দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২২ ১৩:৪৩ পিএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২২ ১২:৫৫ পিএম
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
ছাত্রলীগের বিপথগামী স্বেচ্ছাচারী নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের কারণে সংগঠনটির ঐতিহ্য কালিমালিপ্ত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগের কতিপয় নেতাকর্মীর দুষ্কর্মের জন্য নিয়ন্ত্রকদের পড়তে হচ্ছে কঠোর সমালোচনার মুখে। প্রায়ই নেতিবাচক অর্থে শিরোনাম হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের নামে।
২২ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ফের বেপরোয়া ছাত্রলীগ, বিব্রত আওয়ামী লীগ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে সঙ্গতই প্রশ্ন দাঁড়ায়, দুর্বিনীত নেতাকর্মীদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না কেন? দেখা যাচ্ছে কেন্দ্র থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের বেপরোয়া নেতাকর্মীরা একের পর এক দুষ্কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি পুনর্বার দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজধানীর ইডেন কলেজে সংগঠনটির কতিপয় নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ড এ প্রশ্নও দাঁড় করিয়েছে, তাদের এত উন্মত্ততার পেছনের উৎস কী?
ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দল ছড়িয়ে পড়ছে কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতার প্রশ্রয়েÑএমন অভিযোগও আছে বিস্তর। আমাদের স্মরণে আছে, অতীতে বিপথগামী নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে সংগঠনটির সঙ্গে সম্পর্কছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা। তিনি বহুবার তাদের সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু আমরা দেখেছি, তাতেও দুষ্কর্মকারীরা দমেনি। আমরা জানি, দল বা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্নের কারণ নেতাকর্মী বা দায়িত্বশীলদের নেতিবাচক আচরণ। ছাত্রলীগের বেপরোয়া নেতাকর্মীদের উচ্ছৃঙ্খল-অশোভন কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে চরম নিন্দনীয়। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের অঙ্গ ছাত্র সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সম্প্রতি ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতির একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার মধ্য দিয়ে ফের সাক্ষ্য মিলল তারা কতটা দুর্বিনীত। যদিও অভিযুক্ত নেত্রী এমন ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু প্রশ্ন হছে শুধু ক্ষমা চেয়েই তিনি কি অকথ্য ভাষায় গালমন্দসহ তার অন্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দায়মুক্তি পেতে পারেন?
বরগুনায় কয়েকদিন আগে জাতীয় শোক দিবসের প্রাক্কালে একটি অনুষ্ঠান ঘিরে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিপেটার ঘটনায় যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা দল ও সরকারের জন্য স্বস্তির হয়নি। তা ছাড়া বিভিন্ন ইউনিটে কমিটি গঠন নিয়ে ছাত্রলীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ঘোরতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অতীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ছাত্রলীগের বেপরোয়া নেতাকর্মীরা শিক্ষাঙ্গনে শুধু সন্ত্রাস-নৈরাজ্যই সৃষ্টিই করছেন না, নানারকম সামাজিক দুষ্কর্মের সঙ্গেও জড়িয়ে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন। ছাত্রলীগের অতীত আজ অনেকটাই যেন ম্লান কতিপয়ের হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণের কারণে। শান্তিপ্রিয়রা তাদের এমন কর্মকাণ্ডে হতভম্ব-বিস্মিত। অথচ দেশের ইতিহাসে অনেক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সঙ্গে ছাত্রলীগের নাম যুক্ত। কিন্তু এখন ছাত্রলীগের সব অর্জন যেন বিফলে যেতে বসেছে। পরিণত হয়েছে বিসর্জনে। দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে ছাত্রলীগের হৃত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ছাত্রলীগের বেপরোয়া নেতাকর্মীদের লাগাম টেনে ধরতেই হবে। দুষ্কর্মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে ছাত্রলীগকে করতে হবে কলুষমুক্ত। বিপথগামীদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা।
ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য হোক শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণ। ছাত্রসংগঠন যেন লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির পথে না চলে। আমরা মনে করি, ছাত্ররাজনীতির স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় ফিরিয়ে আনতে পারলে কদর্যতার পথ রুদ্ধ হবে। আমরা দেখেছি, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ছাত্রসংগঠনগুলোর উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা কীভাবে পরিবেশ ও শান্তি বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ান।
আওয়ামী লীগসহ প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের প্রতি আমাদের আহ্বান, কোনোভাবেই যেন ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনে কদর্যতার ছায়া বিস্তার লাভ না করে, সেজন্য গভীর নজর রাখা। আমরা আশা করব, ছাত্রসংগঠনগুলোর নীতিনির্ধারকরাও বিষয়টি মনে রাখবেন। ছাত্রলীগের মতো ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আমরা মনে করি, দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারই দুষ্কর্মের একমাত্র প্রতিবিধান।