মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ ০০:৩৩ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
‘সত্য বল সুপথে চল, ওরে আমার মন’। সাধক-বাউল লালন শাহের একটি গানের প্রথম কলি। গানটি আমরা হরহামেশাই শুনে থাকি। তবে এটা কতটা আত্মস্থ করি তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সমাজ-সংসারে আজ যত ঝামেলা-ফ্যাসাদ, এর মূলে রয়েছে এই গানের বাণীর বিপরীত কাজ। মানুষ সত্য বলতে চায় না, সুপথেও চলতে চায় না। ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থে মানুষ অবলীলায় মিথ্যা উগরে দিতে পারে। মিথ্যা বলা এবং কুপথে চলার কারণে মানুষ নানা পাপকাজে জড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি ধর্মে মানুষকে সত্য বলতে এবং সুপথে চলতে আদেশ-নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষ সব সময় ধর্মের বাণীকে শুনতে চায় না।
বলা হয়ে থাকে, মিথ্যা
পাপের মা। একটি
মিথ্যাকে ঢাকতে একশ মিথ্যার
প্রলেপ দিতে হয়। তারপরও
কিন্তু মিথ্যা কখনও চাপা
থাকে না। প্রলেপ
ভেদ করে সত্যটা এক
সময় মেঘ সরে যাওয়া
আকাশে সূর্যের মতো বেরিয়ে
আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
নারদ অ্যাডলফ হিটলারের প্রচার
সচিব গোয়েবলস অবশ্য মিথ্যার
মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন এভাবেÑ ‘একটি
মিথ্যাকে বারবার প্রচার করলে
মানুষ এক সময় তা
সত্য বলে বিশ্বাস করতে
শুরু করে।’ এর প্রমাণ
রয়েছে অনেক। পশ্চিমা
শক্তিগুলো প্রচার করল, ইরাকের প্রেসিডেন্ট
সাদ্দাম হোসেন বিপুল পরিমাণ
পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ করেছেন; যা
বিশ্বশান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি। সুতরাং চালাও আক্রমণ, ধ্বংস
করে দাও সাদ্দামের মারণাস্ত্র
ভাণ্ডার। সম্মিলিত আক্রমণে
পর্যুদস্ত এবং শোচনীয় পরিণতি
বরণ করলেন সাদ্দাম। বিধ্বস্ত
জনপদে পরিণত হলো ইরাক। কিন্তু কয়েক বছর
পরে ওই মিত্রশক্তির এক
পার্টনার রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান
স্বীকার করলেন, সাদ্দাম হোসেনের
বিরুদ্ধে পারমাণবিক ও
রাসায়নিক অস্ত্র মজুদের যে
অভিযোগ আনা হয়েছিল, তা ছিল
মিথ্যা। এই স্বীকারোক্তির
আর কোনো মূল্য ছিল
না। কেননা, এর ফলে
ইরাকের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে
গেছে, তা পূরণ হওয়ার
উপায় নেই।
রাজনীতিতে মিথ্যার শৈল্পিক নাম আছে। ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’, ‘মেঠো বক্তৃতা’, ‘কর্মীদের উজ্জীবিত করার কৌশল’ ইত্যাদি নামে মিথ্যাকে রাজনীতিতে জায়েজ করা হয়। এই তো কয়েকদিন আগে একটি বিশেষ দিনের কথা উল্লেখ করে একটি বড় দলের পক্ষ থেকে বলা হলো, ওইদিন থেকে বাংলাদেশ একজন নেত্রীর কথায় চলবে; যিনি আদালতের দণ্ড মাথায় নিয়ে নিজ গৃহে বন্দি জীবনযাপন করছেন। পরে চাপে পড়ে ওই দলেরই শীর্ষস্থানীয় নেতারা স্বীকার করলেন, কথাটা ‘মিন’ করে বলা হয়নি, ‘কর্মীদের উজ্জীবিত’ করার জন্যই বলা হয়েছিল। কিন্তু ওই দলের যারা তৃণমূল কর্মী, যারা দলকে, নেত্রীকে ক্ষমতায় দেখতে চান—তারা তো ওই কথাকে সত্য বলে ধরে নিয়েই কর্মসূচি সফল করতে মাঠে নেমেছিলেন আদা-জল খেয়ে। ফল কী হলো? সমূহ বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে শক্ত অবস্থানে চলে যাওয়া সরকারের নিগ্রহের শিকার হলো তারা। সারা দেশে কয়েক হাজার যুবক-কিশোর আজ কারাগারে দুঃসহ জীবনযাপন করছে। কেউ কেউ বলেন, নিরেট সত্য বললে নাকি রাজনীতি হয় না। যেমন হয় না খাদ ছাড়া স্বর্ণালংকার।
