দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ ০০:১৩ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়Ñ এ প্রবাদটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, রাজনীতি থেকে শুরু করে সামাজিক বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনায় মানুষকে এই স্বাধীন বাংলাদেশে কম মাশুল দিতে হয়নি, বিড়ম্বনা পোহাতে হয়নি। রক্তস্নাত এই বাংলাদেশ দফায় দফায় অনেক মর্মন্তুদ অধ্যায় অতিক্রম করেছে। যে বিষয়গুলো কেন্দ্র করে জীবনবৈরী এমন পরিস্থিতির শিকার ফিরে ফিরে হতে হয়েছে এ দেশের সাধারণ মানুষকে, সেই বিষয়গুলোর মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল একাত্তরপর্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে রক্তস্নাত বাংলাদেশ অর্জনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীন দেশের মানুষ নিপতিত হয় গাঢ় অন্ধকারে। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর স্বাধীন দেশের মাটিতে বর্বরতার হোতারা ‘নষ্ট রাজনীতি’র বীজ বপন করেন। যে দেশের রাজনীতির এত অর্জন সেই দেশটি জন্মকালের পর কিছু দূর যেতে না যেতেই চক্রান্তের যে জালে জড়িয়ে পড়ে, সেই জাল আজও ছিন্ন করা যায়নি। জনকল্যাণের রাজনীতি জনশান্তি নষ্টের কারণ হয়ে উঠেছে। সুস্থ ধারার রাজনীতির সংজ্ঞা-সূত্র চাপা পড়ে যাচ্ছে ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থের চক্রান্তে।
১৬ জানুয়ারি একটি
দৈনিকে ‘আজ আবার
রাজপথে উত্তেজনা’
শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি
প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছেÑ আবারও কি রাজনীতি সেই চেহারাই ফিরে
পেতে যাচ্ছে?
আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক
অধিকারের নামে,
নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ছদ্মাবরণে
কী ভয়াবহ নৃশংসতার
ছায়া বিস্তৃত হয়েছিল। শান্তিপ্রিয়
মানুষ যখনই সংবাদমাধ্যমে
রাজনীতিকেন্দ্রিক খবরের এমন শিরোনাম দেখে
তখন সংগত কারণেই
তাদের অবস্থা অনেকটা
হয়ে দাঁড়ায় ঘরপোড়া
গরুর মতোই। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ
হীনস্বার্থবাদী কিংবা রাজনীতির
নামে অপরাজনীতির কুশীলবদের
নখরাঘাতে বারবার ক্ষতবিক্ষত
হয়েছে। পরিণতিতে সমাজে-পরিবারে-জীবনে ক্ষতের
ওপর ক্ষত সৃষ্টি
হয়েছে। রাজনীতির মাধ্যমে
হীনস্বার্থ চরিতার্থের লক্ষ্যে
অপচেষ্টা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক
সম্প্রীতি বিনষ্টের ধ্বংসাত্মক
অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র পুষ্ট
হয়েছে। মানুষ এর প্রতিকার চেয়েছে। বিচার
চেয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক
হলেও সত্য,
বহু ক্ষেত্রেই নিশ্চিত
হয়নি কোনো প্রতিবিধান। এর ফলে একদিকে
দুঃখের খতিয়ান দীর্ঘ
হয়েছে, অন্যদিকে প্রত্যক্ষ
করতে হয়েছে বিচারহীনতার
অপসংস্কৃতি কিংবা বিলম্বিত
বিচারের কুফল।
বৈরীতার
ছোবলে অনেকের জীবনপ্রদীপ
নিভে গেছে,
মানুষ সহায়-সম্পদ হারিয়েছে, অপরাধ ডালপালা
ছড়িয়েছে। এর রাশ টানা যায়নি
ব্যবস্থাপনাগত প্রক্রিয়ায় ত্রুটির
কারণে। ভুক্তভোগী কিংবা
তাদের পরিবার-পরিজন প্রতিকারের
প্রতিশ্রুতি শুনেছে কিন্তু
বিস্ময়কর হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই
তা আটকে আছে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির মধ্যে। কী বিস্ময়কর!
যেখানে অবস্থা এই, সেখানে তিমিরপ্রহর
কিংবা দুঃখের নিরসন
ঘটবে কী করে? বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয়
মানুষ বরাবরই প্রত্যাশা
করেছে নেতিবাচক সবকিছুর
বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ধারার
রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে
ঐকমত্য গড়ে চক্রান্ত
রুখে দিতে নতুন
পথের সন্ধান মিলবে। কখনও কখনও
এমন ঐক্য দৃশ্যমান
হলেও এর আয়ু ছিল খুব কম। এর বিপরীতে অনেকবার
দেখা গেছে সর্বনাশের
রাজনৈতিক ঐকমত্য। সমীকরণ
হয়েছে হীনস্বার্থবাদী রাজনীতির
মেরুকরণের ছকে। শুধু
বাংলাদেশ কেন,
বিশ্বের অনেক দেশেই
শান্তিপ্রিয়রা কমবেশি তাদের
ন্যায্য অধিকার থেকে
বঞ্চিত। কিন্তু পাশাপাশি
এও সত্য,
অনেক দেশেই আমাদের
মতো প্রতিকারহীনতার চিত্র
এত বিবর্ণ নয়। কোনো
অপরাধ সংঘটিত হলেই
আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির
দাবি জানাই। আবার
এও দেখা গেছে, সময়ের স্রোতে
আমাদের আবেগ ভেসে
যায়। এর পেছনে
কারণও আছে। দীর্ঘ
বিচার প্রক্রিয়া,
আইনের ফাঁক গলে অভিযুক্তের পার পেয়ে যাওয়া
এর মাঝে অন্যতম।
স্বাধীন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘বারোভূত’-এর সমাহার
ঘটবে না,
এটিই ছিল খুব স্বাভাবিক প্রত্যাশা। আমরা
পেছনে তাকালে স্পষ্টই
দেখতে পাই,
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যে সংবিধান রচিত
হয়েছিল, তাতে মুক্তিযুদ্ধের
চেতনার প্রতিফলনই ঘটেছিল। এই লক্ষ্যেই সামগ্রিক
মুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু
হীনস্বার্থবাদী রাজনীতির মেরুকরণে
একে একে আঘাত
লাগল সংবিধানের মূল স্তম্ভে। বদলে
গেল রাষ্ট্রের ধর্ম-চরিত্র দুই-ই। মুক্তিযুদ্ধের
মাধ্যমে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক
বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবেই চরিত্র
ধারণ করল সাম্প্রদায়িক। সেই অন্ধকার থেকে
বেরিয়ে আসা অনেকটা
সম্ভব হলেও পুরোপুরি
মুক্তি মেলেনি। আমরা
ফেরত পাইনি বাহাত্তরের
পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। এর ফলে রাজনৈতিক
শুদ্ধাচারের যে আশাবাদী
কথা উচ্চারিত হয়ে আসছে,
বাস্তবে এর কাঙ্ক্ষিত
প্রতিফলন ঘটেনি। দুঃখের
পর দুঃখ অর্থাৎ
স্তূপীকৃত দুঃখের বিচার
হয়নি, উপরন্তু দুঃখের
খতিয়ান বিস্তৃত হয়েছে।
পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী বাকি আছে আরও প্রায় এক বছর। কিন্তু ওই নির্বাচন কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশের রাজনীতিতে ফের মেরুকরণ-সমীকরণের অঙ্ক কষা চলছে। এই ছকে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের স্বার্থটাই প্রাধান্য পাচ্ছে কিংবা পাবে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা তা-ই মনে করিয়ে দিচ্ছে অবস্থাদৃষ্টে। রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় কিংবা রাজনীতির নামে জীবনবৈরী আরও অনেক কিছুই ঘটতে পারে, এ আশঙ্কাও অমূলক নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়টিও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর নজির আমাদের প্রতিবেশী ভারতসহ আরও অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতিতে ভোট-জোটের সমীকরণ ক্রমেই যেভাবে জটিল হচ্ছে, তাতে সুস্থ ধারার রাজনীতির আশা দূরশা বৈ কিছু নয়। যদি তা-ই অব্যাহত থাকে তাহলে রাজনীতির অপর নামই যে জনকল্যাণ, সেই রাজনীতি সামগ্রিকভাবেই আমাদের আরও দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যেকোনো ব্যবস্থায় যদি অসংগতি জিইয়ে থাকে তাহলে সংগতিপূর্ণ রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের চিন্তা কতটা যৌক্তিক, এ প্রশ্নও সংগত কারণেই সামনে আসে। আমাদের সমাজে প্রতিরোধের আন্দোলন হলেও সঠিক অর্থে স্বাধীন দেশে সামগ্রিকভাবে মুক্তি কিংবা জাগরণের আন্দোলন কতটা সফল হয়েছে, এ নিয়ে তর্ক আছে। নব্বই-পরবর্তী রাজনীতি ঘিরে ফের যে স্বপ্ন ঝিলিক দিয়েছিল, তাও ফিকে হয়ে যেতে সময় লাগেনি। আমরা চাই মানুষের অধিকারের সুবর্ণচর দৃশ্যমান হোক। বাংলাদেশে দুঃখের বিচার হোক। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, সাম্য প্রতিষ্ঠিত হোক। প্রকৃতার্থেই রাজনীতি হয়ে উঠুক জনকল্যাণের একমাত্র মাধ্যম। জীবনবৈরী সবকিছুর পথ রুদ্ধ হোক। শান্তিপ্রিয় মানুষ সুস্থ ধারার রাজনীতি চায়, কিন্তু কোনোভাবেই অপরাজনীতি নয়।
লেখক : সাংবাদিক