× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আত্মসচেতনতাই আত্মোন্নয়নের শক্তি

নাজমুল হুদা

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৩ ০০:৪১ এএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন ‘বেঁচে থাকার মতো আনন্দ আর কিছুই নেই। কত অপূর্ব দৃশ্য চারদিকে। মন দিয়ে আমরা কখনও তা দেখি না। যখন সময় শেষ হয়ে যায়, তখনই হাহাকারে হৃদয় পূর্ণ হয়।’ এ হাহাকার, একাকিত্ব, শূন্যতা আর ক্ষোভ নিয়ে দ্রতধাবমান এই প্রযুক্তিপ্রিয় পৃথিবীর গতিপথ থেকে কেন কেউ কেউ ছিটকে পড়ছেন বা নীরবে সরে যেতে চাইছেন! কারও কারও আত্মহননের খবরে তোলপাড় হচ্ছে; ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের বাবা-মার বৃদ্ধাশ্রমে নিঃসঙ্গ বাস বা জীবনসায়াহ্নে হাহাকারও শোনা যাচ্ছে প্রায়ই। জীবন সমীকরণের এ বাস্তবতা আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত, অগ্রহণযোগ্য।

বর্তমান সমাজবাস্তবতার গলিপথে ঘনীভূত অন্ধকারের ছায়া আমাদের তরুণদের অনেককেই গ্রাস করছে ক্রমাগত। সন্তানকে বড় হও, ধনী হও, টাকা কামাও, ক্যারিয়ার তৈরি কর কথাগুলো জপ করতে করতে বাবা-মায়ের ‘রেসের ঘোড়া’ বানানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকে। আদরযত্ন, ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া হয়Ñ তোমাকে কিন্তু ‘ওর’ মতোই হতে হবে। না হলে আমাদের ‘মুখ’ উজ্জ্বল হবে না। ছেলে-মেয়েও শুরু করে দৌড়। কেউ সে দৌড়ে জেতে, কেউ হারে। যে হারে তাকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয় তুমি পরাজিত, তুমি আমাদের মুখ উজ্জ্বল করতে পারনি। আর যে জেতে তাকে নিয়ে বাবা-মা শুরু করেন গর্ব। বাবা-মায়ের বয়স হয়। তারা এবার চান বাজির ঘোড়া ঘরে ফিরুক। এমনটি চান তাদের সখ্যা বেশি না হলেও তাদের কর্মকান্ড সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এক পর্যায়ে ওই সন্তানরা একা চলতে ও অধিক বেগে দৌড়াতে শিখে ফেলেছে। তখন বাবা-মায়ের ভালোবাসার কথা তার কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়। তাকে তো ছোটবেলায় দৌড়ানো শেখানো হয়েছে, থামতে শেখানো হয়নি! তাকে ছোটবেলায়ই ক্যারিয়ারের অঙ্ক শেখানো হয়েছে, ভালোবাসার উত্তর শেখানো হয়নি! একটা সময় গিয়ে বাবা-মায়েরা একা হয়ে ঠিকই বুঝতে পারেন, সন্তানের ক্যারিয়ারের চেয়ে সন্তানকে একটু ছুঁয়ে দেখা বেশি আনন্দের। ছেলেটার সঙ্গে বিকালে একটু চা খাওয়া অনেক বেশি মূল্যবান। তখন হয়তো হাতে সময় থাকে না। একাকিত্ব, হাহাকার, শূন্যতা আর বিষণ্নতা ভর করে দেহমনে। তখনই কেউ কেউ মুক্তির আশায় মৃত্যুর কাছে হাত পাতে। ভয়াবহ এই ‘আত্মহত্যার ট্রেন্ড’ যুক্ত হয়েছে আমাদের কিশোর-তরুণ-যুবাদের মধ্যে। তারুণ্যের তুমুল তাড়না নিয়ে যাদের জীবনের জয়গান গাওয়ার কথা, জীবনযুদ্ধে যাওয়ার কথা তারাই জীবন থেকে পালিয়ে মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নিতে চাইছে। আহারে, আহা জীবনের কি অপচয়!

নিকট অতীতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ২০২১ সালে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন; যাদের ৬২ জনই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ২০২০ সালে এ সংখ্যাটা ছিল ৭৯। বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গ্রামের ৮৬ ভাগের বেশি আর শহরের ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষণ্নতায় আক্রান্ত। তাদের অনেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বা আত্মহত্যার চিন্তা করেছেন। উঠতি কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এ হার আরও ভয়াবহ, আঁতকে ওঠার মতো! শুধু গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরই এক ডজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সহজ পথ বেছে নিয়েছে। গত তিন বছরে এসএসসি পরীক্ষার পর ১৫০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। ৩ হাজার ৭৫০ জনের কিছু বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এর মধ্যে ৪০০ জন আবার দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে কৈশোর-তারুণ্যে আত্মহত্যা হচ্ছে বিশ্বে মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ! ২০১৭ সালে যারা আত্মহত্যার শিকার তার ৬৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮-এর মধ্যে। এর মধ্যে আবার মেয়েদের হার আরও বেশি, আশঙ্কাজনক।

বিষণ্নতা অনেককে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করছে। এ ছাড়া বন্ধু, আত্মীয়, পরিবারের সদস্যদের নেতিবাচক ব্যবহার, পরিবারের প্রত্যাশা মেটাতে না পারার হতাশা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের অর্জনের খবরের সঙ্গে নিজেদের অর্জনের তুলনা করার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও হতাশার হার বাড়ছে। শিক্ষার শিকলে বাঁধা পড়ে ঘুণেধরা সিস্টেম আর ভুলেভরা ব্যবস্থার জাঁতাকলে নানামুখী চাপে দিন দিন অনেক তরুণের মাঝে বাড়ছে অধৈর্য,অস্থিরতা, সহিংসতা, আত্মহত্যার ঝোঁক। অথচ যাদের মানসিক রোগ হয়, তাদের ৫০ শতাংশের ওই রোগের প্রথম লক্ষণ ১৪ বছরের মধ্যেই দেখা দেয়। সেই বয়সের কোনো ছেলে-মেয়ের কথায় কান দেওয়ার মতো সময় কারও থাকে না। প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া দূরের কথা, একটা ‘চাপ বলয়’ তৈরি করে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের বৃত্তবন্দি করে ফেলছি আমরা। কেউ কেউ অকালে ঝরে পড়ছে। তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো ভেতরের ক্ষোভ, অভিমান, কষ্ট মাটিচাপা পড়ে যায়।

আমাদের দেশে এসব নিয়ে অনেকেই আর তেমন কথা বলেন না। সমস্যার সমাধানে নেই তেমন কার্যকর উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ‘মেন্টাল হেলথ এডুকেশন ইন স্কুলস ল’ নামে একটি আইন পাস হয়েছে। আইনে নিউইয়র্কের কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষাদান বাধ্যতামূলক। উন্নত দেশগুলোয় স্কুল-কলেজ থেকেই ‘সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং’ (এসইএল) শেখানো হয়; যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আত্মসচেতন হওয়া, নিজেকে সামলানোর কৌশল, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষাসহ দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শেখে। আমাদের দেশেও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি সবার সহযোগিতাপূর্ণ ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক সমস্যা সমাধানের সাহস ও দক্ষতা থাকলে আত্মহনন নয় বরং আত্মোন্নয়নের পথ সুগম হবে। জীবনে অপূর্ণতা, অপ্রাপ্তি, অতৃপ্তি থাকবেই; তার পরও কবির ভাষায় বলতে চাই, দুঃখ করো না, বাঁচো। জীবন বিকশিত হোক। 

লেখক : উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা