× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আগে উন্নয়ন তারপর সামাজিক সূচক

ড. জিয়া রহমান

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ ০২:০৩ এএম

অলঙ্করন : প্রবা

অলঙ্করন : প্রবা

আইন প্রণয়ন হয় নাগরিকদের নিরাপত্তা কিংবা শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় অবশ্য এর বিপরীতেও কিছু কিছু ঘটনা ঘটে অনেক সময় রাজনৈতিক দলের মদদে কিংবা নির্বাচনের সময় সহিংসতা বাড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা হয়ে দাঁড়ায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার তবে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার পেছনেও রয়েছে অনেক কারণ কারণগুলো শনাক্ত করে সমস্যাগুলোর সমাধান বের করা জরুরি আমরা সব সময় বলি, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি মূলত বিভাজনের সংস্কৃতি এখানকার রাজনৈতিক অঙ্গনে সহনশীলতা, সহমর্মিতা কখনই গড়ে ওঠেনি দ্বিতীয়ত কম-বেশি প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতা নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয় না তৃতীয়ত আমাদের এখানে রাজনৈতিক দলগুলো কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনও গড়ে ওঠেনি

আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক দল একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান, যা আইন বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত এবং নানা কাজ সম্পাদন করে রাজনৈতিক দল জনগণের কাছেও দায়বদ্ধ কিন্তু আমাদের এখানে কিছু স্থায়ী সমস্যা রয়েছে ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোতে থাকা রাষ্ট্রের আকার চরিত্র এখানে রয়ে গেছে আর এখানে গণতন্ত্র যতটুকু ছিল তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামরিক শাসকদের দ্বারা কাজেই মূল জায়গার দিকে দৃষ্টি দিলে এটা স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক দলের বিভাজন এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে না ওঠা এবং একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবই আমাদের মূল সমস্যা

১৯৭১ সালে রক্তমূল্যে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র দীর্ঘ দুইশ বছর ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে থাকায় এই ভূখণ্ডে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি স্বাধীনতা-উত্তর সময়েও এসব বিষয়ের ঘাটতি ছিল কিন্তু যখন নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা আত্মপ্রকাশ করি, তখন পুরোনো ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করে এসব ঘাটতি পূরণের সম্ভাবনা তৈরি হয় কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় রাজনৈতিক বিভাজন স্বাধীনতা বিরোধী পক্ষ ফের শক্তিশালী হয়ে ওঠে সময় তারা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ক্ষমতায় ছিল এবং সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়

প্রত্যেক দেশেই স্বাধীনতার মূলনীতির ভিত্তিতে দেশ শাসন হয় কানাডা, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে এমনটাই স্বাভাবিক এবং বিষয়ে কারও কোনো বিরোধ থাকে না এগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তবে পঁচাত্তরের পর দেশে যে শক্তির উত্থান ঘটে, সেটিই আমাদের বিভাজন সংঘাতের রাজনীতির জন্য দায়ী বলে আমি মনে করি এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্যা থেকে বের হওয়ার উপায় আছে কি না উত্তর হচ্ছে, যেহেতু সমস্যার সমাধান একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, তাই এই বিভাজন-সংঘাত থেকে রাতারাতি বের হওয়ার পথ নেই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি একেবারে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে চর্চার মাধ্যমে আদর্শিক রূপ ধারণ করে কাজেই আমাদের সদিচ্ছা থাকলেও, বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারা দ্রুত আমূল বদলে ফেলা সম্ভব  নয় দেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়া বলবৎ থাকলে অর্থাৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বলবৎ থাকলে পালাবদলের সম্ভাবনা ছিল

আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কিছু সনাতন উপাদান রয়েছে, যা এই বিভাজনকে পুষ্ট করছে সনাতন উপাদান বলতে বোঝাচ্ছি সামন্ত প্রথা, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব বিশেষত আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলোতে জ্ঞাতিসম্পর্ক যাকে তিন প্রজন্মের সম্পর্ক বলে অভিহিত করা হয়, এই উপাদানগুলোও কিছুটা দায়ী আবার সনাতন ব্যবস্থার সংস্কারের ফলে নগরায়ণ ঘটেছে ফলে একে অপরের প্রতি সহনশীলতার অভাব সামাজিক কাঠামোর ভেতরে প্রোথিত হয়ে আছে তাই যতই বলা হোক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলে পরিবর্তন আনা হবে, সেটা এই সামাজিক কাঠামোর কারণেই সম্ভব না ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সহিংসতার খবর দেখলে বোঝা যায়, এই রাজনৈতিক বিভাজন একদম তৃণমূল পর্যায়ে প্রোথিত বিশেষত জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই দুরবস্থা বাড়তেই থাকে কারণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যেক স্তরেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুপস্থিত এখন দেখা যায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ভেঙে যাচ্ছে এক সময় সংসদে অ্যাডভোকেট বা রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা থাকলেও এখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিনিধি বেশি তাই সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে আশা আমাদের মনে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই, যার স্পর্শে রাতারাতি পরিবর্তন আসবে তবে থেমে থাকার সুযোগ নেই পরিবর্তন আনতে হবে সে জন্য প্রথমে বাড়াতে হবে সামাজিক সচেতনতা সংবাদমাধ্যম এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে জনগণকে সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানোর মাধ্যমে তারা জনমত গঠনের দায়িত্ব নিতে পারে সংবাদমাধ্যম ছাড়াও আমাদের সিভিল সোসাইটিরও দায়িত্ব আছে তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সিভিল সোসাইটির মধ্যেও বিভাজন স্পষ্ট একাডেমিক জায়গা থেকে আমরা যে সিভিল সোসাইটির কথা বলি, সেই সিভিল সোসাইটিও সত্যিকার অর্থে গড়ে ওঠেনি রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা যেকোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানই এখন এই সিভিল সোসাইটির অংশ এখানে বিতরণ কিংবা অনুদান কর্মসূচি পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোকেও সিভিল সোসাইটি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় এক্ষেত্রে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কিংবা যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, তাদের  সিভিল সোসাইটির সভ্য করা হয় যারা নির্মোহভাবে লেখালেখি করেন কিংবা মত প্রকাশ করেন তারা একপক্ষীয় সমর্থনের বিপক্ষে অবস্থান করেন অবশ্য তাদের সংখ্যা কম আবার এও ভুলে গেলে চলবে না, এই সচেতনতা বাড়ানোর কাজে প্রয়োজন অনেক সময়

স্থবিরতা সমস্যা দেখে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক-বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? আমরা প্রতিনিয়তই ঔচিত্য-অনুচিত্য নিয়ে কথা বলি কিন্তু যারা নিয়ে কাজ করবেন, সে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নেই সমস্যা থেকে উত্তরণের একটিমাত্র উপায় সারা বিশ্বে প্রচলিত আর সেটি হলো সামাজিক আন্দোলন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর দিকে যদি তাকাই, তাহলে আমরা দেখব, এখানকার কোনো দেশেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি এসব দেশে আগে উন্নয়ন তারপর সামাজিক সূচক দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশেও আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে আমার ধারণা, আমাদের দেশেও প্রথমে উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভূখণ্ডে বিরল কিছু নয় যেমন সিঙ্গাপুর উত্তর কোরিয়ার মতো কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র দীর্ঘদিন উন্নয়নভিত্তিক পদ্ধতিতে এগিয়েছে এবং নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নের পর তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং এর মধ্যে রাষ্ট্রে অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট সংস্থা, মাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে স্বীয় দায়িত্ব এবং ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে কাজ করতে হবে একই সঙ্গে আমাদের এই উন্নয়নের ধারাও অব্যাহত রাখতে হবে দেশে উন্নয়নের ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে যখন ব্যক্তির জীবনে উন্নয়নের প্রভাব পড়বে তখন স্বভাবতই তার ভেতরে প্রোথিত সনাতন সংস্কারের পরিবর্তন ঘটবে ফলে গতানুগতিক রাজনৈতিক সহিংসতা এড়াতে তাকে রাজনৈতিক দলের পেছনে ছুটতে হবে না বরং রাজনৈতিক দলের ভেতর নেতৃত্ব গড়ে উঠতে শুরু করবে এবং দলের ভেতর নেতৃত্বের দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত হবে, তার একটি প্রতিযোগিতা শুরু হবে হ্যাঁ, এসব কিছুই একটি ধারণামাত্র কাজটিও দুষ্কর রাতারাতি সম্ভব নয়

আশার কথা, আমাদের একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা ইতোমধ্যে অনেক কিছু করে দেখিয়েছে, তা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে এবং দিচ্ছে স্মরণে আছে, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় স্কুল-কলেজের ছাত্ররা যে ভূমিকা পালন করে, তা সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে এই নতুন প্রজন্মকে সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে হবে তবে এই প্রজন্মই যদি রাজনীতিবিমুখ অর্থাৎ রাজনীতিবিবর্জিত অস্তিত্বে পরিণত হয়, তখন আমাদেরই ক্ষতি হবে আজকের প্রজন্ম সামাজিক বিষয়ে নানা আন্দোলন পরিচালনা করলেও রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ কম কিন্তু প্রজন্মের হাতে রয়েছে সম্ভাবনা তাদের যুক্তিবোধ, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা এবং সামাজিক পরিবর্তনকে বেগবান করার ক্ষমতা থেকে যদি কোনো সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক দলের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হবে তখন রাজনীতিকরা পরিবর্তনের দিকে এগোতে বাধ্য হবেন মনে রাখতে হবে, জনমতের ওপর কিছু নেই তরুণদের অনেক আন্দোলন ইতোমধ্যে সফল হয়েছে, যা আমাদের বড় শক্তি এই শক্তিই আমাদের পুরোনো চিন্তাধারাকে ধুয়েমুছে পরিবর্তনের সূচনা করবে শেষে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে, এই প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করবে কে? সে জন্য জনমত ছড়াতে হবে সব প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে

 

 

লেখক : সমাজবিজ্ঞানী  অধ্যাপকঅপরাধবিজ্ঞান বিভাগঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা