের টিকে থাকা কঠিন। আসুন আমরা কৃষক, জেলে, কামার, কুমার, পাহাড়ি,
কবিরাজ সবাই মিলে রক্ষা করি আমাদের নদীনালা, খাল-বিল, হাওর, জলাশয়, পাহাড়, বন, গাছ,
লতাপাতা, মাছ, পাখি, ব্যাঙ, প্রজাপতি ও সংস্কৃতি। জলাভূমি দখল, বিলুপ্তি, দূষণের ফলে
জেলে পেশা হারিয়ে ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছে। নদী, জলাভূমির সঙ্গে পর্যটন, সংস্কৃতি বিশেষভাবে
জড়িত। জলাভূমি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। আমাদের নান্দনিকতার উৎস। জলাভূমির আত্মহনন বা
হত্যা দিয়ে আমরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির সচল ধারা অবলুপ্ত করতে পারি না।