আমাদের রাজনীতিকদের অন্যতম
একটি প্রাত্যহিক কাজ
কথা বলা। তারা
প্রতিনিয়ত নানারকম কথা বলেন। প্রয়োজনে বলেন, অপ্রয়োজনেও বলেন। আর বিষোদগার করেন
পরস্পরের বিরুদ্ধে। সত্য-মিথ্যার
মিশেলে ওই সব বিষোদগার
রাজনীতির মাঠে তৈরি করে
অসহনশীল পরিবেশ। তারা
পরিণত হন একে অপরের
জানি দুশমনে। অথচ
এমনটি হওয়ার কথা নয়। রাজনীতি যেহেতু জনহিতকর
কাজের এক মহান ব্রত, তাই
এতে সম্পৃক্ত ‘মান্যবর’দের আচরণ
হওয়া উচিত খেলোয়াড়সুলভ। এই
তো ক’দিন আগে
অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা বনাম
ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল
খেলায় যখন টাইব্রেকার শুরু
হতে যাচ্ছিল, তখন একটি
দৃশ্য সবাইকে মুগ্ধ করেছে। দুই পক্ষের গোলরক্ষক
গোলবারের দিকে যাচ্ছিলেন একে
অপরের কাঁধে হাত রেখে। অথচ একটু পরেই
তারা অবতীর্ণ হবেন নিজ
নিজ দেশের মর্যাদা রক্ষার
লড়াইয়ে। আমাদের রাজনীতিকদের
মধ্যে এ গুণটি আজ
আর নেই। তারা
যখন একে অপরের বিরুদ্ধে
কথা বলেন, তখন মনে
হয় শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে
নেমেছেন। অনেকেরই খেয়াল
থাকে না তিনি কী
বলছেন। যখন খেয়াল
হয়,
তখন আর করার কিছু
থাকে না। ততক্ষণে
জনগণের কাছে পৌঁছে যায়
ভুল বার্তা। তাতে
তার নিজের এবং দলের
যা ক্ষতি হওয়ার তা
হয়ে যায়।
‘নির্বাচনী
ওয়াদা’ বলে একটি জোড়া
শব্দ চালু আছে আমাদের
দেশে। সেই সঙ্গে
এটাও প্রচলিত, নির্বাচনী ওয়াদা
পূরণ করতেই হবে এমন
কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। নির্বাচনী মাঠে একজন
প্রার্থী বা নেতা জনগণের
সামনে যেসব ওয়াদা করেন, পরবর্তী
সময়ে সেগুলোর বেশির ভাগই
তিনি ভুলে যান। যদি
কেউ তাকে সেসব কথা
স্মরণ করিয়ে দেন, তাহলে বিস্ময়ভরা
কণ্ঠে প্রশ্ন করেন, ‘বলেছিলাম নাকি
ও কথা?’ মনে পড়ছে মুম্বাইয়ের
হিট ছবি ‘নায়কে’র কথা। মুখ্যমন্ত্রী বলরাজ চৌহানের (অমরেশ
পুরি) সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়
টিভি রিপোর্টার শিবাজী
রাও
(অনিল কাপুর) একটি একটি
বই দেখিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘ইয়ে
ইয়াদ আয়ে স্যার?’ দ্বিধান্বিত বলরাজ
চৌহান বলেন, ‘হ্যাঁ, দেখা হ্যায়
কোহি’। রিপোর্টার শিবাজী
বলেন, ‘ইয়ে আপকা ইলেকশন
মেনিফেস্টো’। তখন বলরাজ
চৌহান মাথা দুলিয়ে বলেন, ‘ও
হ্যাঁ হ্যাঁ, ইয়াদ আয়া। ম্যায়নেই তো ছাপায়া।’
কী চমৎকার! মুখ্যমন্ত্রী বলরাজ
চৌহান ক্ষমতায় গিয়ে যেমন
তার নির্বাচনী ইশতেহারকে
চিনতে পারছিলেন না, আমাদের রাজনীতিকরাও
একবার নির্বাচনী নদী
পার হতে পারলে জনগণ
নামের ‘কলার ভেলা’দের আর
মনে রাখেন না।
শুরু করেছিলাম সাধক লালন শাহের গান দিয়ে। সে গানে সত্য বলতে এবং সুপথে চলতে মানুষকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাজনীতিকরা আমাদের ‘অভিভাবক’। তারা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবেন, আমরা অনুসরণ করবÑ এটাই তো হওয়া উচিত। কিন্তু আফসোস, তারা এমন কোনো সুদৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারছেন না, যে পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা নিজেদের ধন্য মনে করতে পারি। আর তারা যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে চলেছেন, তা অনুসরণ করলে সত্য আর সুপথ চিরবিদায় নেবে দেশ থেকে—এ কথা বললে বোধকরি অত্যুক্তি হবে না।
লেখক : সাংবাদিক ও
রাজনীতি বিশ্লেষক