আমিরুল আবেদীন
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২২ ১৪:০৯ পিএম
আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২২ ১৬:১২ পিএম
ফাইল ফটো
অব্যাহত মূল্যস্ফীতির কারণে যখন দেশের সিংহভাগ মানুষ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না, তখন চালের দামবৃদ্ধি জীবনযাত্রার সব ক্ষেত্রে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
২০ ও ২১ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের কেজিতে দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৮ টাকা।
‘গরিবের চাল’ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণা ও আটাশ জাতের চালের দাম তুলনামূলক আরও একটু বেশি বেড়েছে। চাল আমাদের প্রধান খাদ্যপণ্য। অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামবৃদ্ধির ফলে সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রায় যে চাপ পড়ে, এর মধ্যে চালের দামবৃদ্ধি আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করে। লোডশেডিং ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মিলাররা চালের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির অজুহাতে দাম যে হারে বাড়িয়েছেন, তা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।
ডিজেলের দামবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ যেটুকু বেড়েছে, তাতে আগের পরিবহন খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দাম বেড়েছে সব ধরনের চালের। দুঃখজনক হলো, অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির করে তুললেও বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর তৎপরতা তেমন দৃশ্যমান নয়। চালের আড়ত, গুদাম কোনোকিছুই নেই তদারকিতে। অভিযোগ আছে, বাজার পর্যবেক্ষণে জড়িত অসাধু দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সিন্ডিকেটের যোগসাজশের কারণেই ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এও উঠে এসেছে, দেশের সিংহভাগ ভোক্তা প্রয়োজনের অর্ধেক পণ্য কিনে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের কাছে মোটা চালের মূল্য এক মাসের ব্যবধানে ছয় শতাংশের ওপরে বৃদ্ধির বিষয়টি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’য়ের শামিল। চালের দামবৃদ্ধির পেছনে মিলারদের কারসাজির বিষয়টি ইতিপূর্বে বহুবার প্রমাণিত হলেও দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারের নজির নেই। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ও লোডশেডিংয়ের অজুহাত দাঁড় করিয়ে মিলাররা যে হারে চালের দাম বাড়িয়েছেন, এর প্রভাব সবস্তরের বাজারে প্রকট হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমেই বলা হয়েছে, উত্তরের অসাধু ব্যবসায়ীরা নিয়মবহির্ভূতভাবে ধান মজুদ করে রেখেছেন।
কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে পাইকারি বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, চালের দাম আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তাদেরই কেউ কেউ এও জানিয়েছেন, মিলাররা চাল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, এক মাসের ব্যবধানে চালের মূল্যবৃদ্ধির যে চিত্র উঠে এসেছে তা স্বাভাবিক নয়। আমরা জানি, এবার বন্যার কারণে ধানের উৎপাদন কিছুটা কম হলেও সরকারের দায়িত্বশীল মহলের তথ্যমতে চালের যে মজুদ রয়েছে এরপর চালের মূল্য এমন অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কারণ নেই। খাদ্যমন্ত্রী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে জানিয়েছেন, এভাবে চালের দাম বাড়ানো মেনে নেওয়া হবে না। আমাদের স্মরণে আছে, গত বছর চালের বাজারে দফায় দফায় মিল মালিক ও আড়তদাররা তুঘলকি কাণ্ড চালানোর পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি, এসব সতর্কবার্তা অসাধুরা আমলে তো নেনইনি, উপরন্তু তারা তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করেছেন চক্র গড়ে। চাল নিয়ে চালবাজি চলছেই। প্রশ্ন হচ্ছে, বাজার নিয়ন্ত্রণের নাটাই কার হাতে?
আমরা মনে করি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কঠিন এ সময়ে যেকোনো মূল্যে বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে যূথবদ্ধভাবে নজরদারি ও তদারকির বিষয়ে জোর দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর ‘কঠোর’ হুঁশিয়ারির বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে চাইব। চালসহ নিত্যপণ্যের বাজারে বিরাজমান অস্থিরতা নিরসনে টিসিবির চাল ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির পরিসর বাড়াতে হবে। খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে যারা দেশের মানুষের খাদ্যপণ্য নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড চালিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে।